পোশাকশিল্প ও রেমিট্যান্সে করোনার আঘাত

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৮:১৭ পিএম, ২৮ জুন ২০২০

রায়হান আহমেদ তপাদার: বৈশ্বিক মহামারি আকার ধারণ করা করোনা ভাইরাসের প্রভাব অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প ও রেমিট্যান্স খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এমনকি করোনা ভাইরাসের প্রভাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি, বিশেষ করে পোশাক শিল্প ও রেমিটেন্স খাত ক্ষতির মুখে পড়েছে। এরই মধ্যে দেশের বড় খাতগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। যেমন; পোশাক রফতানি তলানিতে নামায় মোট রফতানি আয়ে ধস নেমেছে, ২৬ মার্চ থেকে দুই মাসের লকডাউন অবস্থার কারণে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাে  পুরোপুরি স্থবিরতা নেমে আসে, এতে দেশজ উৎপাদন ও চাহিদা বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছে এবং রেমিটেন্স আয় কমতে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএম এফ) এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এর আগে বাংলাদেশের সার্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে আইএমএফ, তা ২১ মে সম্পন্ন হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারীর প্রেক্ষাপটে চলতি বছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ২ শতাংশে নেমে আসবে। যদিও করোনা সংকটের আগে সংস্থাটি ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিল। ২০২১ সালে তা বেড়ে সাড়ে ৬ শতাংশের কাছাকাছি হবে বলে মনে করে আইএমএফ। ২০২১ সালের পূর্বাভাসটি নির্ভর করছে করোনাভাইরাসের বিস্তার কমে যাওয়ার পাশাপাশি অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি ফিরে আসার ওপর। উন্নয়নশীল এবং অনুন্নত দেশগুলোর জন্য বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা। করোনার প্রাদুর্ভাবে বিশ্বের ছোট,  বড় এবং মাঝারি সব ধরনের শিল্পই ক্ষতিগ্রস্ত। তাই এসব মোকাবিলায় সতর্কতা জরুরি।
এমনিতেই পৃথিবীর সামনে এক বিশাল বেকারত্ব নামক সমস্যা অপেক্ষা করছে। বেকারত্বের কারণে সৃষ্ট সমস্যা সামাল দেওয়া তাৎক্ষণিকভাবে সম্ভব হবে না। কারণ বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া; যা বছরের পর বছর বিভিন্ন পরিকল্পনা করে সাজিয়ে নিতে হয়। বেকার সমস্যা হলে মানুষ ক্রয় ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। ফলে অভ্যন্ত রীণ অর্থনীতিতে চাহিদা জোগান কমে যায়। আর মানুষের আয় কমলে দৈনন্দিন ভোগ চাহিদা কমে যায়। ফলে সঞ্চয় তৈরির পরিমাণ কমে যায়। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে প্রবৃদ্ধি কমে যায়। আমাদের দেশে এখনো প্রায় ২ কোটি মানুষ এক দিনের আয় দিয়ে এক দিনের খাবার জুগিয়ে থাকে। এ শ্রেণির যদি দুই থেকে তিন মাস কোনো কাজ না থাকলে কর্মহীন হয়ে যায়। ফলে ইতোমধ্যে অনেকেই বেকার হয়ে গেছেন বা বেকার হওয়ার পথে। এই মহামারি দীর্ঘায়িত হতে পারে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের উপায় কী? একটা ‘ফিসকাল পলিসি’ দরকার। সরকারকে দায়িত্ব নিতে হবে এবং বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে খুব কম সুদে ঋণ দিতে হবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে বা ভর্তুকির হার বাড়াতে হতে পারে। আর শ্রমিকদের ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা, রেশনিং, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিল্প অঞ্চলভিত্তিক হাসপাতাল নির্মাণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঢেলে সাজাতে হবে। এখনই আমাদের সুপরিকল্পিত পদক্ষেপ নিতে হবে। করোনার প্রভাবে সারা বিশ্বেই বেকার বাড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হিসেবে বর্তমানে বিশ্বের ৩৩০ কোটি কর্মজীবী মানুষের মধ্যে ৮১ শতাংশই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিশেষ করে বিশ্বব্যাপী লকডাউনের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও কারখানা পুরোপুরি বা আংশিক বন্ধ থাকায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ হিসাবে বিশ্বের পাঁচজন কর্মজীবীর চারজনই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। করোনাভাইরাসের কারণে বাংলাদেশের সব অর্থনৈতিক কর্মকান্ড, মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) উল্লেখযোগ্য হারে কমে যাবে। শিল্পোৎপাদন, পণ্য বিক্রি ও জনগণের আয় কমে যাবে এবং কর্মী ছাঁটাই, বেকারত্ব ও দরিদ্র্যতা বৃদ্ধি পাবে। ১ জুন প্রকাশিত ব্র্যাকের এক যৌথ সমীক্ষা ও জরিপে জানা গেছে যে, চলমান মহামারি সংকটের কারণে বাংলাদেশের ৭৪ শতাংশ (মার্চ-মে মাসের মধ্যে গড়) পরিবারের উপার্জন কমে গেছে এবং ১০ কোটি ২২ লাখ মানুষ অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে পড়েছেন। এ ছাড়াও ১৪ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন বা আসছেন। সংস্থাটির সমীক্ষায় জানা গেছে, বাংলাদেশে অর্থনৈতিক ও স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিতে থাকা জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৫ কোটি ৩৬ লাখ মানুষ চরম দরিদ্র। যাদের মধ্যে নতুন করে চরম দরিদ্র হয়ে পড়া পরিবারগুলোও রয়েছে। উচ্চ অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে রয়েছে এমন চরম দরিদ্র ব্যক্তির সংখ্যা ৪ কোটি ৭৩ লাখ এবং উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন এমন ব্যক্তির সংখ্যা ৩ কোটি ৬৩ লাখ। সমীক্ষায় যেসব পরিবারের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, তাদের মধ্যে ৩৪.৮ শতাংশ পরিবারের কমপক্ষে একজন সদস্য চাকরি হারিয়েছেন।
সরকারের হিসাব মতে দেশে শ্রমবাজারে যারা এসেছেন তাদের প্রায় ৭৮ শতাংশ হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক খাতে। অর্থাৎ এদের কোনো নিয়োগপত্র নেই এবং কাজের কোনো স্থায়িত্বও নেই। কৃষি, দিনমজুর, পরিবহন শ্রমিকসহ নানা ধরনের পেশায় জড়িত। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে, দেশের ৫ কোটি ১৭ লাখ শ্রমশক্তি অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছে; যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ ভাগ। লকডাউনের ফলে এ শ্রেণিই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। কাজ না করলে কোনো উপার্জন থাকে না বলে জীবনযাত্রার মানও এদের উন্নত নয়। বিশেষজ্ঞগণের একাংশের মতে ২০২৩-২৪ সালের আগে অর্থনীতিতে স্বাভাবিক গতি আসা কঠিন হবে বলে মনে করেন। ছাঁটাই হওয়া কর্মীদের একটা অংশ কাজের সুযোগও পাবেন না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, বাংলাদেশে প্রতি বছর নতুন ১৮ লাখ মানুষ চাকরির বাজারে প্রবেশ করেন। তার মধ্যে গড়ে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ প্রতি বছর কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশে যান। গ্র্যাজুয়েটরা সরকারি-বেসরকারি চাকরির দিকেই বেশি মনোযোগী। যাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেই অথবা ডিগ্রিধারী নন, তাদের মধ্যে একটি বড় অংশ চাকরিপ্রত্যাশী। কিন্তু এ সুযোগ এখন হুমকির মুখে। এখানে নজর ও তদারকি বাড়াতেই হবে। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি কয়েক দিন আগে কিছু তথ্য তুলে ধরেন। সমিতির গবেষণায় দেখা যাচ্ছে যে, করোনাভাইরাসজনিত সাধারণ ছুটি বা বিক্ষিপ্ত লকডাউনের ৬৬ দিনে দেশে কাজ হারিয়েছেন ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। এ সময়ে ৫ কোটি ৯৫ লাখ মানুষের শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। আবার নতুন করে ২ কোটি ৫৫ লাখ মানুষ হতদরিদ্র হয়েছে।
তবে লকডাউনের আগে অতি ধনী যে ১ কোটি ৭০ লাখ ছিল তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়নি। তবে উচ্চ-মধ্যবিত্তে থাকা ৩ কোটি ৪০ লাখ থেকে ১ কোটি ১৯ লাখ মধ্য-মধ্যবিত্তে নেমে গেছে। মধ্য-মধ্যবিত্তে থাকা ৩ কোটি ৪০ লাখ থেকে ১ কোটি ২ লাখ নিম্ন মধ্যবিত্তে নেমেছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে বিভিন্ন সামাজিক-নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা বাড়াতে বা তৈরি করতে হবে। বাজেটে নতুন স্কোপ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণি-পেশার লোকের প্রতি বিশেষ নজর দিতে হবে। অতি সম্প্রতি বিজিএমইর সভাপতি রুবানা হক বলেন, জুন মাস থেকে পোশাকের অর্ডার নেমে শতকরা ৫৫ ভাগ থাকবে। ফলে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের আশঙ্কা করেছেন। কিন্তু অনেক কারখানা আগেই লে-অফ করা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কর্মী ছাঁটাই আগেই শুরু করা হয়েছে। গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের সাধারণ সম্পাদক জলি তালুকদার গণমাধ্যমে বলেন, ‘পোশাক কারখানায় তো শ্রমিক ছাঁটাই অব্যাহত আছে। লকডাউন শুরুর পর থেকে আমাদের হিসাবে ৭০ হাজার শ্রমিককে ছাঁটাই করা হয়েছে। করোনা প্রভাবে বেকারত্ব একটি বড় সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হবে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন বেসরকারি ও ব্যক্তিপ্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাই শুরু হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন প্রকল্প বাতিল বা কাটছাঁট করতে হবে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে যে বিরূপ প্রভাব পড়ছে, তাতে ৩৩০ কোটি কর্মক্ষম মানুষের আংশিক বা পুরোপুরি বেকার হওয়ার সম্ভাবনা। সংস্থাটি আরো বলছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন সংকট আর আসেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে চলতি অর্থবছর বাংলাদেশের রফতানি খাতে ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে। মূলত পোশাক খাতে ধসের কারণে সার্বিকভাবে এ রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক হবে। পোশাক খাত থেকে মোট রফতানি আয়ের ৮০ শতাংশ আসে। এপ্রিলে গতবছরের তুলনায় রফতানি আয় ৮৩ শতাংশ কমেছে। আর আমদানি খাতে ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ। তবে করোনা আঘাত না হানলে চলতি ও আগামী অর্থবছর আমদানি ও রফতানি খাতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকত বলে মনে করছে আইএমএফ। করোনার কারণে রেমিটেন্সেও বাংলাদেশের জন্য সুখবর নেই। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় করোনার ধাক্কা ও জ্বালানি তেলের দাম কমে যাওয়ায় প্রবাসী আয়ে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। রেমিটেন্সের বেশির ভাগ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আসে। আইএম- এফের হিসাবে চলতি অর্থবছর রেমিটেন্সে প্রবৃদ্ধি হবে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। করোনা না থাকলে যা ১৮ শতাংশে পৌঁছাত। আর আগামী অর্থবছর রেমিটেন্স প্রবৃদ্ধি ব্যাপকভাবে কমে যাবে। সে সময়৭ দশমিক ১ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি হবে এ খাতে। এছাড়া করোনার কারণে ব্যক্তি খাতে সঞ্চয়প্রবণতা কমে যাবে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়ও অনেক কমে যাবে। বেসরকারি খাতের পাশাপাশি সরকারি খাতেও বিনিয়োগ হ্রাস পাবে। ঋণ-জিডিপি অনুপাতে আগামী বছর বেড়ে ৪১ শতাংশ হবে, যা ২০১৯ সাল শেষে ৩৬ শতাংশ ছিল। যা এখন হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। সুতরাং দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিকে সচল রাখতে এসব খাতে বাড়তি মনোযোগ অত্যাবশ্যক।
লেখক ঃ গবেষক ও কলামিস্ট
raihan567@yahoo.com