সুশীল সমাজ বিনির্মাণে শিক্ষক

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৫:৫৩ পিএম, ১৬ অক্টোবর ২০২০

মোঃ মোকছেদ আলী : শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। যে জাতি যত শিক্ষিত সে জাতি তত উন্নত। জ্ঞান অন্ধকার-কুসংস্কার দুর করে শুদ্ধাচার, শৃংখলাবোধ, নৈতিকতা আনয়ন করে বলেই জ্ঞানই শক্তি। জ্ঞানে বড় জাতি, মন ও ঐশ্বর্য্যে বড় হয়। জগৎ ও জীবন কে জানার তাগিদ আবহমান কাল থেকে। জ্ঞান আহরণ ও বিতরণকারী শিক্ষক হিসেবে পরিচিত। এ কারণেই শিক্ষক কে বলা হয় জাতির অভিভাবক। সুশীল সমাজ গঠনে অবদান রাখতে পারে একজন আদর্শ শিক্ষক। সংকীর্ণতা, স্বজনপ্রীতি, তোষামোদী, সত্যকে আড়াল করা থেকে বিরত থেকে, মুক্ত, উদার, বুদ্ধি ভিত্তিক, অসাস্প্রদায়িক, প্রগতিশীল চিন্তা চেতনা বোধ সম্পন্ন শিক্ষক দ্বারা গড়ে উঠে সুনির্মল পৃথিবী, উন্নত সমৃদ্ধ মানবিক গুণ সম্পন্ন ন্যায় ভিত্তিক সমাজ। কাঁদামাটির মত শিশু তার মনমানসিকতা, চিন্তা চেতনা, আদর্শ সবকিছুই আবর্তিত, বিবর্তিত, নিয়ন্ত্রিত হয় শিক্ষকের দ্বারা। রূপকল্প ২০২১ এবং ২০৪১ সালের ভিশন-মিশন বাস্তবায়নের জন্য ধর্মীয় গোঁড়ামী, দলীয় দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা, অনুরাগ-বিরাগ, পরমত অসহিষ্ণুতা, সাম্প্রদায়িকতা চ্যালেঞ্জগুলোর উত্তরণ প্রয়োজন।

লক্ষণীয় প্রাচীনকাল থেকে শুরু করে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টোটল ও বরেণ্য কবি, সাহিত্যিক, বৈজ্ঞানিক, দার্শনিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষাগুরুদের কর্মপ্রচেষ্টা ও পথনির্দেশনায় বিনির্মাণ হয়েছে আজকের সমাজ ব্যবস্থা। আত্মপ্রত্যয়ী, উন্নত, সমৃদ্ধ, মর্যাদাশীল সমাজ নির্মাণে শিক্ষকের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনপূর্বক অভিজ্ঞতাকে শাণিত করে আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা করতে হবে। বর্তমান প্রজন্ম পাঠাগারে পাঠাভ্যাস ছেড়ে শুধুমাত্র যন্ত্র নির্ভর (বিশেষত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম) দিকে ঝুঁকে পড়ছে তাতে নেতিবাচক বিষয়গুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বিপথগামী হচ্ছে যা আমাদের জন্য অশনি সংকেত। শিক্ষার্থীর শারীরিক, মানসিক, নৈতিক, মানবিক, নান্দনিক, আধ্যাত্মিক ও আবেগিক বিকাশ সাধন করা এবং তাদের দেশাত্ম বোধ বিজ্ঞান মনস্কতায়, সৃজনশীলতায় ও উন্নত জীবনের স্বপ্ন দর্শনে উদ্বুদ্ধ করে মাটি ও মানুষের প্রতি জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতা গুণ অর্জনে শিক্ষক তাঁর আচার-আচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলনে, কথা-বার্তায়, জীবন-যাপনে উন্নত রুচিবোধ গড়ে তুলে শৈল্পিক, নান্দনিক সৃজনশীল, শৃংখলাবোধ সম্পূর্ণ  সমাজের দর্পন হিসেবে উপস্থাপন করতে আত্মসচেতনতা (ঝবষভ অধিৎবহবংং), সহমর্মিতা (ঊসঢ়ধঃযু), আন্তঃব্যক্তিক দক্ষতা (ওহঃবৎ ঢ়বৎংড়হধষ ঝশরষষ), বিশ্লেষণ ক্ষমতা (ঈৎরঃরপধষ ঞযরহশরহম), সৃজনশীল চিন্তন দক্ষতা (ঈৎবধঃরাব ঞযরহশরহম), সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা (উবপরংংরড়হ গধশরহম), সমস্যা সমাধানে দক্ষতা (চৎড়নষবস ঝড়ষারহম), আবেগ নিয়ন্ত্রণ (ঈড়ঢ়রহম রিঃয বসড়ঃরড়হ), মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ (ঈড়ঢ়রহম রিঃয ংঃৎবংং), যোগাযোগ দক্ষতা (ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ ঝশরষষং) বিষয়গুলো অনুশীলন করে জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। অপার সম্ভাবনার দেশ বাংলাদেশ। জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি কর্মক্ষম তরুণ। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টেকসই উন্নয়ন করে বাংলাদেশকে উন্নত বিশ্বের কাতারে উন্নীত করতে শ্রম বাজারের ক্ষেত্র প্রসারের লক্ষ্যে শিক্ষা ক্ষেত্রে আমুল পরিবর্তন আনতে হবে। সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মমূখী বৃত্তিমূলক শিক্ষা কার্যক্রম জোরদার ও প্রসার করতে হবে। বেকারত্ব সমস্যার কারণে হতাশা, অস্থিরতা, নেতিবাচক কাজে ঝুঁকে পড়ছে বর্তমান প্রজন্ম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনা ঠিক রেখে কর্মমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা অন্তর্ভূক্তি করে কামার-কুমার, নাপিত, রাজমিস্ত্রি, ফিটিংÑওয়ারিং, ইলেকট্রনিকস, গার্মেন্টস, কৃষি যন্ত্রপাতি প্রভৃতি বিষয়ের উৎপাদন ও রক্ষণাবেক্ষণ, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৃষ্টির জন্য কোর্স/ক্যারিকুলাম প্রণয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক সনদপত্র প্রদান করতে হবে শুধুমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ না থাকায় হজ্ব মৌসুমে আমরা নাপিত প্রেরণ করতে পারিনা।

 আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি ছাড়া চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টিকে থাকা সম্ভব হবে না। নতুন করে যত্রতত্র সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসারে ব্রত না হয়ে যে সমস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এখনও নন-এমপিও(ঘড়হ-গচঙ) তাদের এমপিও (গচঙ) ভূক্ত করে এখন শুধুমাত্র বৃত্তি মূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনপূর্বক ক্যারিকুলাম/কোর্স প্রবর্তন করে জনশক্তির দক্ষতা বৃদ্ধিতে যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ফলাফলে শুধু মাত্র সর্বোচ্চ গ্রেডিং প্রাপ্তির অসম প্রতিযোগিতায় না করে কিভাবে দেশপ্রেমিক, সৎ, যোগ্য নাগরিক হবে সেদিকে মনোনিবেশ করতে হবে। পরীক্ষা পদ্ধতির মূল্যায়নের ক্ষেত্রে আনতে হবে ব্যাপক রদবদল। পাবলিক (এস.এস.সি ও এইচ.এস.সি) পরীক্ষার ফলাফলে পাশের হার নিয়ে আন্তঃবোর্ডের অসম প্রতিযোগিতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তছাড়া শিক্ষকদের গুণগত মানোন্নয়নে প্রশিক্ষণ শিবিরের ব্যবস্থা জোরদার ও প্রসার ঘটাতে হবে। ক্যাকিুলাম প্রবর্তনের পূর্বেই শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, মতামত গ্রহণ করতে হবে। পরীক্ষামূলক ক্যারিমুলাম যত্রতত্র যখনতখন প্রবর্তনে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

সর্বোপরি সব কিছুর উর্ধ্বে শিক্ষক সমাজকে এ প্রজন্মকে দক্ষ, অভিজ্ঞ, দেশপ্রেম বিশিষ্ট, যোগ্য নাগরিক বা আদর্শ চরিত্র গঠনে স্ব-উদ্যোগে দায়িত্ব নিয়ে নিরলসভাবে আত্ম নিয়োগ করতে হবে। ব্যবসায়িক মনোভাব পরিহার করে (কোচিং বাণিজ্য, প্রাইভেট) শিক্ষকের মর্যাদা শিক্ষক সমাজকেই রক্ষা করতে হবে। হারানো সম্মান পুনরুদ্ধার করতে হবে শিক্ষককেই। পরিশেষে মহান কারুনিক, অক্ষয়, অব্যয়, অনন্ত, অসীম, কৃপানিধান, আদি-অন্ত, অন্তর্যামী, চিরঞ্জীব, চিরস্থায়ী চির সুন্দর দয়াময় প্রভুর নিকট প্রার্থনা, তুমি আমাদেরকে শক্তি দাও, সাহস দাও; আমরা যেন এ প্রজন্মকে দক্ষ অভিজ্ঞ করে উন্নত বিশ্বের কাতারে বীর বেশে, বীর দর্পে মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারি।
লেখক: অধ্যক্ষ, আক্কেলপুর মুজিবর রহমান সরকারি কলেজ,
জয়পুরহাট।