সামাজিক অবক্ষয়ের শেষ ধাপে আমরা!

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:০৩ পিএম, ১৫ অক্টোবর ২০২০

নার্গিস জামান : খুব আপত্তিকর একটি শব্দ, যা উচ্চারণ করতেও অস্বস্তি হয়। এড়িয়ে যাই যেন বলতে না হয়; সেটির চর্চাই চলছে রাষ্ট্রে এখন। কি ভয়ানক অবস্থা! মা-বোনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ সবাই। কি সরকার, কি বাপ-ভাই-স্বামী! একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ২০২০ সাল কি ধর্ষণ বর্ষ হতে যাচ্ছে! এ শব্দটি মুখে আনতেও রুচিতে বাধে! চট্টগ্রামের রাউজানে ৭৫ বছরের যুবক ১১ বছরের শিশু নির্যাতন করে ৫০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দেয়! অবক্ষয়ের বাকি রইলো কী? সামাজিক অবক্ষয়ের শেষ ধাপে পৌঁছে গেছি আমরা! এই বিষয়ে লিখতে গেলে বার বার কিছু আপত্তিকর শব্দ এসে যাবে বলে লিখতে চাইনি কখনোই। বেগমগঞ্জের ঘটনা সবার জানা আছে। এ রকম বর্বরোচিত নির্যাতন বুঝি জাহেলিয়াতের যুগেও হয়নি। হার মানালো বাংলার কিছু অসভ্যরা আইয়্যামে জাহেলিয়াতকেও! একজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর পরাজয়ের অন্যতম কারণ ছিল ধর্ষিতা মা-বোনদের আহাজারি-অভিশাপ সেই আবহ এখন স্বাধীন বাংলাদেশে। এরপর কি? এরপর আর কী? নিজ দেশেই এখন বেহায়ারা স্বাধীন, বাকি সব পরাধীন। বিশেষ করে নারী ও শিশুরা। শিশু, প্রৌঢ়া বৃদ্ধা কাউকেই রেহাই দিচ্ছে না কুলাঙ্গাররা। কাতর মা বোনের আর্তি, ঝঞঙচ ঝঊঢটঅখ ঠওঙখঊঘঈঊ. স্বাধীন দেশে আজ আবার নতুন করে এই আর্তনাদ করতে হচ্ছে কেন?
দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটছে একের পর এক অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা। সিলেটে এমসি কলেজে স্বামীর কাছ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে স্ত্রী নির্যাতন, তার আগে স্বামীর জন্য রক্ত যোগাড় করতে যাওয়া এক নারী গণধর্ষণের শিকার। খাগড়াছড়িতে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিকে ধর্ষণ করেছে দুর্বৃত্তরা। বেগমগঞ্জ সহ সারাদেশে যেন চলছে অসভ্যদের যৌন তান্ডব! ধর্ষণের মত নোংরা গর্হিত অপরাধটি সারা বছর লেগেই আছে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, গত সাড়ে চার বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার নারী এই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ২০২০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সারাদেশে ৮৮৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ধর্ষণের পরিসংখ্যান দিতে গেলে বই রচনা হয়ে যাবে। শুধু এটুকু উল্লেখ্য, চলতি বছরের জানুয়ারিতে সারা দেশে ৯৮টি, মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে ২৫৭টি, এপ্রিলে ৭৬, মে মাসে ৯৪টি, জুনে ১৭৪, জুলাই ১৪০, আগস্টে ১৪৮টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এর বাইরেও অনেক আছে যার সংখ্যা জানা যায় না। কারণ এই বিষয়টি নিয়ে সকলে আইনি সহায়তা নিতে যায় না কলঙ্কের ভয়ে। অনেক সময় সামাজিক ও মানসিক চাপ সইতে না পেরে ভিকটিমের আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটে থাকে।
যুবক, বৃদ্ধ কেউ কম নয়। ’৭৫ বছরের বৃদ্ধও যুবকের মত আচরণ করছে! রাজশাহীর গির্জায় তরুণী নির্যাতিত হয়েছে। ভাবা যায়! এ অপকর্মের দায়ে আটক হয়েছেন একজন ফাদার। কওমি মাদ্রাসায় মেয়ে শিশুসহ ছেলে শিশুরাও জাহেল কিছু শিক্ষকের দ্বারা নির্যাতিতের খবর প্রায়ই গণমাধ্যমে আসছে। দিন দিন আমরা কোথায় যাচ্ছি! মন্দির, মাদ্রাসা, গির্জা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কেন নিরাপত্তাহীন? ফাদার, পুরোহিত, শিক্ষক, হুজুর এমনকি ছাত্ররাও দাঁত খিচিয়ে পশুবৃত্তি মেটাচ্ছে। সমাজ বিজ্ঞানীদের মতে, নীতি নৈতিকতার অভাব, মাদকের কুফল, আইনের শাসনের যথাযথ প্রয়োগাভাব বিচারহীনতা, রাজনৈতিক প্রভাব পারিবারিক ও প্রতিষ্ঠানিকভাবে নৈতিক শিক্ষার অভাব সামাজিক এই অবক্ষয়ের প্রধান কারণ। সকল ধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা বইয়ে শান্তি ও নৈতিকতার কথা আছে। যা পাঠ্যসূচিতে সংযোজিত। কিন্তু অভিভাবক ও শিক্ষকরা এ বিষয়টির গুরুত্ব দেন না। গণিত ইংরেজি, বিজ্ঞান পড়তে পড়তে সন্তান মানবিকতা ও নৈতিক শিক্ষার অভাবজনিত কারণে মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে ফেলে। তাদের মধ্য কেউ হয় খুনি, কেউ নেশাখোর, কেউবা রেপিস্ট। এক জ্ঞানী ব্যক্তি বলেছিলেন, সন্তানকে এই বাক্যটি শেখানো দরকার, মনুষ্যত্ব শিক্ষাটাই চরম শিক্ষা, সমস্তই তার অধীন। অর্থাৎ মনুষ্যত্ববোধ যার থাকবে তার মধ্যে সকল ন্যায়, নৈতিকতাও থাকবে।
আমরা জানি, প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম পন্থা। জাতিসংঘ নারী সংস্থা বা ইউএন উইমেন ২০১৯ সালের নভেম্বরে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে যার শিরোনাম, ধর্ষণ চর্চার বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ১৬টি উপায়। প্রতিবেদনের শুরুতে কয়েকটি হাইপোথিসিস বা অনুসিদ্ধান্ত আছে, সেগুলো মানুষের গতানুগতিক ভাবনার প্রকাশ যেমন, ছেলেরা তো ছেলেই, তারা ব্যাটাগিরি দেখাবেই। ধর্ষিতা নেশাগ্রস্ত ছিল পোশাক ঠিক ছিল না। নারীর না বলা আসলে হ্যাঁ বলা। প্রতিবেদনটি মূলত সারা বিশ্বের বাস্তবতার একেকটি দিকে ফোকাস দিতে চেয়েছে। জাতিসংঘের নারীসংস্থার ধর্ষণের বিরুদ্ধে ১৬টি পরামর্শের অন্যতমটি ছিল, ইম্পিউনিটির বিপক্ষে দাঁড়ানো। অর্থাৎ ঋৎববফড়স ভৎড়স ঃযব রহলঁৎরড়ঁং পড়হংবয়ঁবহপবং ড়ভ ধহ ধপঃরড়হ. এটাকে রোধ করা। বা দায়মুক্তির বিপক্ষে দাঁড়ানো। বলা হয়েছে ঊহফ ড়ভ রসঢ়ঁহরঃু দায়মুক্তির সমাপ্তি ঘটানো। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে চমৎকার ব্যাখ্যা দিয়েছেন অধ্যাপক হেলাল মহিউদ্দীন। তিনি বলেন, আমার কি করতে পারবে দেখি! সকল সময়ে সরকারে থাকা দলের কর্মীদের এই ভাবনার সঙ্গে সবাই পরিচিত। যুগে যুগে এক শ্রেণির প্রভাবশালী ছাত্র না হয়ে গুন্ডা, ধর্ষক, ডাকাত হয়। কেন হয়? দায়মুক্তির সুযোগ থাকায় হয়। পেশি তথা ক্ষমতার জোরের কারণে হয়। এই বিশ্বাসের জোর। সিনিয়র নেতারা যারা ছাত্রদের স্বীয় স্বার্থসিদ্ধিতে ব্যবহার করেন তাদের আস্কারা ও মদদের জোর, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নীরব থাকার জোর। এ সকল জোরই ছাত্রদের ওসঢ়ঁহরঃু উদাহরণ স্বরূপ তিনি ১৯৯৩ সালের জাবিতে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রদের মধ্যে মিতুল, জাপান, সীমান্তের টিমসহ ছাত্রী অপহরণ ও লাঞ্ছনা এবং ১৯৯৮ সালে জাবির জসিম উদ্দীন মানিকের ধর্ষণে সেঞ্চুরির ন্যক্কারজনক ঘটনার উল্লেখ করেন। ২০০০ সালে থার্টি ফাস্ট নাইটে একদল ছাত্র টিএসসিতে এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করলে সেবারও উল্টো শাস্তি মিলে ছাত্রীদেরই। এরকম নজীর সর্বত্র এবং প্রতিটি ধর্ষণ অপরাধেই নারীকে দায়ী করে বিচার পরিচালিত হয়। তিনি ধর্ষণ রোধে চারটি দিক নির্দেশনা দেন। ১) ধর্ষকদের শরীর থেকে রাজনীতির পোশাকটি সরিয়ে ফেলা। ২) ইম্পিউনিটি বা আমি ধরা ছোঁয়ার বাইরে। এরকম ভাবার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়া ৩) ক্ষমতার রাজনীতিতে স্থান করে নেওয়া নারীরা রাজনীতির সুবিধাভোগী হয়ে, এই দুই শ্রেণির দুস্কর্মে নীরব থাকবে না তা নিশ্চিত করা। তিনভাগ ধর্ষণ এতেই কমে যাবে। ৪) বাকি একভাগ ধর্ষক যারা হ্যাবিচুয়াল রেইপিস্ট তারা এমনিতেই ধরা পড়বে। নারীরাই তাদের মোকাবিলা করবে যদি আস্থা জন্মায় যে, দেশের মানুষ রাজনীতিকে ব্যবহারকারী গুন্ডাদের আর ভয় পাচ্ছে না।
একজন নোন ফেস সেলিব্রেটি তার পেইজে বলেছেন, ধর্ষণ হচ্ছে একটি সেক্সুয়াল ক্রাইম বা সেক্সুয়াল ভায়োলেন্স, আদতে ধর্ষণ কোন যৌনতা নয়; এটা পুরুষের ক্ষমতার অপব্যবহার। দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থা যখন ক্রিমিনাল ফ্রেন্ডলি হয়ে উঠে, মূলত তখন অনিয়ন্ত্রিত ও মাত্রাতিরিক্ত উগ্র ক্ষমতার জোরেই এরা ধর্ষণের সাহস করে। অর্থাৎ জনগণও জাতিসংঘের মত রসঢ়ঁহরঃু ইম্পিউনিটিকেই ধর্ষণের অন্যতম কারণ মনে করছে। আইনমন্ত্রী গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, বর্তমান আইনে ধর্ষণের সাজায় পরিবর্তন এনে তা মৃত্যুদন্ড করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ইত্যাদির পরিচালক হানিফ সংকেত গণমাধ্যমে বলেন, ধর্ষকদের বিরুদ্ধে দাবি একটাই, বিচারে দীর্ঘসূত্রতার জটিল জট ভেঙে দ্রুততম সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ শাস্তির নিশ্চয়তা। ধর্ষকদের রক্ষা নেই, সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। এটি সকল জনগণের মনের কথা বলে পরিলক্ষিত হয়, তাদের দেওয়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের সংবাদের কমেন্টে। এ কথা যথার্থই, রাজনীতিকে ঢাল বানানো ধর্ষকদের যে কোন রকম দায়মুক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কোন বিকল্প নেই। তবে পারিবারিকভাবেও সচেতন হতে হবে। আমাদের পরিবারে একজন ধর্ষক গড়ে উঠল আর আমরা কেউ টেরই পেলাম না! এটা যেন না হয়। কারণ বর্তমান আইনে এর সাজা মৃত্যুদন্ড।
পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনা করে পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। নইলে কখন নিজেদেরই ভিকটিম হয়ে যেতে হয়, বলা যায় না! সময় খারাপ যাচ্ছে। কিছু শকুন স্বভাব মানুষের কারণে ৭১ এর মত মা, বোন, মেয়েকে লুকিয়ে রাখার অন্ধকার সময় চলছে যেন! নিজের ছেলে সন্তানটিকে নৈতিক শিক্ষা দিন, না শুনলে পিটিয়ে বের করে দিন। পরিবার থেকেই ন্যায় বিচার শুরু হলে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ করতে হয় না। নৈতিকতা বিবর্জিত সামাজিক অবক্ষয়, শুধু প্রাতিষ্ঠানিক আইন দ্বারা সমাধান করা সহজ হয় না। পরিবার হলো নৈতিক মানব তৈরির সুতিকাগার। ঘরে ঘরে অভিভাবকরা সতর্ক না হলে আইয়্যামে জাহেলিয়াত দেখতে হতে পারে। তবে, বিচারিক আইনেও অপরাধীদের শাস্তি কঠোরভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়া দরকার, যাতে পরবর্তীতে অন্যায় করার আগে সাতবার ভাবতে বাধ্য হয় অসভ্যরা যে মৃত্যুদন্ড নিশ্চিত!।
লেখকঃ শিক্ষক-প্রাবন্ধিক
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭