বানভাসিদের জন্যেও টেকসই পুনর্বাসন প্রকল্প নিন

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৪১ পিএম, ২৯ জুলাই ২০২০

আতাউর রহমান মিটন : শুরুতেই আমি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করছি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এর কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক, বাল্যবন্ধু সাখাওয়াত হোসেন শফিক এর পিতা, যিনি বগুড়া করোনেশন স্কুলের সাবেক সহকারী শিক্ষক ছিলেন, সেই প্রিয় আবুল হোসেন স্যার এর বিদেহী আত্মার প্রতি। তিনি গত রোববার বিকাল ৩টায় আমাদের ছেড়ে চির বিদায় নিয়েছেন। আমি ২ বৎসর বগুড়া করোনেশন স্কুলে পড়েছি সেই সূত্রে আবুল স্যার আমার সরাসরি শিক্ষক ছিলেন। শফিক আমাদের সহপাঠি ও সহযোদ্ধা। সে ছাত্রলীগ করেছে আর আমি ছাত্র ইউনিয়ন। শফিকের ছোট বোন বগুড়া আজিজুল হক কলেজে আমাদের হাতে গড়া ‘সংস্কৃতি সংসদ’ এর অত্যন্ত সক্রিয় সদস্য ছিল। সুধী পাঠক, শ্রদ্ধেয় আবুল স্যার অত্যন্ত বিচক্ষণ শিক্ষক এবং কড়া প্রকৃতির মানুষ ছিলেন। তিনি বঙ্গবন্ধু’র আদর্শের একজন একনিষ্ঠ সমর্থক ছিলেন। প্রিয় আবুল স্যার আমাদের হৃদয়ে চিরদিন বেঁচে থাকবেন। স্যারের পরিবারের সকলের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করছি।  
আমি গভীর সমবেদনা ও শোক জানাচ্ছি নওগাঁ-৬ (আত্রাই-রানীনগর) আসনের জাতীয় সংসদ সদস্য ইসরাফিল আলম এর প্রতি। গত সোমবার ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে তিনি চির বিদায় নিয়েছেন। খুব অসময়ে এবং অত্যন্ত কম বয়সে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। মহান ¯্রষ্টা ইসরাফিল সাহেবের পরিবার-পরিজনকে এই শোক সইবার শক্তি দিন। জননেতা ইসরাফিল আলম বর্তমান সংসদে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং পাশাপাশি বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটিরও সদস্য ছিলেন। মৃত্যু আমাদের কখন কাকে নিয়ে যাবে আমরা জানি না। তাই আমরা যেন সকলেই সকলের জন্য দোয়া করি ও কল্যাণ কামনা করি। মানুষের জীবনে অপর মানুষের দোয়া ছাড়া আর কোন স্থায়ী অর্জন নেই। দোয়াটাই শেষ পর্যন্ত কাজে লাগবে। মানুষের জন্য ভাল কাজ বেশি বেশি করতে হবে। মৃত্যুর পরেও যেন মানুষের দোয়া পাওয়া যায় সেইভাবে বর্তমানের কর্মকান্ড পরিচালনা করতে হবে। আমাদের মধ্যে সেই শুভবুদ্ধির জাগরণ ঘটুক। মহান ¯্রষ্টা আমাদের হেদায়েত দান করুন। আমীন।
আর মাত্র দু’দিন পরেই পবিত্র ঈদুল আযহা, মুসলিম সম্প্রদায়ের কাছে ত্যাগ ও আনুগত্যের মহিমায় ভাস্বর এক মহান উৎসব। ¯্রষ্টার প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্যের নিদর্শন হিসেবে বিশ্বের মুসলমান সম্প্রদায় এই দিনটি পালন করে। এটা কোনভাবেই লোক দেখানো ‘পশু জবাই’ করার উৎসব নয়, বরং তাকওয়া অর্জন ও নিজের মধ্যের পশুত্বকে কোরবানি দেয়ার প্রতিজ্ঞা গ্রহণের এক মহোৎসব এটি। কবি কাজী নজরুলের রচিত ‘কোরবানি’ কবিতা থেকে তাই বলি,
‘ওরে সত্য মুক্তি স্বাধীনতা দেবে এই সে খুন-মোচন!/ওরে হত্যা নয় আজ ‘সত্যাগ্রহ’ শক্তির উদ্বোধন!
ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ঈদুল আযহা আমরা পালন করছি এমন এক সময়ে যখন আমাদের ত্রিমুখী সমস্যা সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। করোনা সংকটের মধ্যেই আমরা ভাসছি বানের জলে আর জাতি কাতর দীর্ঘায়িত বন্যার ভয়ে। ঈদ ও বন্যার কারণে দাম বেড়েছে কতিপয় পণ্যের। সরকারের ঘোষিত ‘সামাজিক দূরত্ব’ মানা অসম্ভব জেনেও ঈদে লোকজন ছুটছে বাড়ি আর ভিড় বাড়ছে পশুর হাটে! করোনা সংক্রমণের তোয়াক্কা নেই কারও মনে! জীবনের প্রয়োজনে আজ আমরা সবাই স্বাভাবিক হবার জন্য চেষ্টা করছি। বিশেষজ্ঞরা এটাকে বলছেন, ‘নয়া স্বাভাবিকতা’। নতুন এই পরিস্থিতি বা নয়া স্বাভাবিকতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে না শিখলে আগামীতে যে কাউকেই হোঁচট খেতে হতে পারে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বন্যা দীর্ঘায়িত হতে পারে। সকলকে প্রস্তুত থাকতে হবে’। দলীয় নেতাদের  সাথে ভিডিও কলের মাধ্যমে এক আলোচনায় তিনি বলেছেন, ‘১৯৯৮ সালের বন্যা ছিল সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি। প্রাকৃতিক কারণে শ্রাবণ মাসের বন্যা দেশের উত্তরাঞ্চলে শুরু হয় এবং ভাদ্র মাসে তা দক্ষিণাঞ্চল দিয়ে নেমে যায়। এবারের বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে বরাবরের মতো আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।’ এসময় তিনি সামর্থ্যবান সবাইকে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘জাতির পিতা সারা জীবন মানুষের অধিকার আদায়ে সংগ্রাম করেছেন। এ দেশের মানুষের কল্যাণে নিজের জীবন দিয়ে গেছেন। জাতির পিতার মহান আদর্শ ধারণ করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা মানুষের ঘরে ঘরে ত্রাণ সহায়তা পৌঁছে দেবেন এবং বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। দেশের সরকার প্রধান হিসেবে তিনি নিশ্চয়ই সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে বলেছেন যে এবাররে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হবে। আর সেটা যদি ১৯৯৮ সালের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী রূপ নেয় তাহলে দেশের মানুষকে আরও ভয়াবহ এক পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তৈরী থাকতে হবে। বিশেষ করে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষিখাত, মৎস্য ও প্রাণীসম্পদ এর কথা বিবেচনায় রেখে সরকারকে একটি সমন্বিত ত্রাণ ও দুর্যোগ মোকাবেলা পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। করোনা সংকটের ভেতরেই বন্যার এই ভয়াবহতা দেশের প্রান্তিক মানুষগুলোকে আরও ভয়াবহ এক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এই সময়ে সরকারের আন্তরিক সহযোগিতা ছাড়া মানুষের দাঁড়াবার আর কোন জায়গা নেই।
আমরা গণমাধ্যমে দেখেছি করোনাকালে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের অতি দরিদ্র সাড়ে ৫ কোটি মানুষের ৬ মাসের জন্য খাদ্য সহায়তা দিবেন। তিনি মোবাইল ফোনে দুস্থ পরিবারগুলোকে ২৫০০ টাকা হিসেবে সহায়তা দিয়েছেন। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচীর আওতায় আরও নানাভাবে প্রান্তজনদের মাঝে সহায়তা করা হচ্ছে বলে সরকার বলে থাকেন। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কেবলমাত্র সঠিক উপকারভোগী চিহ্নিত করতে না পারা ও ত্রাণ বিতরণে জড়িতদের অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সরকারের এই মানবিক সহায়তা সঠিকভাবে ভুক্তভোগীদের কাজে লাগছে না। গণমাধ্যমে এই কথাগুলো অনেকবার এসেছে এবং সরকার তা জানেন। এটা সত্যিই দুঃখজনক এবং হৃদয় বিদারক। বঙ্গবন্ধুকে ভালবাসলে দেশের প্রান্তজনদের কল্যাণে দেয়া ত্রাণের টাকা বা চাল চুরি করার কথা মাথাতেও আনা সম্ভব নয়। যারা দুঃসময়ে জনগণের পাশে দাঁড়ায় না, যারা ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম করে, যারা এই অনিয়ম প্রশ্রয় দেয় তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল নন। তারা সুযোগসন্ধানী। সরকার ও দলের ভেতর থাকা প্রগতিশীল, সৎ ও নিষ্ঠাবান নেতা-কর্মীদের উচিত দলের ভেতরে ঘাপটি মেরে থাকা এই কেউটেদের পরিচয় প্রকাশে সহায়তা করা। এদের কোনভাবেই প্রশ্রয় বা আশ্রয় না দেয়া। বন্যা বাংলাদেশের মানুষের কাছে কোন নতুন ব্যাপার নয়। কিন্তু করোনাকালের দুর্যোগ না কাটতেই বন্যার পানিতে ডুবে যাওয়ার এই প্রবল ধাক্কাটা সামলে ওঠা আমাদের জন্য কষ্ট সাধ্য। তবে এটাও ঠিক বাংলদেশের মানুষ ঠিকই সবকিছু সামলে নেবে এবং তারা আবার ঘুরে দাঁড়াবে। সত্তরের বন্যার পরে একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ, আবার চুয়াত্তরে ভয়াবহ বন্যা, তারপর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র - এই সকল সমস্যা মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ এগিয়েছে। শত প্রতিকূলতাকে মোকাবেলা করেই বাংলাদেশ দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়ন সূচকে ইতিবাচক সাফল্য অর্জন করেছে। আমাদের অগ্রগতি দক্ষিণ এশিয়ায় ঈর্ষণীয়। আমরা ভালই করছিলাম কিন্তু করোনা আমাদের বিরাট এক পরীক্ষার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। বন্যা যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে। এমতাবস্থায়, সরকারের ত্রাণ কর্মসূচীকে জোরদার করতে হবে এবং সেখানে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। এটা সত্য যে, গ্রাম পর্যায়ে সরকারের সহায়তা কর্মসূচী পূর্বের যে কোন সময়ের চেয়ে কয়েকগুণ বেড়েছে কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সেই তুলনায় স্বচ্ছতা বাড়ে নি। এখনও পুরনো কায়দায় দলীয় কর্মী নির্ভর একটা বিতরণ প্রক্রিয়া চলমান যার স্বচ্ছতা প্রশ্নবিদ্ধ।
জিইডির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে ১৪৫ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি চলমান রয়েছে। সরকার প্রতিবছরই বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী বেষ্টনী কর্মসূচির পরিধি ও পরিমাণ বৃদ্ধি করছে। করোনাকালেও আমরা সরকারের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে বিশেষ প্রণোদনা ঘোষিত হতে দেখেছি। কিন্তু তাতে করে কি রাস্তায় হাত পেতে থাকা, ত্রাণের আশায় অপেক্ষমাণ মানুষের সংখ্যা কমেছে? সরকার যে সাড়ে ৫ কোটি হত দরিদ্র মানুষকে খাওয়ানের অঙ্গীকার করেছে সেই অর্থ তাহলে যাচ্ছে কোথায়? বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ক্ষতি কি সরকারের সামান্য খয়রাতি সাহায্য দিয়ে পূরণ করা যায়? কৃষক আসলে সরকারের কাছ থেকে কিছু আমন ধানের বীজ বা চারা ক্রয়ের জন্য সামান্য কিছু টাকা ছাড়া আর কিছু কি পাবে? দেশের বড় বড় শিল্প কলকারখানার মালিকেরা সরকারের প্রণোদনা যেভাবে এবং যত সহজে পেয়ে যায় সেই তুলনায় আমাদের প্রান্তজন, আমাদের ক্ষুদ্র কৃষক তারা কি সহায়তা পায়? সরকার যতটুকুই বরাদ্দ দেয় সেটাও কি তাদের হাতে সুষ্ঠুভাবে পৌঁছায়!
দরিদ্র মানুষগুলোর জীবনমানের টেকসই উন্নতি করতে চাইলে সরকারকে তাদের জন্য বিশেষ বরাদ্দ দিতে হবে। পরিকল্পনা নিতে হবে টেকসইভাবে। সম্প্রতি সরকার কক্সবাজারের চকোরিয়ায় খুরুশকূল এ জলবায়ূ উদ্বাস্তু ৬০০ পরিবারের মধ্যে ২০টি ফ্লাট হস্তান্তর করেছে। এই প্রকল্পে প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৪ হাজার ৪০৯টি উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। আমি ব্যক্তিগতভাবে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। এটাই সত্যিকারের উন্নয়ন মডেল। বছর বছর ছিঁটেফোটা উন্নয়ন করার চাইতে একটা এলাকায় বড় বাজেটে সমন্বিত উন্নয়ন করাটাই উত্তম পন্থা। একই মডেলে আমি বন্যা কবলিত এলাকার সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর জন্যেও ফ্লাট নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ এবং তাদের জন্য টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা গ্রহণ করার জন্য সরকারের কাছে প্রস্তাব করছি। ঢাকায় নতুন করে জলাবদ্ধতা নিরসনে ২০ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে বাইপাস সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। ঢাকার জন্য এমন পরিকল্পনা নেয়া গেলে দেশের বন্যায় সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর জন্য উন্নত ফ্লাট বাড়ি কেন নির্মাণ করা সম্ভব নয়?
মুজিববর্ষে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের সকল গৃহহীনকে ঘর বানিয়ে দেয়ার যে স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তা পূরণ হোক। সেই স্বপ্নের সূত্র ধরেই আমরা বানভাসি এলাকার সর্বস্ব হারানো মানুষগুলোর জন্য বিশেষ পরিকল্পনা নেয়ার জন্য সরকারকে অনুরোধ করছি। চরম অবহেলিত ও অসহায় এই মানুষগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে তাদের জন্য কিছু করাটা মানবতার নেত্রী নিজেও অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করবেন বলে আমার বিশ্বাস। সকলের ঈদ মঙ্গলময় হোক। আসুন, আমরা স্বার্থপরতাকে কোরবানি দিয়ে আরও বেশি বেশি করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই। মানবতার জয় হোক।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
miton2021@gmail.com
০১৭১১-৫২৬৯৭৯