কোরবানির শিক্ষায় মানবতা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:৫৫ পিএম, ২৮ জুলাই ২০২০

মোঃ সাখাওয়াত হোসেন: ১৪৪১ হিজরী সালের জিলহজ মাসের চাঁদ উদিত হয়েছে। জিলহজ মাসের ১০ তারিখ হিসেবে ১ আগস্ট ২০২০ তারিখে ঈদুল আযহা অনুষ্ঠিত হবে। ঈদ মানে খুশি আর আনন্দ মুসলমানদের চিরাচরিত রীতি। কোরবানির পশু কেনা হবে। কোরবানির জন্য কেনা বিরাট ষাঁড়টি দেখতে দলবেধে পাড়া মহল্লায় ছুটাছুটি। কখনও টেলিভিশনের সামনে বসে অপেক্ষা করা বাবা হজে গেছেন, দেখা যায় কিনা। লাখ লাখ মুসলমান লাব্বাইকা আল্লাহম্মা লাব্বাইক ধ্বনিতে মুখরতি পবিত্র কাবা তওয়াফ করছেন। এখন এগুলো যেন স্বপ্নের দিনের পুরোনো স্মৃতি। কারণ মহামারী করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু আতংকে কল্পনাতীত ক্ষতির কাছে ধরাশায়ী বর্তমান বিশ্ব। করোনা সামাল দিতে করুণ অবস্থায় নাস্তানাবুত বিশ্বের পারমানবিক ক্ষমতাধর দেশগুলো। সবাই যে যার অবস্থান থেকে ইয়া নাফসি, ইয়া নাফসি। এখন ধারাবাহিক লকডাউন, মাস্ক পরা, হাত ধোয়া আর দূরত্ব বজায় রাখাই যেন শেষ ভরসা। চলছে টিকা আবিষ্কারের গবেষণা আর সান্ত¡না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বার্তা বিভিন্ন গবেষণার পর আবিষ্কৃত টিকা সংস্থাটির নিকট পৌছতে এক বছর লেগে যেতে পারে। কে হবে সেই প্রতিষেধক প্রস্তুতকারী বাহাদুর রাষ্ট্র যে কান্ডারী হয়ে রক্ষা করবে সমগ্র বিশ্বকে। এখনও পর্যন্ত সবাই আকাশের দিকেই তাকিয়ে। মহান আল্লাহ ব্যতীত এই আক্রমণ থেকে রক্ষা করার কেউ নেই পৃথিবীতে এ কথা স্পষ্ট বুঝে ফেলেছে সবাই। বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাস সংক্রমণ ও মৃত্যু আতঙ্কে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থবির। এ কারণে গত ২২ জুন ২০২০ তারিখে সৌদির হজ ও ওমরাহ মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে শুধুমাত্র নিজ দেশে অবস্থানরত সীমিত সংখ্যক ১০ হাজার মুসলমানদের নিয়ে হজ অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়েছে। এই ঘোষণায় করোনার সাথে বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে করুণ সুর প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম প্রত্যেক মুসলমানের উপর হজ (ফরজ) বাধ্যতামূলক। ২০১৯ সালের হজে মুসলিম বিশ্বের ২৫ লাখ হাজী সমবেত হয়েছিলেন পবিত্র কাবায়। সৌদি আরবে অবস্থানরত মধ্য হতে দশ হাজার জন মুসলমান কেবল এ বছর হজে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। তাই হজ এর কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান হাজার হাজার কোটি টাকার ক্ষতির সম্মুখিন হতে চলেছে।    
বড় ব্যাপার হলো, বিশ্ব মুসলিমের হৃদয়ে করোনায় স্বজন হারানোর বেদনার সাথে যুক্ত হলো অব্যক্ত বেদনা। মৃত্যুজনিত কারণে অনেকে হয়তো আর  কখনও  হজ করার সুযোগ পাবেন না। চলতি বছরে বাংলাদেশের যারা হজে যাওয়ার নিবন্ধন করেছিলেন, তারা যে কোন সময় তাদের অর্থ ফেরত নিতে পারবেন বলে ধর্ম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। ধর্ম মন্ত্রনালয় সংবাদ মাধ্যমকে জানায়, ২০১৯ সালে ১ লাখ বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ প্রকাশিত নিয়মিত প্রতিবেদনে ইতোমধ্যেই মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয়েছে সাড়ে ৬ লাখের অধিক প্রাণ। করোনার মাঝে প্রাণহীন আনন্দ নিয়ে বিদায় দিতে হয়েছে ইদুল ফিতরকে। ঈদুল আযহাকে নিয়ে লিখতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে  বিগত  ঈদুল ফিতরের চিত্র। করোনা আতঙ্কে স্লান ছিলো ঈদুল ফিতরের আনন্দ। সরকারী সিদ্ধান্ত মোতাবেক কেন্দ্রীয়  ঈদগাহ মাঠের পরিবর্তে নিজ নিজ পাড়া মহল্লার মসজিদে ঈদের নামাজ পড়তে হয়েছে। করোনা সতর্কে অনেকে যাননি ঈদের জামায়াতে। স্বাস্থ্য বিধি মানতে, সামাজিক দূরত্ব ছিলো মসজিদগুলোতে। ছিলো না কোলাকুলি, করমর্দন আর বাসায় যাওয়ার আমন্ত্রণ। ধর্মীয় আবেগ আর অনুভূতি নিয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মুক্তির আকুতি জানাতে ঘরে বসে অথবা  বাড়ীর ছাদে  ঈদের নামাজ পড়েছে মুসুল্লীগণ। খুলনার কয়রা উপজেলাবাসি হাটু পানিতে দাঁড়িয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছে। শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠ সহ দেশের ঈদগাহ মাঠে দেখা যায় খড়ের গাদা, না হয় গরু বাঁধা।
নামাজ শেষে একজন আরেকজনের বাড়ীতে যেতে পারেননি। ঘরবন্দীর কারণে অনেকে দেশ বিদেশে ভার্চুয়াল কুসল বিনিময় আদান প্রদান করেছেন। গ্রামের ৮০ বছর বয়সি আফজাল চাচার গল্প আমার জনমেও এমন ঈদ দেখিনি । করোনা আক্রান্ত বিশ্বে¦ প্রায় ০৪ মাস পার হতে চলেছে। জীবন, জীবিকা এবং অর্থনীতির চাকা গতি হারিয়েছে। একটি সমীক্ষায় বলা হয়েছে মহামারীর কারণে দেশে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ কর্মজীবি মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। করোনায় গরুর দাম কমে যাওয়ায় কর্মহীন বেকার মানুষগুলো খামারমুখী হওয়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
মানুষ সিদ্ধান্ত নিতে পারছেনা জীবন নাকি জীবিকা সামলাবে। একদিকে অর্থনীতির শোচনীয়তা অন্য দিকে মৃত্যুর উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের মতে, কবে শেষ হবে এই উদ্বেগ তা অনিশ্চিত। কোরবানির পশুবিক্রির হাটগুলো হয়তো জমে উঠবে না। উঠলেও পর্যাপ্ত ক্রেতা না আসায় গরু বিক্রেতাকে লোকসান গুনতে হবে এই ভয়ে আছে অনেকে। করোনার কারণে ভারত থেকে গরু আনা বন্ধ ঘোষণায় সরকারকে সাধুবাদ জানিয়েছে দেশবাসী। প্রাণি সম্পদ অধিদপ্তরের হিসাব মতে দেশে গত বছরের ১ কোটি ২০ লাখ গরু কোরবানি হলেও ১০ লাখ গরু বেচাকেনা হয়নি । বিগত তিনমাসে গরু কম জবেহ হওয়ায় প্রায় ৩০ শতাংশ গরু জমে আছে। চলতি বছরের কোরবানিতে ১ কোটি ২০ লাখ গরু কোরবানি হওয়ার কথা। উদ্বৃত্ত গরুগুলো যোগ হওয়াতে খামারী এবং ক্ষুদ্র গরু পালনকারীদের লোকসান হওয়ার সম্ভাবনা বেশী। করোনার কারণে ব্যবসায়ীরা ঢাকার হাটগুলোতে কোরবানির পশু বেচার জন্য নিতে আগ্রহ কম দেখাচ্ছে এবার। গরু ব্যবসায়ীদের ধারনা প্রায় ২ লাখ কসাই মফস্বল থেকে ঢাকায় যায়। করোনা এবং লকডাউনের কারণে এবার তারা ঢাকায় যেতে পারছেনা। ফলে কসাই বিড়ম্বনার কারণে ঢাকায় গরু বেচাকেনা কম হবে। বিশ্বব্যাপি অর্থনৈতিক মন্দার করণে অনেক মধ্যবিত্ত পরিবারই ইতোমধ্যে নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে পরিনত হয়েছে। যিনি ২টি পশু কিনতেন তিনি এবার ১টি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।  যেখানে ২ অথবা ৩ জনে ভাগে কোরবানি দিতেন সেখানে অনেক পরিবার কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য হারিয়েছেন। আবার দিলেও ৬ থেকে ৭ ভাগে। গো -খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় যোগানের চেয়ে চাহিদা কমে গেছে। ফলে পশু বিক্রেতাদের লোকসান হওয়াই স্বাভাবিক। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোরবানির হাটগুলোতে পশু বেচাকেনার ব্যাপারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়ের সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। ইতোমধ্যেই বন্যায় দুর্ভোগের শিকার লাখ লাখ মানুষ। ঈদকে সামনে রেখে বন্যার পানি বৃদ্ধির কারণে কোরবানির গরু বেচাকেনায় ভোগান্তি বেড়েছে। এ সমস্যা সমাধানের জন্য হাটের ইজারাদারদের বিশেষ ভূমিকা নিতে হবে। প্রতিটি পশুর হাটে লক্ষ লক্ষ লোকের অর্থ আদান প্রদান হবে। তাই স্বাস্থ্যবিধি বাস্তবায়নের পাশাপাশি নিরাপত্তাকেও চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে আরও তৎপর হতে হবে। হাট বসানোর জন্য অবশ্যই ফাঁকা স্থান বেছে নিতে হবে। হাটে প্রবেশ ও বাহির পথ আলাদা রাখতে হবে। কোরবানি পশুর হাটেগুলোতে ঘন ঘন জীবাণু নাশক ছিটাতে হবে। তেমনিভাবে কোরবানি পরবর্তী জবেহকৃত পশুর বর্জ্য দ্রুত পরিষ্কার করে ব্লিচিং পাউডার সিটাতে হবে। সর্বোপরি সবাই স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সচেতন হওয়া জরুরি।
গত কোরবানির ঈদে কোরবানির পশুর  চামড়া  নিয়ে চরম বেকায়দায় পড়েছিলেন কোরবানি দাতারা। হাফিজি বা কওমি মাদ্রাসাগুলো প্রচুর চামড়া দান হিসেবে পায়। বিক্রি করতে না পেরে অবশেষে গর্তে পুতে পঁচা গন্ধ থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করেছে। এবারও সেই আশঙ্কার কথা ভাবছে অনেকে। এই সমস্যা সমাধানের লক্ষে চামড়া শিল্প নিয়ে সরকারের একটি সুপরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন প্রয়োজন। একটি বেল্ট বা চামড়া পণ্যের দাম ২০০ থেকে ২০০০ টাকা বা তদুর্ধ্ব একটি চামড়ার জুতার দাম ১০০০ থেকে ৫০০০ বা তদুর্ধ্ব হলে কোরবানির পশুর চামড়ার এমন করুণ অবস্থা কেন ? চামড়া একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। মধ্যস্বত্বভোগি অথবা ট্যানারি মালিকগণ যাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বেকায়দায় না ফেলে সে ব্যাপারে শিল্প মন্ত্রনালয় এর পক্ষ থেকে গঠিত টাস্কফোর্সকে জোরালো ভুমিকা রাখতে হবে। করোনায় দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতির চাকা সচল করা প্রয়োজন। তাই সম্ভাবনাময় এই শিল্পকে লসের হাত থেকে রক্ষা করা হলে দেশের উন্নয়নে চামড়া শিল্প বিশেষ জোগান দিবে। করোনা দীর্ঘ মেয়াদী হওয়ায়  লকডাউন  মানার ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলছে বিশ্ববাসী। জীবনের জন্য জীবিকা প্রয়োজন একথা সত্য। তবে বেচে থাকাটাই বড় চ্যালেঞ্জ। এক অচেনা পথের অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে তাকিয়ে সবাই।
শিশু আদিব এর  বিরক্তস্বরে জিজ্ঞাসা  বাবা কবে যাবে এ করোনা ? ঈদুল ফিতরের মত ঈদুল আজহা ও কি আনন্দহীন হবে ? এ প্রশ্ন এখন বিশ্বের সকল শিশুর। তারা ঈদের দিনে আবার মেতে উঠতে চায় হৈ চৈ খোলধূলা, আর আড্ডায়। বিশ্ব মুসলিম ঈদের চেয়ে বেশী খুশি হবে পৃথিবী থেকে করোনা বিদায় নিলে। ঈদের দিন বা পরের দিন দেশের শিশু বিনোদন কেন্দ্রগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে খুলে রাখা প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ঘরবন্দী শিশুদের কোমল মনে কষ্ট তৈরী হয়েছে। তাই তারা বুক ভরে মুক্ত বাতাস নিতে চায়। গত ঈদগাহ মাঠের মেলা থেকে খেলনা কিনতে পারেনি শিশুরা। এ কষ্ট তারা ভুলতে পারেনি। প্রবিনগণ কাতর কণ্ঠে বলছেন, বৈশ্বিক এই মহামারীতে বেঁচে আছি এটাই আমাদের ঈদ। গ্রামে ঈদ করতে যাওয়া পরিবারগুলোকে বাড়তি সচেতন হতে হবে। কারণ চারদিকে বন্যার পানির পাশাপাশি সাপ বিচ্ছুর উপদ্রব থেকে সাবধান থাকতে হবে। আনন্দ যেন বিষাদে পরিনত না হয় সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।
এবারের ঈদুল আযহা যেন হয় নির্মল আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। আমাদের প্রত্যাশা আবার উঠবে সূর্য নতুন হাসি নিয়ে। লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বাইকা ধ্বনিতে মুখরিত হবে বিশ্ব । সে দিনের অপেক্ষা আর স্বাস্থ্য বিধি মেনে সতর্ক থাকা ছাড়া উপায় নেই। তাই বাঁচার জন্য ভিন্নপথে নিরাপদে চলা শিখতে হবে। বেঁচে থাকলে জীবনে ঈদ অনেক আসবে। কোরবানির শিক্ষায় মানবতার স্বার্থে নিজেকে উৎসর্গ করার সুযোগ এসেছে। অসামর্থ্য পরিবারগুলো যাতে কোরবানীর গোশত পায় সে ব্যাপারে সমাজের সচ্ছলদের এগিয়ে আসতে হবে। এবার হজে যাওয়া হলোনা তাতে ভেঙ্গে না পড়ে নিজ নিজ বৃদ্ধ পিতামাতার সেবায় নিজেকে নিবেদন করুন হজের হক আদায় হয়ে যাবে। সেই সাথে স্বাস্থ্য সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। মনে রাখা প্রয়োজন অসতর্কতায় আপনার মৃত্যু কারো কাছে একটি সংখ্যা হলেও প্রিয়জন ও পরিবার অজানা ঘোর অন্ধকারে পতিত হতে পারে। কোরবানী মানে পশু জবেহ দিয়ে গোশত খাওয়ার উৎসব নয়। লোভ হিংসা বিদ্বেষ পরিহার করে পরার্থে নিজেকে নিয়োজিত করে মহান আল্লাহর সšুÍষ্টি অর্জন করাই কোরবানির স্বার্থকতা। এবারের কোভিড-১৯ এর মাঝে আগত ঈদুল আযহা সর্বস্তরে পাশবিকতার কোরবানি হবে- এই প্রত্যাশা বিবেকবানদের। অবরুদ্ধ জীবনের এক ঘেয়েমি থেকে বের হয়ে মুক্ত আকাশের নির্মল বাতাসে প্রাণ ভরে নিঃশ্বাসের অপেক্ষায় পৃথিবীবাসী।
লেখক ঃ কলামিস্ট  
sakowathossain1981@gmail.com
০১৭৪৮-৯৭২৭৯৩