সুশাসন ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:৪৫ পিএম, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০

আতাউর রহমান মিটন: মাথা নষ্ট হওয়ার মত একটি সংবাদ হচ্ছে,‘খিচুড়ি রান্না শিখতে ১ হাজার কর্মকর্তাকে বিদেশে পাঠানোর প্রস্তাব’ দিয়েছে সরকারের প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর (ডিপিই)। পরিকল্পনা কমিশন থেকে এর অনুমোদন পাওয়ার চেষ্টা করছে অধিদপ্তর। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে। জানা গেছে, ডিপিই প্রাথমিকভাবে বিদেশ যাত্রার জন্য পাঁচ কোটি টাকা চেয়েছে। এছাড়া দেশেই প্রশিক্ষণের জন্য আরো ১০ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। জনগণের কষ্টের টাকার এমন তুঘলকি ব্যবহারের কথা জানার পরে ‘মাথা নষ্ট’ না হয়ে উপায় কী? তবে কপাল ভাল যে, পরিকল্পনা কমিশন প্রস্তাবিত এই প্রকল্প থেকে বিদেশ যাত্রা বাতিল করার কথা বলেছে। এছাড়া দেশেও এ ধরনের প্রশিক্ষণের বিষয়ে যৌক্তিকতা কী জানতে চেয়েছে। খিচুড়ি রান্না শেখার জন্য বিদেশ যাত্রার পরিকল্পনা যে হাস্যকর সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারের বাজেটের আকার বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যয় বৃদ্ধির এই মহোৎসব আমাদের বিস্মিত করে, ব্যথিত করে। আমরা এর প্রতিকার চাই। পর্দা-বালিশ কেলেঙ্কারীর পরেও আবার খিচুড়ি কেলেঙ্কারি জন্মদানের মত সাহস এরা কোথায় পায় সেটা দেখা দরকার। তা না হলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ঘোষিত ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির এর প্রতি জনগণ বিশ্বাস হারাবে। পরিকল্পনা কমিশনকে তাদের কঠোরতার জন্য ধন্যবাদ।
 
‘খিচুড়ি নিয়ে জগাখিচুড়ি’ এই সমস্যার মধ্যেই আমাদের নতুন করে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে মিয়ানমার সরকার এর নতুন করে সেনা মোতায়েন এর প্রসঙ্গটি। বিশ্লেষকরা বলছে এর মধ্যে দিয়ে রাখাইনে থাকা রোহিঙ্গাদের ফের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাসেও মিয়ানমার সরকার সীমান্তে ব্যাপক সেনা মোতায়েন করে সে দেশের রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছিল। এবারের তৎপরতাতেও তাই স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনিতেই ৪ লাখ বাংলাদেশী অধিবেশী অধ্যুষিত টেকনাফ এলাকায় বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী বাস করছে। নিজ দেশে এখন বাংলাদেশীরাই এক ধরনের পরবাসী জীবনযাপন করছে। যে রোহিঙ্গারা আমাদের এখানে আছে তাদের সামলাতেই যখন আমরা হিমশিম খাচ্ছি, সরকারের বারবার তাগাদা দেয়া সত্ত্বেও যখন তাদের ফেরত নেয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না, তখন আবার নতুন করে আরও রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা অবশ্যই নিন্দনীয়, অমানবিক এবং কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত। মিয়ানমার সরকারের এই অপরতৎপরতা যে কোন মূল্যে প্রতিহত করার জন্য সরকারকে বিশেষ উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে। বিশ্ব সম্প্রদায়কেও এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে হবে। মানবতা কেবল বাংলাদেশই দেখাবে সেটা কাম্য হওয়া উচিত নয়। আগামী ৮ নভেম্বর মিয়ানমারের জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা।

 সেই নির্বাচনকে সামনে রেখে সেখানে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার নতুন কৌশল নেয়া হয়ে থাকতে পারে। এটি এমন সময়ে করা হচ্ছে যখন বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাসহ সব রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা নেতৃত্বাধীন ১৪টি মানবাধিকার সংগঠন। শোনা যায়, এবারের স্থানীয় সরকারের একটি নির্বাচনে বিদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার প্রয়োগে বাধা দেয়া হয়েছে। অথচ ২০১০ ও ২০১৫ সালের নির্বাচনেও দেশের বাইরে অবস্থানরতদের ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিল দেশটির সরকার। সম্প্রতি তারা সেটি বাতিল করেছে। মানবাধিকার সংস্থা ফর্টিফাই রাইটস এর মতে, ‘বিশ্বের যেকোনো জায়গার শরণার্থীরা অনুপস্থিত ব্যালটে শরণার্থী শিবিরে ভোটকেন্দ্র স্থাপন করে নিজ দেশের নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন।’ সেই মোতাবেক টেকনাফ-উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবিরে অবস্থানরত রোহিঙ্গারাও যাতে ভোট দিতে পারে সে দাবী তোলা হয়েছে। কিন্তু মিয়ানমার সরকার সেটা কানে তুলছে না। উল্টো সীমান্তে পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই সেনা মোতায়েন এর পরিমাণ বৃদ্ধি করে চলেছে। এটা একটা সুস্পষ্ট দূরভিসন্ধির আভাস।

আমাদের সুস্পষ্ট দাবী, অবিলম্বে পূর্ণ নাগরিক মর্যাদায় রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে ফিরিয়ে নেয়া হোক। আমরা প্রতিবেশীদের সাথে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই। আমরা কোন টেনশন চাই না। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, বাংলাদেশ শান্তি চায়, সেটা তাদের দুর্বলতা নয়। আমরা লড়তে জানি। রোহিঙ্গারা আমাদের মেহমান, তাদের প্রতি আমরা মানবিকতা দেখিয়েছি কিন্তু সেটারও একটা সময়সীমা থাকা উচিত। টেকনাফ-উখিয়ার আর্থ-সামাজিক অবস্থাটা যে থমথমে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে তা থেকে স্থানীয়দের মুক্ত হয়ে শান্তিতে ঘুমানোর সুযোগ নিশ্চিত করা উচিত।

মিয়ানমার সরকারের প্রণীত ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন করে আন্তর্জাতিক আইনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে জাতি, বর্ণ, ধর্ম নির্বিশেষে সবার পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা উচিত। এটা মানবাধিকারের অংশ। হিংসা ও জাতিগত বিদ্বেষে রোহিঙ্গাদের আজ মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করা হয়েছে। এটা অসুস্থ রাজনীতি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত রাজনীতির এই অসুস্থতা অবসানে, দেশে দেশে সুশাসন ও মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিতে আরও তৎপর হওয়া এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা। করোনার সময়েও টিকা নিয়ে যে ধরনের রাজনীতি শুরু হয়েছে তাও মৌলিক মানবাধিকারকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। করোনার টিকা সকল দেশের পাবার অধিকার রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উচিত দেশগুলো যাতে বিনামূল্যে এবং সহজে করোনার টিকা পায় সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। এর জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করা থেকে শুরু করে স্থানীয় পর্যায়ে টিকা উৎপাদনের সুযোগ অবারিত করা প্রয়োজন। কারণ, মানবতা সবার আগে, মানবতা সকল প্রশ্নের উর্ধ্বে। মানবতাই হলো মানুষের ধর্ম। আর সেই মানবতার টানেই সে কল্যাণের পথে পরিচালিত হয়।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯