জগতকল্যাণের জন্য জগজ্জননীর আগমন ও বোধন

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:১৩ পিএম, ২১ অক্টোবর ২০২০

জয়ন্ত কুমার : দুর্গাপূজায় ব্যক্তিক, সামাজিক, রাষ্ট্রিক, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক তথা আত্ম ও বাহ্যজগত সর্বক্ষেত্রে কল্যাণ চিন্তা নিহিত। মনোজগতের কুপ্রবৃত্তি অপসারণ, আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে ঈশ্বরপ্রাপ্তি ও সামাজিক রূপান্তর দুর্গা পূজার অন্যতম লক্ষ্য। পঞ্চশস্যের জলে মা দুর্গার মহা¯œানের মহিমার মাধ্যমে কৃষির প্রগতি।  পঞ্চরতেœ মা দুর্গার মহা¯œানে খনিজ সম্পদ বৃদ্ধির চিন্তা নিহিত। পঞ্চগর্ভের বা পঞ্চামৃতের জলে মহা¯œান গো সম্পদ রক্ষা ও সমৃদ্ধি। পঞ্চকষার জলে মহা¯œান বনজ সম্পদ বৃদ্ধি। পতিতার গৃহমৃত্তিকার জলে মাদুর্গার মহা¯œান পতিতোদ্ধারের চিন্তা। দুর্গোৎসব সমাজের উঁচু-নিচু, হিংসা-বিদ্বেষ ও ভেদাভেদ ভুলে বিশ্বভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শিক্ষা দেয়। ইড়া পিঙ্গলা ও সুষু¤œা তিনটি নাড়ি । দেবী দুর্গার ডান চোখ হলো সূর্য (সৃষ্টি) এবং বাম চোখ হলো চন্দ্র (সংরক্ষণ) এবং মধ্যনয়ন হলো অগ্নি (ধ্বংস)। এই তিনের সমন্বয়ে অসম্ভব শক্তি সঞ্চারিত শরীরে। আবার অন্যভাবে বলাযায় ত্রিশূল স্বত্ত্ব, রজঃ, তম ত্রিগুণের প্রতীক। আমরা যখন সাত্ত্বিকতায় আসীন হবো তখন মা দুর্গার মতো আমরা সূক্ষ্ম ও স্থূল জগতের অসুরকে (ষড়রিপু, অষ্টপাশ প্রভৃতিকে) ত্রিশূল দ্বারা বধ করতে পারব। মা দুর্গার দশহাত তথা পাঁচটি কর্মেন্দ্রিয় ও পাঁচটি জ্ঞানেন্দ্রিয়।

যা নিয়ন্ত্রিতভাবে কাজে লাগিয়ে আমরা আমাদের প্রতিটি কর্মকে দিব্যকর্মে রূপান্তরিত করতে পারব। শঙ্খ অর্থাৎ প্রণবধ্বনি যা অন্য সমস্ত শব্দকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। আমাদের শরীরের মধ্যে প্রতি মুহূর্তে  ধ্বনিত হচ্ছে, যা যোগাভ্যাস দ্বারা শোনা সম্ভব। প্রণবধ্বনি ও/অ...উ...ম অর্থাৎ  এড়ফ এ(এবহবৎধঃড়ৎ = ব্রহ্মা), ঙ(ঙঢ়বৎধঃড়ৎ =বিষ্ণু),  উ(উবংঃৎড়ুবৎ = মহেশ্বর) ব্রহ্মা, বিষ্ণু, মহেশ্বর তিনের শক্তি একত্র ‘ওঁ’ শব্দ।  মা দুর্গার তর্জনীর উপর প্রতিষ্ঠিত চক্র দ্বারা তিনি সমস্ত সংসারকে এই বার্তা দিচ্ছেন যে, ন্যায়নিষ্ঠ ও কর্তব্যপালন নিজে সুষ্ঠুভাবে পালন করে আচার্য হয়ে অন্যকে শিক্ষা দেয়া। তরোয়াল- অনন্য ক্ষুরধার বুদ্ধি দিয়ে ক্ষতিকর রিপুকে ধ্বংস করা। গদা- শুভ শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে এবং মনে রাখতে হবে জীবনে সুখ দুঃখ যাই আসুক সবই সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে প্রেরিত। মূর্তি মানে মূর্ত+ই, যিনি ঈশ্বরের গুণে গুণান্বিত তিনি মূর্তি। উৎসব হলো উৎ(উপরে),সব(সকল); অর্থাৎ সবাইকে নিয়ে উপরে উঠার(উন্নয়ন) অনুষ্ঠান। দশমীতে মা দুর্গার স্বামীগৃহে গমন মানে স্ব+আমি/স্বামী; অর্থাৎ স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির বা জীবাত্মার সঙ্গে পরমাত্মার  মিলন। মা দুর্গা পাঁচটি অসুরকে বধ করেছিলেন।  ক্ষিতি ও অপঃ হলো মধু ও কৈটভ, তেজ হলো মহিষাসুর, মরুৎ ও ব্যোম হলো নিশুম্ভ, শুম্ভ। অসুরের সঙ্গে মা দুর্গার সংগ্রাম মানে স্থূল প্রকৃতির সঙ্গে দিব্যশক্তির সংগ্রাম। যে মাসে সূর্য এক রাশি থেকে অন্য রাশিতে গমন করে না, বরং মাসজুড়ে নির্দিষ্ট রাশিতেই অবস্থান করে, সেই মাসটির নাম পরবর্তী মাসের নাম অনুসারে হয় এবং এর সাথে ‘অধিক’ শব্দ জুড়ে দেয়া হয়। বাংলায় এই অধিক মাসকে মলমাস বলে। ইংরেজি লিপইয়ারের মতো কিছুটা। এ মাসে কোনো পালনীয় তিথি বিদ্যমান না থাকায় বৈদিক কর্মকান্ড অনুষ্ঠিত হয় না। স্মার্ত পন্ডিতেরা অধিমাসকে মলমাস বা মলিনমাস বলে অশুভ মনে করেন। দুটি অমাবস্যা বা তিনটি প্রতিপদ হয় এ মাসে। এবার তিনটি প্রতিপদ হয়েছে এক মাসে। যেহেতু মলমাস তাই এ মাসে দুর্গাপূজা না হয়ে এক মাস পরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এজন্য মহালয়ার পরে একমাস প্রতীক্ষা করতে হয়েছে  মায়ের ভক্তদের।
আশ্বিনের কৃষ্ণপক্ষের বা পিতৃপক্ষের অমাবস্যা তিথিতে হয় মহালয়া। মহাভারতে কর্ণ স্বর্গ থেকে মর্ত্যে অবস্থান করে ১৫দিন পিতৃপুরুষকে  অন্নজল প্রদান করেন। তাই এটি পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত। পিতৃপক্ষের শেষদিন মহালয়া, দেবীপক্ষের মহানআলয়ে  প্রবেশ করার সুযোগ পাই আমরা তাই এ দিনকে বলা হয় মহালয়া।
আধুনিক নিউরোলজি বলছে আমাদের মস্তিষ্কের তিনটি অংশ, গোড়ার অংশটি সরীসৃপের মতো যা হঠকারী, বাধ্যকারী। মাঝেরটি স্তন্যপায়ীদের এবং বাইরেরটি প্রাইমেট মস্তিষ্ক। যেখানে একটা পুষ্পের ন্যায় সেরিব্রাল কর্টেক্স রয়েছে।  বিবর্তনের ধারায় মানুষের মেরুদন্ড যখন সোজা হলো তখন সেই পুষ্পটি বিকশিত হয় এবং আমরা মানবে পরিণত হই। এজন্য আমরা চিন্তা করতে পারি বিশ্বব্যাপী একত্ব ও সত্যানুসন্ধান নিয়ে। পুরুষপ্রকৃতির ক্ষেত্রে পুরুষ যখন নিজের স্বভাবানুযায়ী প্রকাশিত হয়ে প্রভুত্ব করতে চায়। যখন পুরুষ ও নারীশক্তির সমন্বয় ঘটে তখন মহিষাসুর বা পশুত্বের পতন হয়। নারীশক্তি বা প্রকৃতি যখন পুষ্পকে বিকশিত  করে তখন আমাদের অন্তর্ভূক্ত চিন্ময়ী শক্তির বোধন হয়। আর সকলকিছুর সাথে অন্তর্ভূক্ত বা একীভূত হওয়াই প্রকৃতির আসল রূপ। কারণ আদ্যাশক্তির অন্তরেই শিবত্ব প্রতিষ্ঠিত, তাই জগজ্জননী আদ্যশক্তির বোধন মানে শিব বা বিশ্বজনীন শুভ, মঙ্গল ও কল্যাণের জাগরণ।
লেখক: প্রভাষক -প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯১১-০৯৯৮৯৮