থামছেই না মাদকের আগ্রাসন

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:২৫ পিএম, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২০

নার্গিস জামান  : মাদক একাল-সেকাল সর্বকালের জন্যই ছিল সর্বনাশা এক বিধ্বংসী উপাখ্যান। কোন কালেই একে সমর্থন দেবার মত পজিটিভ কিছু ঘটেনি। যা অগ্রহণযোগ্য তাকে সাব্যস্ত করে গ্রহণের কালিতে দলীল করা যায় না। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় শুধু মাদকের কারণে অনেক ভূখন্ড কিংবা অনেক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গিয়েছে। সাম্প্রতিক ইতিহাসও তার ব্যতিক্রম নয়। মাদকের বিস্তৃতির কারণে অনেক দেশের অর্থনীতি ধ্বংস প্রায়। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি শোচনীয়, খুনোখুনি নিত্য নৈমিত্তিক ঘটনা। মাদক সমাজে এক চরম নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে মাদকের বিস্তৃতি দেখে সঙ্গত কারণেই সচেতন মহল থেকে নানা আশঙ্কার কথা উঠে আসলে তারই পরিপ্রেক্ষিতে শুরু হয় দেশব্যাপী মাদক বিরোধী অভিযান। মাননীয়, প্রধানমন্ত্রী বিষয়টির ধ্বংসাত্মক ভয়াবহতা অনুধাবন করতে পেরে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির ঘোষণা দেন। ২০১৪ সাল থেকে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স সহ পরিমার্জিত মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ প্রণয়ন করা হয়। বলা হয়েছিল, “মাদক দ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনকল্পে বিধান প্রণয়নের জন্য প্রণীত আইন যেহেতু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯০ রহিতক্রমে, মাদকদ্রব্যের নিয়ন্ত্রণ, সরবরাহ ও চাহিদা হ্রাস, অপব্যবহার ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান আইন যুগোপযোগী করাসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ে বিধান সংবলিত একটি নতুন আইন প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়। এরই প্রেক্ষিতে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৮ পাস হয়। এতে মাদক পরিবহণ, বেচাকেনা, সংরক্ষণ, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, অর্থলগ্নিকরণ, পৃষ্ঠপোষকতাসহ বিভিন্ন অপরাধে সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা মৃত্যুদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এতদ্বসত্ত্বেও দীর্ঘদিন যাবত লাগাতার অভিযান পরিচালিত হওয়া সত্ত্বেও মাদক পাচার চলছেই, ব্যাহত হচ্ছে মাদক নিয়ন্ত্রণ প্রয়াস। কারবারিরা নিজ স্বার্থের ক্ষুদ্র লোভকে চরিতার্থ করতে গিয়ে বিষিয়ে তুলেছে যুবজীবন তথা যুব সমাজ। আচ্ছন্ন মগজে চেতনাহীন আজ দেশের ভবিষ্যৎ কান্ডারি। প্রতিনিয়ত গণমাধ্যমে উঠে আসছে মাদক সম্পর্কিত সংবাদ, তথ্য ও এর সর্বগ্রাসী আগ্রাসনের চিত্র।
মাদকের আইন আছে। কিন্তু আইনি প্রক্রিয়ায় এর আসল হোতাদের শাস্তি নিশ্চিত করা ঠিক সিস্টেমে আসছে না, তাদের ধূর্ত এবং কৌশলগত চালান প্রক্রিয়ার কারণে। কারণ হিসেবে আরও দায়ি করা হচ্ছে কারবারিদের মাদক পরিবহনে কাট আউট ও রিলে পদ্ধতিকে। গত ৩০/৮/২০২০ গণমাধ্যমে এসেছে তার বিস্তারিত তথ্য। একটি দৈনিকে বলা হয়েছে, “মাদকের গন্তব্য অজানা”। দায়ের হওয়া সিংহভাগ মাদক মামলার শেষ গন্তব্য ও ক্রেতা-বিক্রেতার নাম থাকছে অজানা। তদন্তকারী সংস্থাও টিকিটি ছুঁতে পারে না তাদের। ফলে শুধুমাত্র বহনকারীকে একমাত্র আসামি করে দেওয়া হয় বেশির ভাগ মামলার চার্জশিট। মাদক মামলার তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সংস্থার দাবি, আইনের বাধ্যবাধকতার কারণে মাদক মামলায় পজিশনের (ব্যক্তি ও যে স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়) ভিত্তিতে আসামি করা হয়।
পজিশনের বাইরে কাউকে আসামি করতে গেলে তা প্রমাণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ছাড়া বহনকারীও দেয় না চালানের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য। তাই বেশির ভাগ মামলায় শুধু বহনকারীকে আসামি করা হয়। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামের পুলিশ সুপার এস এম রশিদুল হক বলেন, ‘এখন মাদক চক্রের হোতারা পরিবহনের সময় কিছু কৌশল অবলম্বন করছে। মাদকের চালান বিক্রেতার কাছ থেকে ক্রেতা পর্যন্ত পৌঁছাতে একাধিক হাত বদল হয়। ফলে চালান আটক হলেও কিছু মামলার তদন্তে চালানের চূড়ান্ত গন্তব্য পর্যন্ত যাওয়া যায় না। তাই ওই সব মামলার চার্জশিটে ক্রেতার নাম ও শেষ গন্তব্য উল্লেখ করা যায় না। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম মেট্রো মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. রাশেদুজ্জামান বলেন, ‘চালানসহ বহনকারী গ্রেফতার হলেও অনেক সময় তারা ক্রেতা-বিক্রেতার নাম বলতে চায় না। অনেক বহনকারী আবার কারও নামই জানে না। ফলে পৃষ্ঠপোষক কিংবা গন্তব্যের নাম বলতে পারে না মাদকের বহনকারী।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলায় দায়ের হওয়া মামলার সিংহভাগ মামলাই থাকে মাদক-সংশ্লিষ্ট বলে জানা গেছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, মাদক চক্রের হোতারা চালান পরিবহনে কাট-আউট ও রিলে পদ্ধতি (একাধিক হাতবদল) অনুসরণ করছে। ফলে বহনকারীরা চালান বহন করলেও জানে না এর ক্রেতা-বিক্রেতা এবং শেষ গন্তব্যের ঠিকানা। তাই তদন্ত কর্মকর্তারা জোরালো তথ্য-প্রমাণ না পেলে মাদক মামলার চার্জশিটে বহনকারী ছাড়া কাউকে অন্তর্ভুক্ত করতে পারেন না। ফলে বেশির ভাগ মাদক মামলার চার্জশিটে শেষ গন্তব্য ও ক্রেতা-বিক্রেতার নাম উল্লেখ করা হয় না।ফলে মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে বরাবর।
এই যখন অবস্থা যে, মাঠপর্যায়ে মাদক সংশ্লিষ্ট বহনকারী ছাড়া আর কাউকে সনাক্ত করা কঠিনতর কাজ তখন একটি কথা সামনে আসা স্বাভাবিক যে, দীর্ঘ মেয়াদী এই মাদক বিরোধী অভিযানের এক পর্যায়ে গত ২০১৮ সালে গণমাধ্যমে একটি প্রতিবেদন এসেছিল, “নারকোটিক্সের তালিকা” নামে। সেটি দুদকের কাছে পাঠানো হয়েছিল, সেটির ফলাফল কী? নারকোটিক্সের এই তালিকায় বলা হয়েছিল, গডফাদারদের শাস্তি নিশ্চিত করুন। এতে কতিপয় গডফাদারের নামও উঠে এসেছিল। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেই সংবাদে বলা হয়েছিল, “মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেশজুড়ে ১৪১ জনের তালিকা প্রণয়ন, যারা মাদকের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ‘ডন’ হিসেবে পরিচিত। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ভাষ্যমতে, তালিকাভুক্ত এসব ব্যক্তি দেশে ইয়াবা ব্যবসায় একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রক। সেখানে আরও বলা হয়েছে যে, “উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সরকারি দলের সংসদ সদস্য ও প্রভাবশালী নেতাদের নামও রয়েছে এ তালিকায়। এছাড়া রয়েছে সিআইপি খেতাব পাওয়া ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ও অনেক সরকারী কর্মকর্তার নাম।” ইয়াবা পাচার ও ব্যবসার সাথে এক শ্রেণির সরকারী কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালীদের সম্পৃক্ত থাকার অভিযোগ চাঞ্চল্যকর ও দুর্ভাগ্যজনক। বিদ্যমান আইনে মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্তদের গ্রেফতারে কিছুটা সীমাবদ্ধতা থাকায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর প্রণীত ১৪১ জন মাদক স¤্রাট তথা গডফাদারের তালিকা দুদকে পাঠিয়েছিল, যাতে করে তাদের অবৈধ আয়ের পথ ও বিশাল অর্থবিত্তের সূত্র ধরে তাদের শাস্তির আওতায় আনা যায়। তবে প্রশ্ন তখনও উঠেছিল গণমাধ্যমে, প্রশ্ন এখনো; দুদক কি এসব মাদক গডফাদারের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে, পেরেছে? বেড়ায় ক্ষেত খায় যেখানে, সেখানে আশঙ্কা থেকেই যায় জনমনে। সনাক্ত হবার পরেও মাদকের গডফাদারদের শাস্তি নিশ্চিত করতে না পারা চরম ব্যর্থতা বটে। এখানে এক শ্রেণির প্রভাবশালী সরকারী কর্মকর্তাদের জড়িত থাকার যে বিষয়টি উঠে এসেছে তার দৃষ্টান্তও বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃশ্যমান। এর আগেও পত্র-পত্রিকায় খবর বের হয়েছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর এক শ্রেণির অসাধু সদস্য মাদক ব্যবসায় জড়িত। সর্বশেষ মেজর(অবঃ) সিনহা হত্যায় জড়িত অভিযোগে গ্রেফতারকৃত টেকনাফের ওসি প্রদীপের উদাহরণই যথেষ্ট।
মাদকের বিষাক্ত ছোবলে অধঃপতিত হচ্ছে দেশের তরুণ প্রজন্ম। অন্ধকারাচ্ছন্ন দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ।এ থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে সামাজিক বিশৃঙ্খলা দিন দিন বাড়বে এতে কোন সন্দেহ নেই। মাদকের জগতে এক ইয়াবাই নেই বরং আছে বহু রকমের আইটেম। ইয়াবাসহ কমপক্ষে ৩২ ধরনের মাদকদ্রব্য ব্যবহৃত হয় বলে জানা গেছে। মাদকের জগতে নতুন আমদানি “ক্রিস্টালমেথ” আফ্রিকা থেকে আসা এই মাদকের প্রতি এক গ্রামের দাম পাঁচহাজার টাকার ওপরে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর বলছে,ইয়াবার এমফিটামিন পাঁচভাগ আর ক্রিস্টালমেথ বা আইসের থাকে একশতভাগ। মানে ক্রিস্টালে পুরোটাই এমফিটামিন ফলে এটি ইয়াবার চেয়ে অনেকগুণ বেশি ক্ষতিকর মাদক। এটি আফ্রিকা থেকে আসছে। ২০১৯ সালের ২৭ জুন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে ক্রিস্টালমেথসহ নাইজেরিয়ান একজন নাগরিককে আটক করে গোয়েন্দা সংস্থা। এছাড়াও আছে হেরোইন সহ আরও অনেক আইটেম।
হেরোইন পাচারের জন্য বাংলাদেশকে নিরাপদ রুট বলা হয়। একাধিক নজরদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে হেরোইন পাচারের জন্য বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট রুট হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়েছে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্ত এলাকা হেরোইন ও অন্যান্য মাদক পাচারের অন্যতম রুট। গোয়েন্দা তথ্যমতে পাকিস্তান, ভারত, নেপাল ও আফগানিস্তান বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এর পেছনেও চারটি সিন্ডিকেট কাজ করে যাতে লন্ডন ও ঢাকার অনেক প্রভাবশালী জড়িত। এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে ৯০ এর দশকে হেরোইনসেবী ছিল ১০ হাজার বর্তমানে এই নেশা গ্রহণ করছে আড়াই লাখেরও বেশি মানুষ। এছাড়াও ইয়াবা ও ফেনসিডিল সরবরাহ করে মিয়ানমার ও ভারত। এই দুই দেশের মাদক ব্যবসার টার্গেট হলো বাংলাদেশের যুবসমাজ। ভারত সীমান্তে অসংখ্য ফেনসিডিলের কারখানা গড়ে উঠেছে। যার টার্গেট বাংলাদেশের তরুণ ও যুব সমাজ। বাংলাদেশ জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের হিসাবে দেশে মাদকাসক্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৬ লাখ। যদিও বেসরকারী হিসেবে এই সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি বলে দাবি করে বিভিন্ন সংস্থা। কতটা ভয়াবহ অবস্থায় আছে দেশের মাদক পরিস্থিতি ও যুবসমাজ তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। এমতাবস্থায় মাদকবিরোধী অভিযান আরও বেগবান করতে হবে এবং সম্পৃক্ত ব্যক্তি ধরা পড়লে তা সে যত বড় গডফাদারই হোক না কেন তাকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং এর বিকল্প নেই।
মাদক ব্যবসার সাথে নেপথ্যে দেশের অনেক রাঘব-বোয়াল জড়িত। এদের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে না পারলে সফল হবে না মাদক বিরোধী অভিযান। মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের সাথে সাথে সরকারের পরিকল্পিত ও সফল উদ্যোগই কেবল পারে যুব সমাজকে মাদকের ছোবল থেকে রক্ষা করতে। রাজনীতি, দল, মত সকল বাঁধাকে অতিক্রম করে একনিষ্ঠভাবে, কঠোরভাবে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল জয় হবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের।
লেখক ঃ শিক্ষক-প্রাবন্ধিক
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭