মালিথালোক ও স্মৃতির খেরোখাতা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:০০ পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০২০

হাসনাত মোবারক :আমাদের একজন প্রফেসর নাছিম-উদ্দিন মালিথা ছিলেন। তিনিও চলে গেলেন। স্যার ক্ষমা করবেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২০ তারিখে শাহজাদপুর কাকলী সিনেমা হলের সামনে দাঁড়িয়ে আছি। দুম করে মাইকের আওয়াজ। বুকের ভেতরটা ছ্যাত করে উঠলো।  আহারে! এমন বিশেষণের মানুষ শাহজাদপুরের তো একজনই আছেন। তিনি প্রফেসর নাছিমউদ্দিন মালিথা। করোনা আক্রান্তের সংবাদটি মাইকে প্রচার হচ্ছিল। মনকে বুঝিয়েছিলাম। অনেকেই তো করোনায় আক্রান্ত হওয়ার পর সুস্থ হয়েছেন।  তিনিও ফিরবেন। কিন্তু তিনি আজকে না ফেরার দেশে পাড়ি জমালেন। সরকারি আজিজুল হক কলেজে স্যার বাংলা পড়াতেন। বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন না। স্যার বাবু ভাইয়ের শিক্ষক। সেইসূত্রে স্যারের সঙ্গে আমার যোগাযোগ। যার স্নেহের পরশে ধন্য । শিল্পসাহিত্যে নিয়ে আলোচনা। দুঃসময়ে স্যারের কাছে গিয়ে বসে থাকলেও প্রশান্তি পেতাম। তার লেখা ‘বাংলা বানানের টুকিটাকি’ বইটি নতুন করে প্রকাশের ব্যাপারে কথা হচ্ছিল।
আমার ব্যস্ততা প্রকাশকদের অপারগতা। আমাকে আসলে লজ্জায় ফেলে দিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তার অসাধারণ চিন্তালোক। যেটা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। প্রবন্ধের পাশাপাশি তিনি কবিতাও লিখতেন। তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পাঠের ভূমিকা, সাহিত্য ও সাহিত্যিক, আমারেই পাবে তুমি ইহাদের ভিড়ে, বুকের ভেতর পোষাপাখি এবং বাংলা বানানের টুকিটাকি। বাংলা বানানের টুকিটাকি বইটি স্যার আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। তবে তার বেশির ভাগ লেখাই তিনি গ্রন্থভুক্ত করে যেতে পারেননি। তার গ্রামের বাড়ি রাজশাহীতে। পেশাসূত্রে তিনি শাহজাদপুর এসেছিলেন। শাহজাদপুর শহরে বাড়ি করেন। শাহজাদপুরের মানুষের একান্ত আপনজন হয়ে উঠেন। জীবদ্দশাতে তিনি শাহজাদপুরের মানুষের অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পেয়েছেন। তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেওয়ার পরও শিক্ষকতা যে একটি নেশা। সেটা প্রমাণ করেছেন। শাহজাদপুরে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে সমস্ত সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে যে মানুষটির সদাপরামর্শ। যে মানুষটির জ্ঞানগর্ভ কথা শোনার জন্য মুখিয়ে থাকতো। সেই মানুষটি আজ আমাদের ছেড়ে দূরে চলে গেলেন।  শাহজাদপুর শহরটি আমার কাছে অপরিচিত ছিল। খুব একটা যেতাম না। যাওয়া হতো না। স্যারের সঙ্গে আমার যোগাযোগের পর শাহজাদপুর মানে স্যারের বাড়ি। মালিথালোক। বৃষ্টিমধুর ছন্দে টিনের চাল গড়িয়ে একটা দুপুর মিশে গেছে রবীন্দ্রসঙ্গীতে। ফরাসি চিত্র-লোকে। শিল্পের নানান অনুসঙ্গ নিয়ে স্যারে সঙ্গে আলাপ হতো। বাসার ঠিকানা ভুলে যাওয়া আমার স্বভাব। স্যারের বাসার নাম ছিল,‘মালিথালোক।’ দ্বতীয়বার কাউকে তো বলা যায় না, আপনার বাসাটা যেন কোন জায়গায়।
আমি স্যারের বাসাটি চিনে নিতাম। গার্লস স্কুলের পরে রেজিস্ট্রি অফিস। সামনেই যে গলি। ওই গলি ধরেই এগোলোই মোড়ের মাথায় একটা কিন্ডার গার্টেন স্কুল। ডানেই মোড় নিয়ে আঁকা বাঁকা গলি। এই গলি, সেই গলি। এর পরই পেয়ে যেতাম নামফলক ‘মালিথালোক’। আমার স্মৃতিফলকে স্যারের মিষ্টি মধুর কথাগুলো খুব করে বাজছে। আমার লেখা কবে কোন পত্রিকায় পড়েছেন। সেসব নিয়ে কথা। আমার লেখার শব্দ চয়ন ভালো লাগতো। লেখার শিরোনামের সাথে বিষয়বস্তু। আমি যেন লেখাটি চালিয়ে যাই। স্যারের যে কথাটি আমার সারাজীবন মনে থাকবে, বিল সেচে মরে একজন আর কই খায় অন্যজন। ’হ্যাঁ। এই আদর্শবান মানুষটি আমাকে বলেছিলেন, তোমাদের মতো সংস্কৃতিমনস্ক ছেলেরা ইউনিভার্সিটিতি থাকলে আমার স্মৃতি থাকবে’ স্যারকে আশ্বস্ত করে বলেছিলাম, স্যার দোয়া করবেন। যেখানেই থাকি আপনার আদর্শ যেনো লালন করি। ঢাকার স্যারের মেয়ের ইস্কাটনের বাসায় একদিন যেতে বললেন। পরের দিন সকালেই উপস্থিত হলাম। কোথায় কী করছি। জানলেন তিনি। কিছুটা আফসোসের স্বরে বলেছিলেন, ‘মিডিয়ার চাকরিতে তো ভরসা নাই। এরপরও দেখো তুমি।’
আমার ওই সময় নোট করার অভ্যাস ছিল না। তবে মনে পড়ে কোনো এক ১৩ আষাঢ়। স্যারের বাসায় রীতিমতো আড্ডা দিয়েছিলাম। এরপর কোন দিন, কোন মাস, কী বার, এসব মনে নাই। কত যে গিয়েছি। তার হিসাব নাই। স্যারের বাসায় গিয়ে রোজ যে ফলটা খেতাম, সেটা তরতাজা আম। লাল টকটকে আম। প্লেট ভরে সামনে দিয়ে বলতেন, খাও। গাছের আম।
আমার শৈশবের এক বন্ধুকে নিয়ে স্যারের বাসায় গিয়েছিলাম। মিষ্টি আমের লোভ দেখিয়ে বললাম চল, স্যারের বাসায় যাই। সেবার ওকে আম খাওয়াইয়া নিয়ে আসলাম। এরপর থেকেই দেখা হলে বন্ধু বলে, তোর ওই স্যারের বাসায় যদি যাস, আমাকে জানাস।’ হ্যাঁ। এর পর থেকে স্যার বেশিরভাগ সময় ঢাকাতে কাটিয়েছেন, না হয়, খুব অসুস্থ ছিলেন। আজ প্রফেসর নাছিমউদ্দিন মালিথা স্যার জাগতিক মায়া ও মোহ কাটিয়ে চলে গেলেন। অনেক দূরে। স্যারের জন্য শ্রদ্ধা ও সমবেদনা।  
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-কবি
০১৭৫০-৯৩৬৯১৯