আবারও চাঙ্গা হচ্ছে দেশের পর্যটন শিল্প

Online Desk Online Desk
প্রকাশিত: ১২:৪০ পিএম, ২৯ আগষ্ট ২০২০

অনলাইন ডেস্ক: করোনাভাইরাসের জন্য ৫ মাস বন্ধ থাকার পর গত ১৭ আগস্ট থেকে কক্সবাজারসহ দেশের বেশ কয়েকটি পর্যটন কেন্দ্র খুলে দেয়া হয়েছে। এরইমধ্যে কক্সবাজার, কুয়াকাটা, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চলনবিল, হালতিবিল, মাধবকুন্ড, লাউয়াছড়া, বিছানাকান্দি, রাতারগুল, জাফলং, টাঙুয়ার হাওর, হাকালুকির হাওর ও সবুজ চা বাগানসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র পর্যটকদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে। হোটেল, মোটেল, কটেজ, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিনোদন কেন্দ্র সর্বত্র ফিরে এসেছে প্রাণ চাঞ্চল্য। স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরে বেড়াচ্ছেন সব বয়সের মানুষ। 


করোনা আতঙ্কে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকার ফলে এক ধরনের অবসাদ মানুষকে ঘিরে ধরেছে। বিশেষ করে শিশুরা ঘরবন্দি থেকে অনেকটা বিমর্ষ। এর থেকে মুক্তি পেতে মানুষ ছুটছে সমুদ্র কিংবা পাহাড় ঘেরা প্রাকৃতির কাছে। ১ সেপ্টেম্বর থেকে খুলছে বাংলাদেশের দার্জিলিং খ্যাত পর্যটন কেন্দ্র রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি। এটা খুললে কোলাহাল বাড়বে পর্যটকদের। সেই সাথে জীবন জীবিকার সংস্থান বাড়বে।
বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়- এ খাতে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৪০ লাখ জনবল বেকার হয়ে পড়েছিল। পর্যটন কেন্দ্রগুলো খুলে দেওয়ায় আবার সবাই কর্মচঞ্চল হয়ে পড়েছে। ফলে পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি আবারও চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। খুব দ্রুত পর্যটন খাত আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশাবাদ।
প্রাকৃতিক রূপবৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যে ঘেরা বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের রয়েছে অপার সম্ভাবনা। ধীরগতিতে হলেও এ শিল্পের উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। বিগত কয়েক বছরের ধারাবাহিক অগ্রযাত্রায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার, নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার কারণে পর্যটন শিল্পের যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০১৯ সালের ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কমপেটেটিভনেস রিপোর্ট-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১২০তম বলা হয়েছে। এ রিপোর্টে বাংলাদেশের অবস্থান ৫ ধাপ এগিয়েছে, যা ২০১৭ সালে ছিল ১২৫তম।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের মূল উপাদান হতে পারে এই দেশের প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। পাহাড়-পর্বত, নদী-সমুদ্র, বনাঞ্চল, হাওরসহ বৈচিত্র্যের সম্ভার আমাদের এই দেশ। এই সম্পদকে সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা গেলে এই দেশে দেশীয় পর্যটকের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য আমাদের বর্তমান ভিসা প্রক্রিয়া আরও সহজতর করতে হবে। আমাদের বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরের কর্মকান্ডকে আরও পর্যটক বান্ধব করতে হবে। যেসব সূচকে আমাদের দেশ পিছিয়ে আছে, তাতে আরও মনোযোগ দিতে পারলে বাংলাদেশ অদূর ভবিষ্যতে এই শিল্পে আরও উন্নতি করতে পারবে। করোনাকালীন ক্ষতিও সহজে কাটিয়ে উঠতে পারবে।
পর্যটন নগরী কক্সবাজার থেকে শামসুল হক শারেক জানান, র্পাঁচ মাস বন্ধ থাকার পর আবার স্বরূপে ফিরছে দেশের পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারের অর্থনীতি। গত ১৭ আগস্ট থেকে খুলে দেয়া হয়েছে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, হোটেল, মোটেল, কটেজ, রেস্টুরেন্টসহ পর্যটন শিল্প সংশ্লিষ্ট ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিনোদন কেন্দ্রগুলো। পর্যটনে নিষেধাজ্ঞা তুলে দেয়ার পর থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটক আসছেন কক্সবাজারে। করোনার কারণে দীর্ঘ পাঁচমাস ঘরবন্দি থাকার পর মানুষ ভ্রমণ করছেন পর্যটন রাজধানী কক্সবাজারে। ছাত্র, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, রাজনীতিক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সকলেই কক্সবাজার ভ্রমণ করে ক্লান্তি ও অবসাদ কাটানোর চেষ্টা করছেন। 


পর্যটন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কলাতলীর ডলফিন মোড়, লাবনী পয়েন্ট, সীইন পয়েন্টসহ সৈকত এলাকা ও হোটেল মোটেল জোনে পর্যটকদের পদচারণা। হিমছড়ি ইনানী বিনোদন কেন্দ্রও সরব হয়েছে পর্যটকে। এদিকে করোনা সচেতনতায় স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে মানার নির্দেশনা থাকলেও কিছু কিছু ভ্রমণকারী এবং ব্যবসায়ী তাতে এখনো কিছুটা অসচেতন দেখা গেছে। এবিষয়ে জেলা প্রশাসন সচেতন রয়েছেন।


ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন সূত্রমতে, কক্সবাজার শহরের সাড়ে ৪ শতাধিক আবাসিক হোটেল, ১৪০টিরও অধিক রেস্টুরেন্ট, ২ শতাধিক ট্যুর অপারেটর অফিসসহ পর্যটন শিল্পনির্ভর প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সচল হয়েছে। এর সাথে অর্ধশত পরিবহন সংস্থা ও বিমান পর্যটক পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে বেড়াতে আসছেন পর্যটকরা। এখন উন্মুক্ত বিস্তীর্ণ সৈকত, হোটেল, মোটেল, কটেজ, রেস্টুরেন্টসহ বিনোদন কেন্দ্রগুলো। এতে আবারো চাঙ্গ হয়ে উঠছে কক্সবাজারের পর্যটন নির্ভর অর্থনীতি।


কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো: কামাল হোসেন জানান, গত ৫ আগস্ট অনুষ্ঠিত করোনা সংক্রমণ প্রতিরোধ কমিটির সভার সিদ্ধান্তের আলোকে সীমিত পরিসরে পর্যটন শিল্প গত ১৭ আগস্ট থেকে খুলে দেয়া হয়েছে। ভ্রমণকালে পর্যটকসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার জন্য কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, জেলার পর্যটন শিল্পে হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ ছাড়াও এরসঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িত রয়েছে ২ লাখেরও বেশি মানুষ। তাদের জীবন-জীবিকার কথা চিন্তা করে সীমিত পরিসরে পর্যটন শিল্প খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পর্যটকদের প্রতিও কঠোর দৃষ্টি থাকবে। কেউ স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘন করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নেতৃত্বে অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি। এছাড়া কোনো কারণে সংক্রমণ বৃদ্ধি পেলে আবার বন্ধ করে দেওয়া হবে এমন সতর্কতাও রয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। সকল ব্যবসায়ীদের ৬৫ দফা দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। যদি কেউ সেই নির্দেশনা অমান্য করে, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে সতর্ক করা আছে আগে থেকেই।


কক্সবাজার হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আলহাজ আবুল কাসেম সিকদার জানান, দীর্ঘ পাঁচ মাস ব্যবসা বন্ধ থাকার কারণে বিপুল লোকসান গুনতে হয়েছে। এখন বিধি-নিষেধসহকারে হলেও পর্যটন শিল্প খুলে দেয়ায় তারা আনন্দিত। কক্সবাজারের পর্যটন অর্থনীতি আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। এতে পর্যটন সংশ্লিষ্ট অর্ধ লাখ শ্রমিক কর্মচারীর ঘরে আনন্দ ফিরে এসেছে।