কোরবানি সম্পর্কে যা জানা জরুরি

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:২৪ পিএম, ৩০ জুলাই ২০২০

মাও: মো : রায়হানূর রহমান: কোরবানি শব্দের অর্থ নৈকট্য লাভ করা। এর সমার্থক শব্দ উদ্বহিয়্যাহ্। যার অর্থ উৎসর্গ করা, বিলিয়ে দেয়া। আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে জিলহজ্ব মাসের ১০-১২ তারিখের মধ্যে কোন গৃহপালিত হালাল পশু জবাই করাকে কোরবানি  বলা হয়। নিচে কোরবানি  সম্পর্কে কতিপয় জরুরি আলোচনা পেশ করা হল: কোরবানির সংক্ষিপ্ত ইতিকথা : পবিত্র কুরআন থেকে জানা যায় যে, সর্বপ্রথম কোরবানির ঘটনা ঘটে আদম (আঃ)এর দুই পুত্র হাবিল ও কাবিলের কোরবানির মাধ্যমে। (সূরা আল-মায়িদা ঃ ২৭)। প্রত্যেক উম্মতের জন্য কোরবানির বিধান প্রচলন ছিল বলে পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে। (সূরা হাজ্ব ঃ ৩৪)। তবে বর্তমানে প্রচলিত কোরবানির প্রচলন হয়েছে হযরত ইবরাহিম ও ইসমাঈল (আ) এর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পালনের জন্য ইবরাহিম (আ) বৃদ্ধ বয়সে তাঁর একমাত্র পুত্র ইসমাঈল (আ)কে কোরবানি করতে উদ্যত হন। তখনই ইলহাম হয়: হে ইবরাহিম! তুমি তোমার স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করেছ। এভাবেই আমি মুহসিনদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি ... আর আমি তা পরবর্তীদের জন্য (বিধান হিসেবে) রেখে দেই। (সূরা আস-সাফ্ফাত : ১০৫-১০৮)।
কোরবানির ফজিলত: আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আপনার রবের উদ্দেশ্যে সালাত আদায় করুন এবং কোরবানি করুন।’ (সূরা কাওসার ঃ ২)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, কোরবানির দিন মানুষের কাজের মধ্যে আল্লাহর কাছে বেশি পছন্দনীয় কাজে হচ্ছে রক্ত প্রবাহিত করা (কোরবানি  করা)। কিয়ামতের দিন তা নিজের শিং, পশম ও ক্ষুরসহ হাজির হবে। কোরবানির রক্ত জমীনে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর কাছে এক বিশেষ মর্যাদায় পৌছে যায়। অতএব তোমরা আনন্দচিত্তে কোরবানি কর। (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ্)। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন, ‘কোরবানির পশুর প্রত্যেক পশমের পরিবর্তে নেকি রয়েছে।’ (তিরমিযি, ইবনে মাযাহ্)। আব্দুল্লাহ্ ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দশ বছর মদীনাতে অবস্থান করেছেন এবং প্রত্যেকবারই কোরবানি  করেছেন। (তিরমিযি)।
সাত ভাগে কোরবানি দেয়া : সামর্থবান ব্যক্তিদের জন্য (নিজের ও পরিবারের পক্ষ থেকে)একটি কোরবানি দেওয়া ওয়াজিব। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, হে লোকসকল ! নিশ্চয়ই প্রত্যেক গৃহবাসীর উপর প্রত্যেক বছর কোরবানি করা ওয়াজিব। (আবু দাউদ)। ছাগল/ভেড়া বা একটি দুম্বা অথবা গরু/মহিষ বা উটে সাতভাগের একভাগ কোরবানিতে অংশগ্রহণ করা যায়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, ‘আল বাক্বারাতু আন সাবআতিন ওয়াল জুযূরু আন সাবআতিন অর্থাৎ কোরবানি করবে একটি গাভী সাতজনের পক্ষ থেকে এবং একটি উট সাতজনের পক্ষ থেকে।’ (আবু দাউদ)। অবশ্য কোরবানির পশু কেনার আগেই শরিকদার ঠিক করে নেয়া উচিত, পরে নেয়া মাকরূহ। (হেদায়া)
কোরবানির পশু কেনার সময় করণীয়: রাসূলুল্লাহ (সাঃ)বলেছেন, লা- তায্ বাহূ ইল্লা মুসিন্নাহ্ (মুসলিম)। এখানে মুসিন্না বা কোরবানির পশুর বয়স হচ্ছে, উট কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু/মহিষ কমপক্ষে দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। অবশ্য ছয় মাসের ভেড়া যদি এক বছরের ভেড়ার ন্যায় মোটা তাজা হয় তবে তা দ্বারা কোরবানি দেয়া বৈধ হবে। (মিশকাত)। অন্ধ, কানা, লেংড়া ও ক্ষীণকায় পশু অথবা কান ও লেজের এক-তৃতীয়াংশের বেশি কাটা কিংবা শিং মূল থেকে ভেঙ্গে গেছে এমন পশু দ্বারা কোরবানি করা মাকরূহ্। বারাআ ইবনে আযেব (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) চার ধরনের পশু কোরবানি র পশু থেকে পৃথক করে রাখতে বলেছেন। খোঁড়া জন্তু-যার খোঁড়ামী স্পষ্ট, অন্ধ পশু যার অন্ধত্ব স্পষ্ট, রোগা যার রোগ স্পষ্ট, ক্ষীণকায়/দুর্বল- যার হাড়ে মজ্জা নেই। (তিরমিযি, আবু দাউদ)। আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাদেরকে শিং ভাঙ্গা ও কান কাটা জন্তু দ্বারা কোরবানি  করতে নিষেধ করেছেন। (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ্)। চলতি বছর আরেকটি সতর্কতা হচ্ছে, সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে কোরবানির যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা। আল্লাহ পাক বলেন, হে ইমানদাররা! তোমরা সতর্কতা অবলম্বন কর। (সূরা আন-নিসা: ৭১)। তিনি আরো বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদেরকে ধ্বংসের মধ্যে নিক্ষেপ করো না।’ (সূরা নিসা, আয়াত : ২৯)।
পশু কেনার পর কোন সমস্যা হলে করণীয় : কোরবানির পশু কেনার পর যদি ত্রুটিযুক্ত হয়ে যায়, তাহলে সম্ভব হলে অন্য একটি পশু কোরবানি করবে। অন্যথায় সেটিই কোরবানি করবে। (হেদায়া ৪/১৪৯ পৃষ্ঠা)। আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, আমরা কোরবানির উদ্দেশ্যে একটি মেষ খরিদ করলাম। অতঃপর নেকড়ে বাঘ তার নিতম্ব অথবা কান কেটে নিয়ে গেল। আমরা নবী সাঃ কে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে, তিনি আমাদেরকে সেটাই কোরবানি করার নির্দেশ প্রদান করেন। (ইবনে মাযাহ্)। কোরবানির পশু কেনার পর যদি হারিয়ে যায় এবং অন্য একটি পশু ক্রয় করা হয়, তবে কোরবানির আগে হারানো পশুটি পাওয়া গেলে ধনী ব্যক্তি যে কোন একটি কোরবানি করবে। আর গরীব লোক উভয়টি কোরবানি  করবে। (হেদায়া ৪/ ১৫০ পৃষ্ঠা)।
যবাই করার সময় করণীয় : নিজ হাতে কোরবানি করা উত্তম, অন্তত নিজে উপস্থিত থাকা উচিত। (হেদায়া ৪/ ১৫৩ পৃষ্ঠা)। আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) দু’ শিং বিশিষ্ট সাদা-কালো মিশ্রিত বর্ণের দু’টি দুম্বা নিজ হাতে (যবাই) কোরবানি করেন। আমি দেখেছি তিনি সে দু’টির কাঁধের পার্শ্বে তার পা দিয়ে চেপে রাখেন এবং ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার’ বলে যবাই করেন। (বুখারি, মুসলিম)। শাদ্দাদ ইবনে আওস (রাঃ)  বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সাঃ)কে দু’টি বিষয়ে বলতে শুনেছি, ক) আল্লাহ্তায়ালা প্রতিটি জিনিসের উপর দয়া করা আবশ্যক করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন হত্যা করবে তখন উত্তমভাবে মেরে ফেলবে। খ) আর যখন যবাই করবে তখন উত্তমভাবে যবাই করবে। তোমাদের উচিত হবে যবাইয়ের সময় ছুরিকে ধারাল করা এবং কোরবানির পশুকে আরাম দেয়া। (আবু দাউদ, নাসাঈ)। যবেহ্ করার সময় কন্ঠনালী, খাদ্যনালী এবং ওয়াদজান (দুই পার্শ্বের দু’টি মোটা শাহরগ) কাটা উচিত। অন্তত তিনটি কাটা আবশ্যক। (হেদায়া ৪/১২৪ পৃষ্ঠা)। জিলহজ্ব মাসের দশ, এগার এবং বার এই তিনদিন পর্যন্ত কোরবানি করা বৈধ। তবে প্রথম দিন উত্তম। ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, কোরবানি ঈদুল আযহার পর আরো দুইদিন। (মুয়াত্তা ইমাম মালেক)।
পশু জবাইয়ের পর করণীয়: সালমা ইবনে আকওয়া (রাঃ) বলেন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) প্রথমদিকে কোরবানির গোশত তিনদিনের বেশি ঘরে রাখতে নিষেধ করেছিলেন। পরের বছর লোকজন এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস  করলে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন : ‘তোমরা নিজেরা খাও, অপরকে খাওয়াও এবং কিছু জমা করে রাখ।’ (বুখারি, মুসলিম)। কোরবানির পশুর গোশত তিনভাগ করা উত্তম। একভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়-স্বজনের জন্য, আরেক ভাগ গরীব মিসকিনদের দান করা উত্তম। (হেদায়া)। আল্লাহ্ তায়ালা বলেন, ‘তোমরা নিজেরা তা থেকে খাও এবং অভাবী ও ক্ষুধার্তদেরকেও খেতে দাও।’(সূরা হাজ্ব : ৩৬)। বর্তমানে বন্যা-দূর্গতের কথা বিবেচনা করে যথাসাধ্য বেশি করে কোরবানির গোশত বিতরণ করা উচিত। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন, যে মুসলিম কোন বস্ত্রহীন মুসলিমকে কাপড় পরিধান করাবে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের সবুজ রেশমি কাপড় পরিধান করাবেন। আর যে মুসলিম কোন ক্ষুধার্ত মুসলিমকে খাওয়াবে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের ফল খাওয়াবেন। আর যে মুসলিম কোন তৃষ্ণার্ত মুসলিমকে পানি পান করাবে মহামহিম আল্লাহ তাকে জান্নাতের পবিত্র মোহরাংকিত পাত্র থেকে পানীয় পান করাবেন। (আবু দাউদ)। কোরবানির গোশত অমুসলিমকেও দেয়া যাবে। (দৈনন্দিন জীবনে ইসলাম ঃ ২৬৬ পৃষ্ঠা)। কোরবানির পশুর গোশত দ্বারা কসাইয়ের পারিশ্রমিক দেওয়া যাবে না। আলী (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) আমাকে তার কোরবানির উটগুলোর কাছে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। আর এগুলোর গোশত, চামড়া ও বস্ত্র ঝাড়ল্ ইত্যাদি সাদকা করে দিতে বললেন এবং তা থেকে কসাইয়ের মজুরি দিতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, আমাদের নিজেদের পক্ষ থেকে তার মজুরি পরিশোধ করে দেব। (মুসলিম, ইবনে মাজাহ্) পশুর চামড়া গৃহস্থালীর কাজে লাগানো যাবে, তবে বিক্রি করলে তা সাদকা করতে হবে । (হেদায়া ৪/ ১৫২ পৃষ্ঠা, বেহেশতি জেওর)।
মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করা : কোরবানি জীবিত লোকের উপর ওয়াজিব মৃতের উপর নয়। তারপরেও কেউ সাওয়াব পৌঁছানোর নিয়তে মৃতের পক্ষে কোরবানি করতে চাইলে করতে পারে। মৃত ব্যক্তি যদি ওসিয়ত না করে থাকে তবে সেটি নফল কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কোরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি অসীয়ত করে গিয়ে থাকে তবে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না। গরীব মিসকীনদের মাঝে সাদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমাদ, ফাতা: ও মাসা: ৬/ ৩৬৮ পৃষ্ঠা) ।  
কোরবানি ও পরিচ্ছন্নতা : কোরবানির বর্র্জ্য ও অপ্রয়োজনীয় অংশগুলো যেখানে সেখানে না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে রেখে দেয়া যাতে পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা তা নিয়ে যেতে পারে। কারণ পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ পছন্দ করেন যারা তাওবাকারী এবং যারা পবিত্রতা অর্জনকারী। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত : ২২২)। মহানবি সা. বলেছেন, ‘পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ইমানের অঙ্গ’। (মুসলিম)। যে সকল বিষয় মানুষের দেহ, মন ও জনসমাজের জন্য ক্ষতিকর সেগুলোকেও অপবিত্র আখ্যায়িত করে তা থেকে মুমিনকে পবিত্র ও মুক্ত থাকার জন্য আল্লাহ পাক নির্দেশ দিয়েছেন, ‘আর আপনার পোশাক পবিত্র করুন এবং সকল অপবিত্রতা থেকে দূরে থাকুন’। (সূরা মুদ্দাস্সির ঃ ৪-৫)। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ (সা) তিনটি  কাজকে  লা’নতকারী  বলেছেন : মানুষের চলাফেরার  (রাস্তায়)  অথবা  তাদের  (বিশ্রাম নেয়ার) ছায়ায় কিংবা পানির ঘাটে মলমূত্র ত্যাগ করা। (আবু দাউদ)। কাজেই রাস্তার পাশে বা যেখানে সেখানে কোরবানির বর্র্জ্য ফেলে রাখাও অভিশপ্তমুলক কাজ।
ঈদের দিনে নির্দোষ আনন্দ করা জায়েয : আয়েশা (রাঃ) বলেন, ঈদুল ফিতর অথবা ঈদুল আযহার দিবসে আবু বক্বর (রাঃ) তার গৃহে প্রবেশ করেন। তখন রাসূলুল্লাহ (সা) ও সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং দু’টি বালিকা দফ (আরবি ছোট ঢোলক) বাজাচ্ছিল। আবু বকর¡ (রাঃ) তাদের ধমক দিলে রাসূলুল্লাহ (সা) তাকে বললেন, হে আবু বক্বর ! তুমি আমাদেরকে আমাদের অবস্থায় ছেড়ে দাও। কেননা, প্রত্যেক জাতির রয়েছে ঈদ বা উৎসবের দিন, আর আজকের দিন আমাদের ঈদের দিন। (মুসলিম, আহ্মাদ)। তাই ঈদের দিন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যাতায়াত, গোশত পাঠানো, ঈদ মোবারক বা তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিংকুম ইত্যাদি বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা উত্তম কাজ। তবে অশ্লীলতা সবসময়ই বর্জনীয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সঠিকভাবে কোরবানি করার তৌফিক দান করুন, আমীন।
লেখক ঃ সহকারী শিক্ষক, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন পাবলিক স্কুল ও কলেজ, বগুড়া।
rrahman.rr75@gmail.com
০১৭৩৯-৮৫০৬৫৬,