দুরাবস্থায় মধ্যবিত্ত মানুষেরা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৬:২৬ পিএম, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২০

অলোক আর্চায: মানুষ মানুষের জন্য। পৃথিবীতে এ এক মহাসত্য বাণী যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে মানুষের পাশে এনে দাঁড় করিয়েছে। আর আজ যখন মানুষ করোনার মহামারীতে মারা যাচ্ছে তখনো মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।  বিশে^র জন্য নভেল করোনা ভাইরাস এক বিরাট ধাক্কা। এই ধাক্কা যে কেবল এই কয়েকদিনেই শেষ হবে তা বলা যায় না। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি দরিদ্র, অসহায় আর খেটে খাওয়া দিনমজুর যারা আজ উপার্জনহীন জীবন যাপন করেছে তাদের সাহায্যে এগিয়ে এসেছে সবাই। ধনী এবং দরিদ্রের মাঝে আরও একটি শ্রেণি সমাজে বসবাস করে। তারা হলো মধ্যবিত্ত শ্রেণি। আবার নিম্ন মধ্যবিত্তও বলা হয়। এই শ্রেণির মানুষের কথা কেউ ভাবছে কি? মধ্যবিত্ত হলো এমন এক শ্রেণির মানুষ যারা দুই শ্রেণির মাঝে থেকে সারা জীবন চ্যাপ্টা হয় কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারে না। যে শ্রেণির মানুষের কাছে ফেব্রুয়ারি মাসটাই বেশ স্বাচ্ছন্দ্যে চলে আর একত্রিশ দিনে মাস হলো একদিনের বোঝা। যারা লাইনে দাঁড়িয়ে আত্মসম্মানের ভয়ে সাহায্য নিতে পারে না। এমনকি ঘরে একবেলা না খেয়ে থাকলেও কিছু বলতে পারে না। কারণ ওই আত্মসম্মান। করোনার মহামারীতে সারা বিশে^ যখন ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা তখন এই মধ্যবিত্তরা রয়েছে মহাসমস্যায়। আপাতত তাদের খুব সমস্যা না হলেও খুব দ্রুতই তাদের সমস্যার দিন এগিয়ে আসছে। সেই চিন্তায় তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ। সেই ভাঁজ কেউ দেখছে না। আপাতত সমস্যা থেকে মুক্তি মিলছে মাত্র।
করোনা ভাইরাসের প্রভাব হবে দীর্ঘমেয়াদী। বিশ^ অর্থনীতির মূল ধাক্কাটা যাবে কর্মী ছাটাইয়ের মধ্যে দিয়ে মনে করা হচ্ছে। এর মধ্যেও রয়েছে মধ্যবিত্ত শ্রেণি। যেখান থেকে দুটো পথ থাকে। এক. ধনী হওয়ার পথ। দুই. দরিদ্রের কাতারে নাম লেখানোর পথ। অনেকেই করোনার ধাক্কায় চাকরি হারিয়েছে অথবা বেতন কমে গেছে। অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তাদের বেঁচে থাকার জন্য নানা পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ঋণ সুবিধা প্রদান। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো করোনা পরিস্থিতি উন্নত করা। এখন রাস্তাঘাটে মানুষ যেভাবে চলাফেরা করছে তাতে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা খুব কম জনই করছে। এতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে আরও দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ভ্যাকসিন আসা পর্যন্ত আমাদের অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি আবশ্যিকভাবে মানতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) এর তথ্য মতে, দেশের ১৬ কোটি মানুষের ৪ কোটি পরিবারের মধ্যে নিম্নবিত্ত ২০ শতাংশ, উচ্চবিত্ত ২০ শতাংশ আর বাকি ৬০ শতাংশ নিম্ন, মধ্য ও উচ্চ মধ্যবিত্ত পরিবার। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) জরিপ বলছে, ফরমাল সেক্টরে কাজ করা ১৩ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছে। ১১ হাজার টাকার কম আয়ের ৫৬ দশমিক ৮৯ শতাংশ পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৩২ শতাংশ মানুষের আয় কমে গেছে। ১৫ হাজার টাকা আয়কারী ২৩ দশমিক ২ শতাংশের আয় পুরো বন্ধ হয়ে গেছে এবং ৪৭ দশমিক ২৬ শতাংশের আয় কমে গেছে। ৩০ হাজার টাকার বেশি আয়কারী ৩৯ দশমিক ৪ শতাংশের কমেছে এবং ৬ দশমিক ৪৬ শতাংশের আয় বন্ধ হয়ে গেছে। বেসরকারি সংস্থা ব্রাকের এক জরিপে দেখা গেছে, করোনার প্রভাবে ৩৬ শতাংশ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন। তিন শতাংশের চাকরি থাকলেও বেতন পান না। এদের বড় অংশই মধ্যবিত্ত। এছাড়া করোনার প্রভাবে দেশে নিম্নবিত্তের আয় ৭৫ ভাগ কমেছে। আগের তুলনায় চরম দারিদ্র্যের সংখ্যা বেড়েছে ৬০ ভাগ।
বৈশি^ক প্রবৃদ্ধির অন্যতম নিয়ামক চীন, আমেরিকা ও ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন দেশে এই ভাইরাস অর্থনীতিতে ধস নামিয়েছে। দোকানপাট, বিমান চলাচল সব বন্ধ থাকায় এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে নিরাপত্তাই মুখ্য সেখানে এর থেকে ভালো উপায় হয় না। এর ফলে আর্থিক বিশ^মন্দার বাস্তবে রুপ নিতে শুরু করেছে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। বোঝাই যাচ্ছে করোনার প্রভাব যখন স্তিমিত হওয়া শুরু করবে তখন দেশ এক নতুন চ্যালেঞ্জে পড়বে। সেই চ্যালেঞ্জ দারিদ্র মোকাবেলা করে অর্থনীতি পুনর্গঠনের চ্যালেঞ্জ। আপাতত চ্যালেঞ্জ হলো নিজেদের নিরাপদ দুরত্বে রেখে করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা করা। এজন্য ঘরে থাকতেই হবে। কিন্তু ঘরে থাকার দিনগুলিতে দিনমজুর, মুটে, ক্ষুদ্র পেশাজীবী যারা দিনে আনে দিন খায় তাদের সংসার চালানোর পথ তৈরি করতে হবে। এর প্রধান পথই হলো সহায়তা করা। সরকার তাই করছে। বিত্তবানরা এগিয়ে এসেছে। কিন্তু এসব মানুষের সংখ্যা নেহায়েত অল্প নয় যে তা রাতারাতি সবাইকে সহায়তা করা সম্ভব হবে। এর সাথে মধ্যবিত্তদের বাঁচানোর জন্যও পরিকল্পনা করা প্রয়োজন। মানুষ কাজে ফিরেছে। কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে একটু সময় লাগবে। বিশেষ করে মধ্যবিত্তদের উঠে দাঁড়াতে আরও সময়ের প্রয়োজন। অনেকে তাদের জমানো অর্থ লক ডাউনের সময়ে শেষ করেছেন। সঞ্চয় ফুরিয়ে গেলে তারা কিভাবে জীবন যাপন করবে তা নিয়েও ভাবতে হবে। কারণ এদের সঞ্চয়ও খুব বেশি থাকে না। অবস্থা এমন যে এই শ্রেণির বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। তাই অর্থনীতির গতিধারায় এই মধ্যবিত্তদের স্বার্থ সংরক্ষণ নিয়ে আলাদা করে ভাবার সময় এসেছে।
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক  
sopnil.roy@gmail.com
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬