ধর্ষকের মৃত্যুদন্ড যে কারণে হয় না

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৫৪ পিএম, ১৮ অক্টোবর ২০২০

এড. মোঃ মনতেজার রহমান মন্টু :(১) একুশ বছর বয়সী নারীকে বিবাহ করে কিছুদিন সংসার করার পর স্বামী সৌদিতে গিয়ে ৩ বছর হলো দেশে আসে না। স্ত্রী ভিন্ন ঘরে থাকার সুযোগে মধ্যরাতে এক যুবক ঘরে আসে এবং ভোর রাতে চলে যায়। একদিন তার শাশুড়ি দেখে ফেলে। স্ত্রী স্বামীর সংসারে টিকে রাখার স্বার্থে এবং শাশুড়িকে বিশ্বাসী দেখাতে সে কান্না কাটি করে শাশুড়ির চাপে ঐ যুবকের বিরুদ্ধে ধর্ষণের মামলা ঠুকে দেন। বিচারে বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন স্ত্রী নারী যদি রাতে দরজা খুলে না দিতো তাহলে ঐ যুবক প্রতিনিয়ত ঘরে ঢুকতো পারতো না। রায়ে আসামীকে খালাস দেন।(২) ক্লাস নাইনে স্কুল পড়–য়া মেয়ে বাবার আলমারী থেকে ২ লাখ টাকা এবং মায়ের ৫ ভরি সোনার গহনা নিয়ে যুবকের হাত ধরে পালিয়ে বিয়ে সাদী করে ০৩ মাস ধরে গাজীপুর গিয়ে ঘর সংসার করছে। এদিকে বাবা এজাহার ঠুকে দিয়ে বলেন- নাবালিকা মেয়েকে জোর করে অপহরণ করে ধর্ষণ করেছে। পুলিশ ভিকটিম মেয়েকে উদ্ধার করে। মেয়েটি বাবার পক্ষে জবানবন্দী দেয়। রায়ে উল্লেখ করেনÑমেয়েটি যেহেতু প্লান করে টাকা গহনা নিয়ে স্বেচ্ছায় যুবকের সাথে চলে গেছে এবং মেডিকেল ধর্ষণ পরীক্ষা করেনি। রায়ে আরও উল্লেখ করেন, ধর্ষণ একদিন হতে পারে একাধিক্রমে ০৩ মাস ধরে হতে পারে নাÑ তাই আসামীকে খালাস দেন।  (৩) সুন্দরী পর্দানশীল নারী শহরে বাসা ভাড়া নেন। গোপনে গোপনে বহু অফিসার ঐ নারীর বাসায় যাতায়াত করেন। একদিন ঐ নারী এক অফিসারের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন। বিচারক রায়ে উল্লেখ করেন ঐ নারী দেহ ব্যবসায়ী। অফিসারের সাথে যে পরিমাণ টাকার চুক্তি হয়েছিল অথবা সে মোটা অংকের টাকা আদায় করতে চেয়েছিল ঐ অফিসার পুরুষ না দেওয়ায় এই অভিযোগ। তাই আসামীকে খালাস দেওয়া হলো।

বৃটিশ আমলে ১৮৬০ সালের দন্ডবিধির ৩৭৬ ধারামত ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন ছিল। তারপর দীর্ঘ ২৩ বছর পাকিস্তান আমলে বৃটিশ আইন অনুসরণ করা হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৮৩ সালে প্রথম নারীদের মান সম্মান ইজ্জত রক্ষার্থে নারী নির্যাতন দমন (নিবর্তক শাস্তি) অধ্যাদেশ করা হয়। ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়। দেশে নারীর সাথে ৫/৭ বছরের শিশু ধর্ষিত হলে বাধ্য হয়ে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়। সেই আইনের ৯ (১) ধারাতে ধর্ষকের শাস্তি যাবজ্জীবন শাস্তি ছিল। বর্তমান আইনে যাবজ্জীবনের পরিবর্তে মৃত্যুদন্ডের বিধান করা হলো। ৯ (২) ধারাতে আগেও মৃত্যুদন্ড ছিল এখনও মৃতুদন্ড বহাল রাখা হলো। সাবালক হতে না হতেই বিয়ের পিড়িঁতে বসানো হচ্ছে নাবালক ছেলে মেয়েদেরকে। কারণ জঘন্যতম ভিডিও চিত্র ধারণকৃত ছবি সহজ পন্থায় ইন্টারনেট ও মোবাইল ফেসবুকের মাধ্যমে উপভোগ করার সুযোগ। মাত্র ২০/৩০ টাকা দিয়ে দোকান থেকে জঘন্যতম ভিডিও সিম কার্ড কিনে মোবাইলে সারারাত দেখা হচ্ছে। এটা বন্ধের মিছিল মিটিং আন্দোলন নেই। এই মর্মে সাম্প্রতিক দৈনিক করতোয়ায় নিউজ হয়েছিল এবং মোবাইল কোর্টে দোকানির জরিমানা হয়েছে।  বর্তমান আইনে ধর্ষণের বিচার হয় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালে। এই ট্রাইব্যুনালের বিচারক হলেন জেলা জজ সম পর্যায়ের। যিনি বিচার করেন তিনি হলেন আইন দ্বারা বাধা, আবেগ কিংবা জনতার চাপে বিচার করেন না বা চাপ সৃষ্টি করে বিচার আদায় করা সঠিক হবে না। বিচারকের কাছে বাদী এবং আসামী উভয়েই সমান। দুপক্ষই ন্যায় বিচার চায়।  
জোর করে সহবাস আর মিলেমিশে সহবাস এক নয়। মাসের পর মাস যৌন সহবাস করা মহিলাকে শেষ দিন পুরুষ বিয়ে না করলেই ধর্ষণের অভিযোগ করা কি ধর্ষণ? একজন নারী যদি যৌন সহবাসে রাজী না থাকে তাহলে কোন ক্রমেই একজন পুরুষ তাকে ধর্ষণ করতে পারবে না। আর পুরুষ যদি জোর করে ধর্ষণ করতে চায় তাহলে ঐ নারীকে নাজেহাল করতে হবে, বল প্রয়োগে আহত করতে হবে, তখনি নারীর শরীরে অসংখ্য দাগ জখম থাকবে। ধর্ষণের জায়গাতে ক্ষত হবে নারী স্বাভাবিক থাকবে না। আর তা যদি না থাকে মেডিকেল পরীক্ষায় যদি তা না পাওয়া যায় বিচারক কিভাবে ফাঁসি দিবেন?  
বর্তমান আইনে যেখানে ধর্ষণের বিচার হয় সেই আদালতে শত শত ধর্ষণের মামলা বিচারাধীন। ২/৪ টি মামলা ছাড়া অধিকাংশ মামলাই আপোষ করে ফেলেছেন। যে ২/৪ টি মামলা চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সেই সকল মামলার বাদী সাক্ষী দিতে আসেন না। তার ঠিকানায় পুলিশ পান না। বছরের পর বছর সেই সকল মামলা বিচারাধীন রয়েছে। যেহেতু বাদী আসেন না তাই অন্য সাক্ষীরা আসেন না। অধিকাংশ মামলায় বাদী গোপনে গোপনে আপোষ করে জজের সামনে দাঁড়িয়ে বলে আমি ধর্ষিত হয়নি। মেডিকেলও করেন না। জজ সাহেব মৃত্যু দন্ড দিবেন কিভাবে?
বর্তমানে ধর্ষণের শাস্তি বৃদ্ধি করে মৃত্যুদন্ড করা হলো বটে সময় বেধে দেওয়া হলো বটে। কিন্তু আদালত বৃদ্ধি করা হলো না। অন্তত প্রতি জেলায় একটি করে আদালত এবং একজন করে বিচারক নিয়োগ দেওয়া জরুরী। সে শুধুমাত্র ধর্ষণের বিচার করবেন। শুধু তাই নয় নি¤œ আদালতে ফাঁসির রায় হলে আপীলে গিয়ে হাইকোর্টে গিয়ে বছরের পর বছর পরে থাকলে চলবে না। হাইকোর্টে অনেক বিচারপতি নিয়োগ এবং অসংখ্য আপীল বেঞ্চ গঠন করতে হবে। তবেই ধর্ষণ কমতে পারে। ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদন্ড হলো বটে কিন্তু বিচারে পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ না হলে বিচারক অবশ্যই খালাস দিতে বাধ্য হবেন। তাই মৃত্যুদন্ডের সাথে ১০ বছর, ০৭ বছর, ০৫ বছর পর্যন্ত কারাদন্ডের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিবেশী ভারতে তাই আছে। যখন বিচারক দেখবেন ধর্ষণ পূর্ণাঙ্গ প্রমাণ হয়নি মোটামুটি প্রমাণ হয়েছে, তখনই  ১০/০৭/০৫ বছরের কারাদন্ড দেওয়ার সুযোগ থাকবে। তাহলেই ধর্ষণ কমে আসবে।           
সর্বোপরি রাষ্ট্র রাস্তার উত্তাপ থামাতে গিয়ে চাপে পড়ে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হলো বটে। যেমন করা হয়েছিল সড়ক পরিবহন আইন তাই বলে কি দুর্ঘটনায় মৃত্যু থেমে আছে? তাই শুধু আইন থাকলেই চলবে না। ধর্মীয় রীতিনীতি, সামাজিক ব্যবস্থাও দেখতে হবে। সর্বোপরি মিথ্যা মামলা যাতে না হয় সেদিকেও কঠোর আইন করতে হবে।     
লেখক  ঃ  সাবেক স্পেশাল পিপি
নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল
০১৭১১-৪২৫৯৮১