বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষার অধিকার

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২০

রবিউল ইসলাম রবীন: শিশুদের বা শিক্ষার্থীদের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে যাচ্ছি। ছয় মাসেরও অধিক দিন তাঁরা স্কুলে যেতে পারছে না। যদিও তাঁদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে দেশের সব স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনা মহামারীর কারণে তা করা হয়েছে। বর্তমান বাস্তবাতায় তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা বিশাল এক দুশ্চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকার যদিও এই বিষয়ে কারো মতামত চায়নি, তারপরও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা বিভন্ন স্তরের মানুষের মধ্যে স্কুল খোলা না খোলা নিয়ে ব্যাপক মতামত দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করে অনলাইন ক্লাস চলছে। টেলিভিশনে বিভিন্ন শ্রেনীর পাঠদান শুরু হয়েছে।
কিন্তু আমার সাথে একমত হবেন যে, বিকল্প ব্যবস্থায় শিক্ষার অধিকার হিসাবে এখন যা আমরা করছি তা যথেষ্ট নয়। শিশুদের প্রাপ্যর ক্ষেত্রে আমরা সব করতে পারছি না। আমরা অনেকটা অসহায় হয়ে গেছি। করোনা আমাদের সবার জন্য নতুন এক বাস্তবতা তৈরি করেছে। যদিও বাংলাদেশের মানুষ প্রতিকুল পরিস্থিতিতে হতোদ্যম হয় না: তারা বন্যা, ঝড়, ভাঙন, জলোচ্ছ্বাস এবং নানা রোগ-বিপর্যয় মোকাবেলা করেই বেঁচে থাকে। তবে সবার আগে বিবেচনা করতে হবে বেঁচে থাকার বিষয়টি। বেঁচে থাকলেই তো শিক্ষার প্রশ্নটি আসবে। তাই সাহস করে বলা যায়,স্কুল চালাতে হলে আমাদের অপেক্ষা করতে হবে কার্যকর ভ্যাকনি প্রাপ্তি পর্যন্ত। বর্তমান সময়ে গত জুন থেকে বিশ্বে সফলভাবে স্কুল পরিচালনা করছে এমন দুটি দেশ হলো রাশিয়া ও ডেনমার্ক। এই দুটি দেশের শিশুরা মাস্ক পরছে না, জোর দিয়েছে ঘন ঘন হাত ধোয়ার ওপর আর দুরত্ব রক্ষা করে চলছে। সুরক্ষার উপযোগী মাস্ক দীর্ঘক্ষণ রাখলে শিশুদের অ´িজেনের ঘাটতি হতে পারে, সেটি তাঁরা বিবেচনায় এনেছে হয়তো। তবে তাঁরা স্কুল খোলার ঝুঁকিটা নিয়েছে স্কুল ও শ্রেনীপিছু শিক্ষার্থীর সংখা কম বলে।  আবার শিক্ষার্থী -শিক্ষক অনুপাত ঠিক থাকায় স্কুল চলার সময় শিক্ষার্থীদের নজরদারিও সম্ভব হয়েছে। আমাদের বাস্তবতায় এ প্রায় অসম্ভব। দুরত্ব ও সংস্পর্শ বাঁচিয়ে চলা অনেকের চর্চিত মূল্যবোধের পরিপন্থী। আমাদের দেশের জনসংখ্যার বড় অংশই এ ধরনের কঠিন পরিস্থিতিতে নিজের করণীয় পালনের চেয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপনে আগ্রহী। তার প্রতিফলন আমরা এখন প্রায় সর্বত্র দেখছি। এ অবস্থায় যথেষ্ট সতর্কতা ও সবার সচেতনতার মান কাছাকাছি না এলে বিচিত্র পেশা,শিক্ষা, পারিবারিক পরিবেশ থেকে আসা শত শত শিক্ষার্থীকে এক জায়গায় আনা ও তিন ঘন্টা রাখা হবে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। বড়দের কথা আলাদা,কিন্তু শিশুদের জীবন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা একেবারেই চলে না। তাছাড়া আসন্ন শীতকালে অন্যান্যদের মতো শিশুদেরর গোসল, কাপড় কাঁচা, হাতধোয়ার প্রবণতা কমে যাবে। বিশেষজ্ঞরা ভাবছেন, শীতে করোনা বাড়তে পারে। ২০২১ সালে শিশুরা যখন স্কুলে ফিরবে, তখনো হয়তো প্রতিবেশে এবং ওদের মনজুড়ে থাকবে দুর্বিষহ সময়ের স্মৃতি ও আতঙ্ক। কীভাবে তাদের এ থেকে মুক্ত করা যাবে,একটু সানন্দে কাটানোর উৎফুল্ল সময় দেওয়া যায়, তা নিয়ে এখনই ভাবতে হবে। শিশুদের খুশি করতে নতুন বছরে বিনা মূল্যে দুটি করে মজাদার মাস্ক আর একটি করে রংচঙে গল্পের বই দেওয়ার ব্যবস্থা হোক।
করোনা বন্ধের সময় থেকেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে মূলধারার বেসরকারি স্কুলগুলি। এ রকম কোন স্কুলই শিক্ষকদেও পূর্ণ বেতন দিতে পারেন নি। কিছু  স্কুল আংশিক দিয়েছে,অনেক স্কুল বেতন ছাড়া চাকরি বজায় রাখছে,অনেকে বিদায় জানিয়েছে। এসবের প্রকৃত পরিসংখ্যান কি সরকারের জানা আছে? এসবের কোন সুরাহা না করে স্কুল খোলা হলেও কিন্তু সবার জন্য শিক্ষা কার্যক্রম নিশ্চিত করা যাবে না। সরকার শিল্প ও কৃষি খাতে প্রণোদনা দিলেও শিক্ষা খাতে প্রাতিষ্ঠানিক কোন সহায়তা দেয়নি। ফলে শিক্ষায় বেসরকারি বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলি এখন রীতিমতো ভঙ্গুর অবস্থায় আছে। মনে রাখতে হবে, দেশের শিক্ষার বড় একটি অংশই বেসরকারি খাতের অধীনে চলে গেছে।
পরিশেষে, জাতির উদ্দেশ্যে যা বলা দরকার, সমগ্র শিশুদের নিয়ে ভাবতে হবে। ছয়মাস গৃহবন্দী থাকার অভিজ্ঞতা ওদের মনের ওপর কী রকম চাপ তৈরি করতে পারে, তা অবশ্যই গুরুত্বের সাথে ভাবতে হবে। আপাতত শিশুদের নিজগৃহে  রেখে পড়াশুনা চালিয়ে নিতে হবে। শিশুদের আনন্দে রাখতে হবে।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক-কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫