স্বাস্থ্যখাতে যতসব অনিয়ম

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৯:০১ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২০

গোপাল অধিকারী :চিকিৎসা নিয়ে বাণিজ্য, অপচিকিৎসা পুরাতন। দীর্ঘ অভিযান, আইন ও কর্মকান্ডের পরও পরিবর্তন হয়নি এই সেক্টরটি। চিকিৎসকবিহীন চিকিৎসা, প্রয়োজনবিহীন টেস্ট আর প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিবিহীন রিপোর্ট নির্মূল হয়নি এসব প্রতারণা। সর্বশেষ করোনা নিয়েও চলছে চিকিৎসা বাণিজ্য। যার প্রতিফলন করোনার সার্টিফিকেট জালিয়াতি বা অনুমোদনহীন করোনার নমুনা সংগ্রহ। কতটা অমানবিক হলে এই সংকটময় সময়ে চিকিৎসার নামে বাণিজ্য করা যায় তা আমার কাছে বোধগম্য নয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলেই সার্টিফিকেট জালিয়াতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করার সংবাদ পেয়েছি। সর্বশেষ চিকিৎসা সেক্টরের এই অপরাধের মাঝে ঘি ঢেলেছেন জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী ও রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদ।
করোনা মহামারিতে মানুষের জীবন নিয়ে নির্মম প্রতারণায় উঠে এসেছে সাবরিনা চৌধুরী নামে এক চিকিৎসক ও  স্বামীর নাম। জেকেজি নামে একটি প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বিশদ তদন্ত করতে গিয়েই উঠে আসে তাদের নাম। জেকেজির ব্যাপারে তদন্ত করে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে করোনার টেস্ট বাণিজ্য করে জেকেজি হাতিয়ে নিয়েছে সাত কোটি ৭০ লাখ টাকা। একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা হয়ে সাবরিনার এহেন কর্মকান্ড কোন বিবেকবান সমাজ মেনে নিবে বলে মনে হয় না। তারপরও চলতে থাকে বা থাকবে এমন কাহিনী। সময় ও নামের শুধু পরিবর্তন দেখি। কিন্তু কেন? এই অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ীই বা কার্?া চোখ রাখি সাহেদের দিকে। দেশজুড়ে আলোচিত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান মো. সাহেদকে ১৫ জুলাই গ্রেপ্তার করেছে আইন শৃংখলা বাহিনী। করোনার নমুনা পরীক্ষার মনগড়া রিপোর্ট দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে এবার মামলা হলেও ধীরে ধীরে তার সব অপকর্ম সামনে চলে আসছে। তিনি রিজেন্ট গ্রুপ নামে ব্যবসা শুরু করেন। চালু করেন রিজেন্ট হাসপাতাল। কিন্তু ২০১৪ সালেই এই হাসপাতালের লাইসেন্সের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। রিজেন্ট হাসপাতালকে করোনা টেস্টের অনুমোদন দেওয়া নিয়ে তথ্যের গড়মিল বা নিজেকে বাঁচানোর প্রবণতা তা থেকে কিন্তু সহজেই অনুমান করা গেল স্বাস্থ্যখাতের কালো বিড়ালের ইতিহাস। সাধারণ জনগণ ও গুরুত্বপূর্ণ জনগণ এই দুই নামের জনগণ আছে কি না বা তাদের জন্য আইনের ফাঁক-ফোকর আছে কি না তা নিয়ে আমি বেশ শংকিত বোধ করছি। শংকিত এই কারণেই যে, যে কোন প্রতিষ্ঠান করতে গেলে সত্যায়িত প্রমাণিত কত কিছু প্রয়োজন হয়। কিন্তু সাহেদ বা সাবরিনার কি কিছুই প্রয়োজন হয় নি?  তাদের জন্য নিয়মটা কি পৃথক ছিল, না তাদের বৈধ্যতাদানের প্রতিষ্ঠান পৃথক ছিল যে এত অপকর্ম থাকার পরও তারা চিকিৎসা নিয়ে ব্যবসা করতে পারল। শুধু বেসরকারি সেক্টরেই নয় গলদ রয়েছে সরকারি সেক্টরেও। পর্দা কেলেঙ্কারী, মেশিন কেলেঙ্কারীর কথা এখনো ভুলে নি মানুষ।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে, একটি দেশের জনসংখ্যার অনুপাতে যতজন ডাক্তার, নার্স, মেডিকেল টেকনলজিস্ট, অ্যানেস্থেটিস্ট থাকা আদর্শ সেটি বাংলাদেশে নেই? করোনার কারণে সেই সংকট প্রবলভাবে দেখা গেছে? এছাড়া স্বাস্থ্যসেবা দিতে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবতো আছেই? একটার পর একটা দুর্নীতি অনিয়মের কেলেঙ্কারি ধরা পড়ছে বাংলাদেশে সরকারি হাসপাতালগুলোতেও। আর এসব ঘটনার সাথে যারা জড়িত তারা সবাই অপকর্ম করছে রাজনৈতিক পরিচয়ে। আমি মনে করি চিকিৎসা নিয়ে বাণিজ্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল। কারণ চিকিৎসার অধিকার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। অন্যান্য মৌলিক অধিকার খর্ব হলে মানুষ বাঁচতে পারে মানবেতরভাবে কিন্তু চিকিৎসাখাতে বাণিজ্য হলে অনেকেই মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়ে। স্বাস্থ্যবিভাগের তিনটি বিষয়ে আমার মনে হয় কঠোর নজরদারী প্রয়োজন। এক. প্রতিষ্ঠানের সঠিক অনুমোদন বা নবায়ন, দুই. প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনবিহীন টেস্ট করছে কি না, তিন. কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চিকিৎসকবিহীন চলছে কি না। প্রয়োজনে এই তিনটি কাজ তদারকির জন্য সারাদেশে আলাদা পরিষদ গঠন করতে পারেন। চিকিৎসার নামে বাণিজ্য বা অপচিকিৎসা ও ধীরগতি কোনটাই সভ্য রাষ্ট্রের জন্য কাম্য নয়। করোনা টেস্টের যে বাধ্যবাধকতা দিয়েছে আমি তার সাথে দ্বিমত পোষণ করছি। কারণ জাতীয় সংকটময় সময়ে দেশে যেমন জরুরি অবস্থা জারী করা হয় আমার মতে সংকট সময়ে যে সেক্টরে সংকট ত্বরান্বিত হচ্ছে সেই সেক্টরকে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়া উচিত। সরকারের ভাবমূর্তি অক্ষুন্ন রাখতে স্বাস্থ্যখাতের সকল অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। কঠোর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে স্বাস্থ্য সুরক্ষা।
লেখক ঃ সাংবাদিক-কলামিস্ট
gopalodikari1213@gmail.com
০১৭২৩-০৯১২১৩