নিশ্চিত ‘অনিশ্চিত’ ভাবনায় বিশ্ব

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৭:২৮ পিএম, ২৯ জুন ২০২০

অচিন্ত্য চয়ন : বিশ্ব এখন নিশ্চিত ‘অনিশ্চিত’ শব্দ নিয়ে ভাবনায় পড়েছে! ভাবনার বিষয় হলো করোনা ‘পরবর্তী’ বিশ্বে মানবজাতির জীবন-জীবিকা। যেখানে করোনার প্রাদুর্ভাব সারা বিশ্বে একটি প্রলয় সৃষ্টি করেছে, সেখানে এসব ভাবনা-চিন্তা জটিল অংকের, হিসাবটা মেলানো খুব কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। করোনা-পরবর্তী বিশ্ব কখন আসবে এটি যেমন অনিশ্চিত, তেমনি দ্বিধার আকাশে উঁকি দিচ্ছে করোনা-পরবর্তী বিশ্ব কেমন হবে, কেমন হবে মানুষের জীবন-যাপন? এমন প্রশ্ন থেকে মুক্তি পাচ্ছেন না কেউ। ‘পরবর্তী’ শব্দটা সংশয়ের, দ্বন্দ্বের। কারণ ‘পরবর্তী’ সময় অর্থ করোনামুক্ত বিশ্ব নয়, তবে আক্রান্তের হার কমিয়ে আসার সম্ভাবনার কথা বলতে পারি। যদিও এটি সময়ের বিষয়Ñ তবে আশা করা অমূলক নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভ্যাকসিন ও ওষুধের দিকে চেয়ে থাকার সময় যদি শেষ হয়, তবুও স্বল্পমাত্রার সংক্রমণ চলবে আগামী কয়েক বছর ধরে। তার মানে পাল্টে যাবে বিশ্ব! সব কিছুর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়Ñ পরিবর্তিত সেই বিশ্বের চিত্রটি কেমন হবে?
জাতি যে একটি বৈশ্বিক সময় পার করছে এতে কোনো দ্বিমত নেই, সন্দেহ করারও উপায় নেই। করোনা ভাইরাসের বিপর্যয়কর প্রভাব পড়েছে জনজীবনের সব ক্ষেত্রে। একদিকে জীবনের ঝুঁকি, অন্যদিকে জীবিকা। করোনাকালে এই দুইয়ের অদ্ভুত সমীকরণের মাঝে গোটা বিশ্ব। যতদিন যাচ্ছে বিশ্ব পরিস্থিতি খারাপ থেকে খারাপের দিকে যাচ্ছে। দেশে করোনা আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ায় বাড়ছে দুশ্চিন্তা। ফলে মানবজাতি আক্রান্ত হওয়া, অর্থনীতির চাকা স্থবির হওয়ার ফলে স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ পুরো বিশ্ব এখন বেকারত্ব আর দারিদ্র্যের শঙ্কায় বিপর্যস্ত। মানবজীবন, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি গোটা বিশ্ব ব্যবস্থার ভেতর ও বাইরের রূপকে স্বচ্ছভাবে আমাদের সামনে উপস্থাপন করেছে। সংকট ক্রমেই বাড়ছে, বেড়ে যাচ্ছে আতঙ্ক।
একটি দেশের চালিকাশক্তি হচ্ছে ‘অর্থনীতি’। একটি দেশের সব কিছুই অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। করোনার প্রভার সেই অর্থনীতির ওপরেই বেশি পড়েছে। এ সংকটকাল উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রের প্রধান ও জনগণ নানা উপায়ে চেষ্টা করে যাচ্ছেন কিন্তু এই সংকট থেকে উত্তরণ সহজ নয়, কোনো দেশেই সহজে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পারবে না। সমস্যা হলোÑ মানুষ আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে বা অনেকেই সুস্থ হচ্ছেন। হয়তো অনেকেই ভাবছেন করোনা চলে গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে! কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন! সংকট যে আরো বাড়বে তার চিত্র দেশের অর্থনীতি। অনেকটা সহজ মনে করলেও করোনা-পরবর্তী যে সময় আসবে, সেই সময়ে জটিলতা আরো বাড়বে। বর্তমান চিত্র আর করোনা-পরবর্তী চিত্র একেবারে ভিন্ন হবে। তবুও মানুষ আশা নিয়ে বেঁচে থাকবে, বেঁচে থাকার চেষ্টা করবে। প্রথম বাস্তবতা হচ্ছেÑ একদিন করোনাকাল কেটে যাবে, আলো আসবে। একদিন পত্রিকার প্রথম পাতায় শিরোনাম হবেÑ ‘গতকাল সারা বিশ্বে কোনো করোনা রোগী শনাক্ত হয়নি’। সে জন্য কতদিন অপেক্ষা করতে হবে কারো জানা নেই। তার আগে কত প্রাণ চলে যাবে সেটাও কারো জানা নেই। করোনা মহামারী যেদিনই শেষ হোক না কেন, আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রায় তার ছাপ রেখে যাবে। মানুষে-মানুষে সংস্পর্শ কমে যাবে এবং অন্যের সংস্পর্শে আসার ক্ষেত্রে মানুষের মনে যে ভয় সেঁটে গিয়েছে, তা কাটাতে দশ হতে বিশ বছর পর্যন্ত সময় লেগে যাবে। আর মানুষের এই আচরণের কারণে নতুন ধরনের সেবা, শিল্প, বিজ্ঞান থেকে শুরু করে অনেক কিছু গড়ে উঠবে। বিশ্ব হবে আগের চেয়ে কম খোলামেলা, কম সমৃদ্ধ এবং কম স্বাধীন। অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিকেও ভিন্ন রূপদান করবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের মতো যেকোনো সংক্রামক রোগ ও মহামারী-পরবর্তী বাস্তবতা ভিন্ন। সব মিলিয়ে হিসাব মেলানো কঠিন হয়ে দাঁড়াবে, জীবন-জীবিকার দৃশ্য হবে অপরিচিত।  
পরিবর্তনের বড় অংশজুড়ে থাকবে ‘অর্থনীতি’। মানুষের জীবনযাপনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে অর্থনীতি। বর্তমান পরিস্থিতি জানান দিচ্ছে যে, আকাক্সিক্ষত স্বপ্ন পূরণ করা থেকে আমরা যোজন যোজন দূরে অবস্থান করছি। কাজেই এতদিন ধরে যে বিশ্ব ব্যবস্থা আমাদের সামনে আবির্ভূত হয়েছে তা অনেক দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং নানা রকম অসঙ্গতিতে পরিপূর্ণ। দীর্ঘ লকডাউন শেষ হওয়ার পর করোনা ধাক্কায় অর্থনীতির পরিবর্তনের সঙ্গে বদলে যাবে জীবনযাত্রা। করোনা ভাইরাস মহামারী পরবর্তী বিশ্বে অর্থনীতির অবস্থা কী দাঁড়াবে, সেই প্রশ্ন ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। কিন্তু উত্তর কী হবে? মহামারী হয়তো নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে, কিন্তু এটা করতে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির যে মারাত্মক ক্ষতি হবে, তা কেটে উঠতে দীর্ঘ সময় লাগবে। গত কয়েক মাসে বিশ্বে অর্থনীতিতে যে কত ধস নেমেছে, তার তথ্য না দেখলে বিশ্বাস হবে নাÑ মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে যে ক্ষতি হয়েছে তা ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের চাইতেও ভয়াবহ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৯৩০-এর দশকে যে বিশ্ব মহামন্দার সূচনা হয়েছিল, এবারের অর্থনৈতিক সংকট সেটাকেও ছাড়িয়ে যাবে। তথ্যটি অমূলক নয়। বিশ্ব অর্থনীতিতে দেখা দেবে ভিন্নচিত্র। বিশ্বে আগে অনেক মহামারী এসেছে; কিন্তু করোনা ভাইরাস আসেনি, বিষয়টি আমাদের মনে রাখা জরুরি।
উল্লেখ্য, আগের দুটি সংকটে শেয়ারবাজারে দর পড়ে গিয়েছিল ৫০ শতাংশ, ক্রেডিট মার্কেট প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাপকহারে দেউলিয়া হতে শুরু করেছিল। বেকারত্ব দশ শতাংশ ছাড়িয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এই পুরো ব্যাপারটা ঘটেছিল তিন বছর সময় ধরে। মার্কিন শেয়ারবাজারে নজিরবিহীন ধস নামিয়েছে করোনা ভাইরাস মহামারী আর করোনা ভাইরাসের বিশ্ব মহামারী শুরু হওয়ার পর এবারের অর্থনৈতিক ধসটা ঘটেছে খুবই অল্প সময়ে। যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজার বিশ শতাংশ পড়তে সময় লেগেছে মাত্র ১৫ দিন। এত দ্রুত আর কখনো মার্কিন শেয়ারবাজার এতটা পড়েনি। বেকারত্বের হার ২০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্টিভ মানচিন। এর মানে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি পাঁচজনে একজন কাজ হারাবেন। সামনের দিনগুলোতে বিশ্ব অর্থনীতির কী দশা হবে, তার ভয়ঙ্কর সব পূর্বাভাস এরই মধ্যে আসতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ এরই মধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, ১৯৩০ এর দশকের বিশ্বমন্দার পর এ রকম খারাপ অবস্থায় আর বিশ্ব অর্থনীতি পড়েনি। অর্থনীতির নেতিবাচক প্রভাব যখন সব কিছুর উপরে পড়তে শুরু করবে, তখন সব কিছুর চিত্র পরিবর্তন দেখা যাবে। যদি মহামারী দীর্ঘায়িত হয়, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকার আর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো পরিস্থিতি সামলাতে গিয়ে অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়বে। আর ধনী দেশগুলোর অর্থনীতি ২০২২ সালের আগে পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে আনা যাবে না।
করোনা ভাইরাস মহামারী তাই নাগরিকত্বের একটি বড় পরীক্ষা। সামনের দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেকের উচিত হবে অপ্রতিষ্ঠিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও ধান্দাবাজ রাজনীতিকদের বদলে বৈজ্ঞানিক উপাত্ত ও স্বাস্থ্যসেবা বিশেষজ্ঞদের প্রতি ভরসা রাখা। আমাদের প্রয়োজন একটি বৈশ্বিক পরিকল্পনা আমরা যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হই তাহলে আমরা আমাদের সর্বাধিক মূল্যবান স্বাধীনতাকে হয়তো হারিয়ে ফেলব, আর ভাবব যে, এটাই আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার একমাত্র পথ।
ভাইরাসকে পরাজিত করতে হলে বিশ্বব্যাপী আমাদের তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে। এটিই ভাইরাসের তুলনায় মানুষের বড় সুবিধা। মানুষকে কিভাবে সংক্রমিত করবে সে ব্যাপারে চীনের করোনা ভাইরাস ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের করোনা ভাইরাস কৌশল অদল-বদল করতে পারে না। তবে করোনা ভাইরাসের ব্যাপারে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে অনেক মূল্যবান জিনিস ও কিভাবে একে মোকাবিলা করতে হয় সে ব্যাপারে শেখাতে পারে।
পূর্বের বৈশ্বিক সংকটগুলোতে যেমন ২০০৮ সালের আর্থিক সংকট ও ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারীÑ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব নেতার ভূমিকা নিয়েছিল। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন নেতার ভূমিকাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি খুব পরিষ্কারভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে, এটি মানবতার ভবিষ্যতের চেয়ে আমেরিকার মহত্ত্বকে অনেক বেশি গুরুত্ব দেয়। মানব জাতির একটি সিদ্ধান্তে আসা দরকার। আমরা কি অনৈক্যের পথে এগোব নাকি বৈশ্বিক সংহতির পথে হাঁটব? আমরা যদি অনৈক্যের পথে যাই তাহলে এটি শুধু সংকটকেই প্রলম্বিত করবে তা নয়, বরং ভবিষ্যতে ঘোরতর দুর্যোগে পর্যবসিত হবে। আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতির পথে যাই তাহলে শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে বিজয় হবে না, বরং ভবিষ্যতের মহামারী ও সংকটের বিরুদ্ধেও বিজয় হবে, যা একুশ শতকে মানবজাতিকে জর্জরিত করতে পারে।
করোনার থাবায় পৃথিবীর তিন ভাগের একভাগ মানুষ এখন পুরোপুরি লকডাউনে। করোনা ভাইরাসের কূল-কিনারা খুঁজতে গিয়ে পৃথিবীর বিখ্যাত সব বিজ্ঞানী, গবেষক, চিন্তক এক গভীর অন্ধকারে ডুবে গেছেন। কবে, কিভাবে থামবে করোনা সংক্রমণ? এখনো এর কোনো সদুত্তর নেই কারো কাছে। তবে করোনা-পরবর্তী বিশ্বের চিত্র কী হবে কেউ বলতে না পারলেও বাস্তবতা বলছে, বিশ্বের চিত্র ভিন্ন হবে। পরবর্তী সময় আমরা কিভাবে মোকাবিলা করতে পারি তার পথ বের করতে না পারলে সংকট দ্বিগুণ হওয়ার আশঙ্কা অমূলক নয়।
বৈশ্বিক জনমনে এখন প্রশ্ন উঠেছে যে, পৃথিবীটা যেভাবে চলছিল, সেভাবেই কী চলবেÑ না নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থার জন্ম  হবে। যে ব্যবস্থা হবে কোনো নির্দিষ্ট দেশ নয়, কোনো নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী নয়- সবার জন্য, সব মানুষের জন্য কল্যাণকর? এসব প্রশ্ন আসবেই কিন্তু সংকট কিভাবে মোকাবিলা করা যাবে, সেই পরিকল্পনা করা জরুরি। বিশ্বের সব দেশের নীতি নির্ধারকদের মনে রাখা প্রয়োজনÑ অর্থনীতি একটি দেশের চালিকাশক্তি, অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল সব কিছু। সুতরাং করোনা যাওয়ার ভরসায় থাকলে সংকট আরো বাড়বে। এসব না ভেবে এখন থেকেই প্রতিটি দেশের নীতি নির্ধারকদের উচিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করা।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট
adreechoyon86@gmail.com
০১৭২১-৫৬৫২১৮