পরিবারে ভিনদেশি টেলিভিশন সিরিয়ালের প্রভাব

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ১০:০০ পিএম, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২০

মোঃ আব্দুল ওহাব: বিদ্যুৎ আবিষ্কার পৃথিবীবাসির জন্য একটি যুগান্তকারী উপহার। নব্বই দশকের দিকে অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ বছর আগে, সে সময় দেখতাম বেশির ভাগ গ্রাম বা শহরতলীতে বিদ্যুৎ ছিল না। সে সময় সাদা কালো টিভি ছিল সেগুলো চলতো ব্যাটারীর চার্জের সাহায্যে। সে সময় আরব্য উপন্যাস নিয়ে রচিত আলিফ লায়লা নামে একটি টিভি সিরিয়াল হতো প্রতি শুক্রবার রাত ৮টার পরে। তখন আমাদের সমবয়সীসহ প্রতিটি পরিবারের অধিকাংশ সদস্যই অধীর আগ্রহ নিয়ে থাকতো যে, কবে শুক্রবার আসবে। সে সময় আমাদের পাড়াতেও বিদ্যুৎ ছিল না। যে বাড়িতে টেলিভিশন ছিল সেখানে প্রতি শুক্রবার রাত ৮টার পর একটি উৎসবের আমেজ পড়ে যেত। একটি পাড়া বা মহল্লার সবাই একত্রে বসে অনুষ্ঠানটি দেখার আয়োজন করা হতো। প্রতি শুক্রবার বিকাল তিনটার পরে বাংলা সিনেমা থাকতো তা দেখার জন্য অনেকে ওই নির্দিষ্ট সময়ের আগেই যদি কোন কাজ থাকতো, তা শেষ করে রেখে দিতো। বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ব্যাটারী দিয়ে টেলিভিশন চলতো। সে সময় দুই একটি বাড়িতে টিভি থাকলেও সেটি ছিল সাদাকালো এবং একটি মাত্র চ্যানেল ছিল বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)। স্যাটেলাইট চ্যানেল গ্রামে ছিল না বিধায় রিমোট কন্ট্রোল এর ব্যাবহার ছিল না। টিভি লাইন যদি সমস্যা হতো মাঝে মাঝে বিশাল বাঁশের মাথায় লাগানো এন্টিনা ঘুরিয়ে দিতে হতো। সিনেমা বা নাটকের মাঝে কোন বিজ্ঞাপন দিলে টিভি বন্ধ রাখা হতো  যাতে করে ব্যাটারীর চার্জ থাকে। সে সময় নতুন সিনেমা দেখার জন্য পাড়া বা গ্রামের সবাই মিলে টাকা উঠিয়ে গ্রাম থেকে ৭ বা ৮ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত নির্দিষ্ট দোকান থেকে ভিসিডি ও এর ফিতা ভাড়া করে আনা হতো এবং ভিসিডি চালানো ও নিরাপত্তার জন্য দোকান থেকে লোক আসতো।

 ভিসিডি চালানোর সময় মাঝে মাঝে ঝির ঝির করতো এ জন্য ফিতা বার বার মুছে দিতে হতো। দুই বা তিনটা সিনেমা দেখার পরে যদি ব্যাটারীর চার্জ না থাকতো তাহলে মনোকষ্ট নিয়ে সবাই বাসাই ফিরে যেতো। উপরের কথা গুলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে খুব বেশি একটা বিশ্বাস নাও হতে পারে। কিন্তুু এটাই ছিল সেই সময়ের বাস্তব চিত্র। আধুনিক যুগে প্রযুক্তি ব্যবহারে প্রতিটি গ্রাম বা মহল্লায় বিদ্যুৎ ও স্যাটেলাইট চ্যানেল পৌছে গেছে, এটা একটি ভালো দিক। কারণ দেশের প্রতিটি জায়গার নিত্য নতুন খবর প্রতি ঘন্টায় প্রকাশ করছে দেশের প্রাণপ্রিয় সাংবাদিক ভাইয়েরা। এতে করে দেশের মানুষ খবরাখবরগুলো সবসময় বর্তমানে রাখতে পারছে। আমাদের দেশের দেশীয় স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল বর্তমানে অনেক রয়েছে। এই চ্যানেলগুলো দেশের সংস্কৃতি সভ্যতা দেশের ইতিহাস ইত্যাদির খবরসহ নানা রকমের অনুষ্ঠান দেখানোর চেষ্টা করে। যদিও অনুষ্ঠানের চেয়ে বিজ্ঞাপন বেশি দেখতে হয়। তারপরও নিজের দেশের সব কিছুকে সম্মান করা উচিত। ভারতীয় বাংলা টিভি চ্যানেলগুলো আমাদের দেশে অবিরাম চলছে কিন্তুু আমাদের দেশের কোন বাংলা চ্যানেল ভারতে দেখানো হয় না। এ বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের গভীরভাবে বিবেচনা করা উচিত। ভারতীয় টিভি চ্যানেল দেখার রীতি খুব বেশী দিনের নয় বিগত কয়েক বছর হবে। স্টার জলসা, জি বাংলা, জলসা মুভিসহ আরও অন্যান্য চ্যানেল সবচেয়ে বেশি প্রচারিত। এর মধ্যে বিশেষ করে দুটি চ্যানেল স্টার জলসা ও জি বাংলায় বিভিন্ন রকম সব অদ্ভুত ধরনের বিভিন্ন নামে টিভি সিরিয়াল প্রতিনিয়ত প্রচার হচ্ছে। এই সিরিয়ালগুলো বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতী ও বৃদ্ধ-বৃদ্ধা সবাই কোন না কোন সিরিয়াল দেখে।

সন্ধ্যার পর ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করছে আর মাঝে মাঝে বলছে আমাদের টিভি সিরিয়ালটি শুরুর আর মাত্র ১০ মিনিট বা ৫ মিনিট বাকি আছে। পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা, তাদের যে প্রিয় সিরিয়ালটি শুরু হয়েছে তা দেখার জন্য আগেই বসে পড়েছেন। ছেলে-মেয়েরা কি পড়ছে বা তাদের পরের দিন বিদ্যালয়ের কি পড়া রয়েছে বা কতটুকু পড়া শেষ হয়েছে এ বিষয়ে পরিবারের কোন সদস্য খোঁজ খবর রাখে আবার কেউ রাখার প্রয়োজন মনে করে না। পরিবারে এ রকমের পরিবেশ অনেকটা হতাশ হওয়ার মতো। তবে এরকম পরিবেশের জন্য ছেলে-মেয়েদের দোষারোপ করে কি লাভ, তারাতো পরিবেশের শিকার।  এটি শুধু দেশের একটি পরিবারের চিত্র নয়। বর্তমানে দেশের কম বেশি অনেক পরিবারেই দেখা যায় এ চিত্র। এই টিভি সিরিয়ালের কারণে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নানা রকম মনোমালিন্য দেখা দিয়েছে। ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলো মাসের পর মাস বছরের পর বছর ধরে দেখতে দেখতে এগুলোর প্রতি মানুষ অনেকটা আসক্তির মতো হয়ে পড়েছে। যেমন মাদকের প্রতি মানুষ আসক্তি হয়ে হিতাহিতজ্ঞান শূন্য হয়ে মাদকের টাকার জন্য সে যে কোন অপকর্ম করতে পারে। সেটা ন্যায় বা অন্যায় হোক তা বিবেচনা করার জ্ঞান নাই। কোন এক সিরিয়ালের একটি মেয়ের চরিত্র ছিল, তার নাম ছিল পাখি। সেই পাখি চরিত্রের মেয়েটি যে জামা পরে অভিনয় করত, সেই জামার আদলে আমাদের দেশে মেয়েদের নানা রকমের পোশাক তৈরী করে বিক্রি করা হতো।
গত বছরের একটি পত্রিকাতে পড়েছিলাম যে, এক কিশোরী তার অভাবী বাবা-মাকে বলে যে তার সমবয়সীরা সবাই পাখি জামা ক্রয় করেছে তাকেও একটি পাখি জামা কিনে দিতে হবে। কিন্তুু বাবা-মা মেয়েটিকে বলে এখন তাদের পাখি জামা কেনার মতো কোন টাকা নেই, তাই তোমাকে এখন এই জামা কিনে দিতে পারবো না, টাকা জোগাড় করে পরে কিনে দিব। সাথে সাথে জামাটি না পাওয়ার কারণে সেই কিশোরী মেয়েটি বাবা-মার উপর অভিমান করে আত্মহত্যা করে। এ রকম ঘটনা অনেক ঘটেছে আমাদের দেশে।

স্টার জলসায় কিরণমালা নামে একটি টিভি সিরিয়াল প্রচারিত হয়ে আসছে অনেকদিন যাবৎ। এ কিরণমালা দেখার জন্য একটা পরিবারের সকল সদস্যসহ বিশেষ করে ছেলে-মেয়েরা অধীর আগ্রহ নিয়ে থাকে যে কখন সেই সময়টি আসবে। এই সিরিয়ালটির কিরণ চরিত্রের যে মেয়েটি রয়েছে তার আদলে তৈরী করা জামাটিও আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। মা-বাবার জামা ক্রয় করার ক্ষমতা না থাকলেও বিষয়টি আমাদের ছেলে-মেয়েরা  বোঝার কোন চেষ্টা করে না। বরং অভিমান করে থাকে পরিবারের সদস্যদের উপর বিশেষ করে মা-বাবার উপরে। বাবা-মা সারাদিন অফিস বা কর্ম থেকে ফিরে হয়তো রাতে একটু সময় পায় সেই সময়টুকুও তার নির্ধারিত অনুষ্ঠানগুলো দেখতে পায় না এই টিভি সিরিয়ালের কারণে। পরিবারের অবস্থা এ রকম হয়েছে যে, মেয়ের এক চ্যানেল পছন্দ তো ছেলের অন্য চ্যানেল পছন্দ, আবার ছোট আর বড়দের পছন্দ আলাদা আলাদা, এই হলো বর্তমান অবস্থা। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। না হলে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নষ্ট হয়ে যাবে। এই টিভি সিরিয়ালের জন্য অনেক পারিবারের শান্তি অনেকটা নষ্ট হয়েছে। অনেক পরিবারে দেখা যায় বৃদ্ধ বাবা-মা, দাদা-দাদী এক সাথে বসবাস করে। তারা অনেকটা নি:সঙ্গ। তাদেরও একটু পরিবারের সদস্যদের সময় দেওয়া উচিত, অথচ বর্তমানে ছেলে-মেয়ে বা নাতী-নাতনী মোবাইল ও এই টিভি সিরিয়ালের পিছনে অনেক বেশি সময় ব্যয় করছে। সন্ধ্যার পরে ছেলে-মেয়েদের উচিত পড়তে বসা অথচ তারা সিরিয়ালটি কখন শুরু হবে সেই সময় গণনা করে। এতে করে পড়াশুনার প্রতি উদাসীনতা দেখা যায়। প্রতিটি পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে মা-বাবাদের তাদের ছেলে-মেয়েদের প্রতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে এ অবস্থা থেকে।

এতে করে অন্য দেশের সংস্কৃতি দেখতে দেখতে নিজের দেশের সংস্কৃতি ভুলে ভিন্ন দেশের সংস্কৃতি আচার-আচরণে গড়ে ওঠার চেষ্টা করবে। তাই সকল দিক বিবেচনা করে ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো দেখার বিষয়ে আমাদের আরও ভাবতে হবে। এতে আমাদের সামাজিক অবক্ষয় রোধ করা কিছুটা হলেও সম্ভব হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলগুলোর উচিত বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান তৈরী করা এবং প্রচার করা যেখান থেকে ছেলে-মেয়েরা যেন কিছু শিখতে পারে বা না পারলেও হয়তো জামার জন্য আত্মহত্যা করবে না। কোন অনুষ্ঠান প্রচার করার সময় তা একটানা প্রচার করা উচিত এবং বিজ্ঞাপনের পরিমাণ কম দিতে হবে এতে দেশীও টিভি চ্যানেল দেখার আগ্রহ অনেক বেড়ে যাবে। অনেক জনপ্রিয় ধারাবাহিক নাটক এক সময় প্রচার হতো বর্তমানেও কিছু প্রচার হয়ে থাকে, কিন্তুু নাটক চলাকালীন সময়ে নাটক প্রচারের যে সময় তার চেয়ে তিনগুন বেশি সময় বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় আর এতে করে দর্শক বাংলা চ্যানেল বিমুখ হয়ে পড়ছে।

 বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) এক সময়ের অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিল বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জন্য কিন্তুু তা বর্তমানে প্রায় দর্শকশূন্য হয়ে পড়ছে বিভিন্ন কারণে। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলোর বর্তমানে দেশের সংবাদ প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, সাথে সাথে বিটিভির অনুষ্ঠানগুলোকে আরও যুগোপযোগী করে বিভিন্ন শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান আরো বেশি বেশি প্রচার করা উচিত। এতে করে চ্যানেলটি আবারও পূর্বের ন্যায় দর্শকপ্রিয় হবে এবং বিদেশী চ্যানেলগুলো দেখার প্রভাব অনেকটা কমে যাবে । তাই আমাদের উচিত আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশ গড়ার কারিগর হিসাবে গড়ে তোলার জন্য পরিবার ও সমাজে সকলের সাথে পরস্পর সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য ভারতীয় টিভি সিরিয়ালগুলো দেখার বিষয়ে আমাদের আরও সচেতন হতে হবে। তাহলে হয়তো আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আরও সুন্দর ভাবে এ দেশে রেখে যেতে পারবো ।
লেখক : শিক্ষক-কলামিষ্ট
০১৭২৯-৮২৮৬৮৫