ঈদুল আজহার মাহাত্ম্য ও কোরবানির দর্শন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:২৮ পিএম, ১৬ জুলাই ২০২১

মোহাম্মদ মোস্তাকিম হোসাইন:জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হবে ঈদুল আজহা তথা পবিত্র কোরবানির ঈদ। কোরবানি ইসলামের অভিনব কোনো বিধান নয়। কোরবানি করার বিষয়টি মানব ইতিহাসের মতই প্রাচীন। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের মহা অভিপ্রায় “আশরাফুল মাখলুকাত” বা সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে মানবকুলের সৃষ্টি। সেই মানুষকে তিনি তাঁর প্রতিনিধিত্ব দান করতে গিয়ে তাদের চরম পরীক্ষায় অবতীর্ণ করেছেন। মানব জাতির আদি পিতা হলেন হযরত আদম (আ.)। কুরআনুল কারিমে মুসলমানদের বলা হয়েছে “মিল্লাতে ইব্রাহিম” অর্থাৎ ইব্রাহিমের জাতি এবং হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে বলা হয়েছে এ জাতির পিতা। মুসলিম জাতির পরিবারের বৈশিষ্ট্য এবং স্বরূপ কেমন হবে তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন এ জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.)। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, হযরত আদম (আ.) থেকে হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবী-রাসুল ও তাঁদের অনুসারীরা কোরবানি করেছেন। তবে একেক উম্মতের কোরবানির পদ্ধতি ছিল একেক রকম। কোরবানি ইসলাম ধর্মের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর শরীয়তের পূর্বেও প্রচলিত ছিল। পবিত্র কুরআন ইরশাদ হয়েছে, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কোরবানির নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণস্বরূপ যেসব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলোর ওপর (জবেহ করার সময়) আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। (সুরা আল হজ্জ, আয়াত-৩৪)। 
ইসলামের ইতিহাসে হযরত আদম (আ.) এর দুই পুত্র হাবিল-কাবিলের মাধ্যমে সর্বপ্রথম কোরবানির সূত্রপাত হয়। এরপর হযরত নূহ (আ.), হযরত ইয়াকুব (আ.) ও হযরত মুসা (আ.) এর সময়ও কোরবানির প্রচলন ছিল। মহান আল্লাহর চরম পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের মধ্যে যাকে তিনি তাঁর অতি সন্নিকটে স্থান দান করেছেন, তাদের অন্যতম প্রিয় বন্ধু নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.)। তিনি তাঁর স্ত্রী হাজেরাকে কেবল আল্লাহ তাআলার নির্দেশ পালনের জন্যই নির্বাসন দিয়েছিলেন। এ নির্বাসন মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে মনে হবে নিষ্ঠুর ও অমানবিক। কিন্তু কেন করেছেন? স্ত্রী হাজেরা যখন শুনলেন যে, আল্লাহর ইচ্ছায় তিনি নির্বাসন হয়েছেন তখন তিনি কোন প্রতিবাদ করেননি। কারণ যে আল্লাহর নির্দেশে ইব্রাহিম (আ.) নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধেও গভীর বেদনা নিয়ে শিশুপুত্র সহ পতœীকে নির্বাসন নিচ্ছেন সে আল্লাহকে বিবি হাজেরাও গভীরভাবে বিশ্বাস করেন। তাই তিনি প্রশান্ত চিত্তে জনমানবহীন সাফওয়া এবং মারওয়া পর্বতদ্বয়ের মধ্যবর্তী মরুভূমির বালুকা রাশিযুক্ত স্থানে নির্বাসন মেনে নিলেন। বিবি হাজেরার নিজের সুখ শান্তি ও নিরাপত্তার চিন্তার চেয়ে স্বামীর ব্যথিত চিত্তকে শান্তি ও প্রশান্তি দেয়ার আগ্রহই ছিল সবচেয়ে বেশী। তবে দৃঢ় বিশ্বাস ছিল যে, আল্লাহর ইচ্ছাতে যখন তিনি নির্বাসিত তখন সেই আল্লাহ তায়ালাই তাকে রক্ষা সহ যাবতীয় প্রয়োজন মিটাবেন। 
বাস্তবে তাই ঘটল। পানির পিপাসায় যখন শিশু ইসমাইল (আ.) কাতর, বিবি হাজেরা সাফওয়া ও মারওয়া পর্বতদ্বয়ে পানির জন্য ছোটাছুটি করছেন ঠিক তখনই নিষ্পাপ শিশু ইসমাঈল (আ.) এর নরম তুলতুলে পায়ের আঘাতে সৃষ্টি হলো বিশুদ্ধ পানির নহর যাকে বলা হয় জমজম। ক্লান্ত হাজেরার মুখে প্রশান্তি ফিরে আসল। মা-সন্তান তৃপ্তি সহকারে পানির প্রয়োজন মিটালেন। যা আজও বিশ্ব মুসলিমকে তৃপ্ত করছে। হাজি সাহেবরা প্রতিবছর জমজমের পানি নিয়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে পেঁৗঁছে যাচ্ছেন। কিন্তু সেই জমজমের নহরের পানি বিন্দুমাত্র কমছেনা। যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে। 
নমরূদ অগ্নিকুন্ডে ফেলেছিলেন ইব্রাহিম (আ.) কে কিন্তু আল্লাহর হুকুমে আগুন ইব্রাহিমের একটি পশমও পুড়াতে পারেনি।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তার প্রিয়তম ও পরীক্ষিত বন্ধু হযরত ইব্রাহিম (আ.) কে স্বপ্নযোগে তাঁর প্রাণপ্রিয় বস্তু, তাঁর মহান বন্ধু সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর নামে উৎসর্গ করতে আদেশ দান করলেন। তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.) কে আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত অবস্থায় দেখতে চান। হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) কে মহান আল্লাহর নামে কোরবানি করতে প্রস্তুতি নিলেন। উত্তেজনার বশে নয়, ঠান্ডা মাথায় ছিল এ কোরবানির ইচ্ছা। এটা ছিলো মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম কোরবানি। হযরত ইব্রাহিম (আ.) দু’হাতে ছুরি চালিয়ে শিশু পুত্র হযরত ইসমাঈল (আ.) কে কোরবানি করলেন। হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর কোরবানি জন্য তাঁর বংশ দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতম মর্যাদাসম্পন্ন বংশে পরিণত হয়েছিল। যে বংশে আবির্ভূত হয়েছিলেন দুনিয়ার সবচেয়ে বেশী সংখ্যক নবী। কোরবানি করার পর তিনি চোখের বাঁধন খুলে বিস্ময়ের সাথে দেখলেন, তাঁর প্রাণপ্রিয় পুত্র সন্তান হযরত ইসমাঈল (আ.) তার পার্শ্বে সম্পূর্ণ অক্ষত দেহে দাঁড়িয়ে রয়েছেন এবং তার স্থানে একটি দুম্বা কোরবানি হয়ে গিয়েছে। যেমন পিতা তেমন পুত্র। এই ঘটনাটি মহান আল্লাহ পাক সুরা সাফফাত এর মধ্যে আলোচনা করেছেন। জ্ঞানী পাঠকদেরকে বিস্তারিত জানার জন্য তাফসীরগ্রন্থ সমূহ অধ্যয়নের অনুরোধ করছি। প্রিয় পাঠক-পাঠিকা বন্ধু, হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর পরিবার সারা মুসলিম উম্মাহর জন্য আদর্শ পরিবার। এ পরিবারের সদস্যদের মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ হওয়ার জন্যই কোরবানির ঈদ। 
জিলহজ্ব মাসের ১০ তারিখে অনুষ্ঠিত হয় ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ। এই ঈদ মুসলিম মিল্লাতের পিতা হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর কোরবানির আদর্শ স্মরণে পালন করা হয়। সে জন্য এই ঈদে শুধু আনন্দই করা হয়না বরং পশু কোরবানির মাধ্যমে হযরত ইবরাহীম (আ.) ও হযরত ইসমাঈল (আ.) এর এক সুমহান স্মৃতির অনুসরণও করা হয়। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে হযরত যায়েদ ইবনে আরকাম (আ.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন আমি জিজ্ঞাসা করলাম, হে আল্লাহর রাসুল, এই কোরবানি কি? নবী করীম (সা.) বলেন, তোমাদের পিতা হযরত ইব্রাহীমের মান্নত। আমি বললাম, উহা করলে আমরা কি পাব? তিনি বলেন, প্রত্যেকটি চুলের বিনিময়ে একটি করে নেকি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম হে আল্লাহর রাসুল পশমের ব্যাপক কি হবে? তিনি বললেন, পশমের প্রত্যেকটি চুলের বদলে একটি করে নেকি পাওয়া যাবে। (আবু- দাউদ, ইবনে মাজাহ, হাকেম) 
কোরবানির দিন আল্লাহর সন্তোষ বিধান মূলক ও আল্লাহর নিকট সর্বাধিক প্রিয় পছন্দনীয় কাজ হলো কোরবানি করা। এ সম্পর্কে হাদীস শরীফে এসেছে হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোরবানির দিন রক্ত ঝরানোর তুলনায় আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয় ও পছন্দনীয় অন্য কোন কাজই করতে পারেনা। জবাই করা জন্তু কিয়ামতের দিন উহার শিং, পশম ও খুর নিয়ে উপস্থিত হবে। কোরবানির রক্ত মাটিতে পড়ার পূর্বেই আল্লাহর নিকট উহা সন্তুষ্টির মর্যাদার পৌছে যায়। অতএব তোমরা উহাতে মনের সুখ ও সন্তোষ নিবদ্ধ কর। (তিরমিজী, ইবনে মাজাহ) ঈদের দিন আনন্দ প্রকাশের জন্য খুবই জোর দেয়া হয়েছে। 
শুধুমাত্র নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে ঈদের উৎসব ও আনন্দ সকলের নিকট পৌছে দেয়া ইসলামের মহান আদর্শ। এজন্য কুরবানির গোস্ত তিনভাগ করে, এক ভাগ গরীব মিসকিন, এক ভাগ আত্মীয় স্বজন এবং একভাগ নিজের ও পরিবারের জন্য রাখার বিধান রয়েছে। যেন ধনীর অট্টালিকা ও গরীবের ক্ষুদ্র কুঠিরে ঈদের আনন্দ একইভাবে প্রবাহিত হয়। 
ঈদুল আজহার দিনে কোরবানি করে শুধু গোস্ত খাওয়া বা বিতরণ করা উদ্দেশ্য নয়, উদ্দেশ্য হল তাকওয়া, আল্লাহভীতি ও আল্লাহ প্রেমের নিদর্শন স্থাপন করা। জাহেলী যুগে লোকেরা পশু কোরবানি করত। তারপর এ পশুর রক্ত ও গোস্ত প্রতিমার গায়ে লাগিয়ে দিত। তারা মনে করতো এ পদ্ধতিতে কোরবানি আল্লাহর নিকট পৌছে থাকে। আসলে কিন্তু তা নয়। পশু কোরবানি দ্বারা বস্তুত: আল্লাহ পাক চান তাঁর বান্দাদের খালেস আন্তরিকতা। চান তাদের খাঁটি মানসিক উৎসর্গিতা। তাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন, আল্লাহর কাছে পশুগুলির গোস্ত কিংবা রক্ত পৌঁছায় না বরং পৌছায় তোমাদের মনের তাকওয়া (২২ ঃ ৩৭)। 
এক হাদীসে মহানবী (সা.) বলেন, আল্লাহ তোমাদের চেহারার প্রতি তাকান না, আর তোমাদের সম্পদ ঐশ্বর্য্যরে প্রতিও দৃষ্টি দেননা। তিনি দেখেন তোমাদের মন ও আন্তরিকতা। কোরবানি হতে হবে একমাত্র আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও খুশি করার উদ্দেশ্যে। পবিত্র কোরআনে নবী করিম (সা.) কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন বল “আমার নামায, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগত সমূহের প্রতিপালক আল্লাহ জন্য। (সূরা আল আনআম, আয়াত-১৬২) 
কোরবানি করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করে না সে মহাপাপী ও গুনাহগার হবে। পরিশেষে বলা যায়, কোরবানি প্রত্যেক মুসলমানের ত্যাগ তিতিক্ষা প্রদর্শনের মাধ্যম। মহান আল্লাহ অধিক নৈকট্য ও সান্নিধ্য অর্জনের অনন্য সোপান। তাই জিলহজ্ব মাসের কোরবানি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় মুসলিম পরিবারের মূল্যবোধ কেমন হওয়া উচিত। যে পরিবারে পিতা, পুত্র, মাতা, কন্যা, স্বামী স্ত্রীর মূল্যবোধের মধ্যে মিল ও সমন্বয় নেই সে পরিবার ইসলামী আদর্শচ্যুত পরিবার। পরিবারকে হতে হবে হবে কোরআন ও সুন্নাহ ভিত্তিক। যার প্রতিফলন হয়েছে হযরত ইব্রাহীম (আ.) এর আদর্শেরই তাত্ত্বিক ও বাস্তবরূপ। মনে রাখতে হবে পশু কোরবানি শুধু ভোজের জন্য নয়। বরং এই পশু কোরবানির সাথে সাথে কোরবানি করতে হবে, যাবতীয় লোভ-লালসা, হিংসা, বিদ্বেষ, দুর্নীতিসহ মনের মাঝে লুকায়িত যাবতীয় পশুত্বকে। যা হবে আত্মবিশ্লেষণ ও আত্মশুদ্ধির উৎসব। মহান আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমিন।
লেখক ঃ ইসলামী গবেষক ও প্রাবন্ধিক  
[email protected] 
০১৭১২-৭৭৭০৫৮