লকডাউনে জীবন জীবিকার সংকট

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৫৫ পিএম, ০৩ জুলাই ২০২১

মোহাম্মদ নজাবত আলী: লকডাউন শব্দটির সাথে আমাদের তেমন একটা পরিচিতি ছিলনা। মহামারি করোনাকালে এ শব্দটির সাথে মানুষের পরিচিত হয়। এখন মানুষের মুখে মুখে এ শব্দটি উচ্চারিত হচ্ছে। এমনকি ছোট ছোট শিশুরাও এ শব্দটি কথায় কথায় উচ্চারণ করে। সত্যি কথা বলতে কি আমার চার বছরের নাতনি খেলার সামগ্রী মেঝেতে বিছিয়ে বলে, এখন লকডাউন কেউ বের হতে পারবেনা। এখন লকডাউনের সাথে যুক্ত হয়েছে শাটডাউন। লকডাউন বা শাটডাউন যেটাই বলা হোক না কেন ঘর থেকে বের না হওয়ার অর্থেই এ শব্দযুগল ব্যবহৃত হচ্ছে।
আমরা আমাদের দাদা-দাদী বা বয়স্ক লোকজনের মুখ থেকে ছোট বেলায় শুনেছি কলেরা বসন্তের কথা। এক সময় নাকি কলেরা বসন্ত মহামারির রূপ নিয়েছিল। অনেক মানুষ এতে মারা যায়। তখন কলেরা বা বসন্তের বুড়ি বলে মানুষের মনে একটা বদ্ধমূল ধারণা বা বিশ্বাস ছিল। তখন অবশ্য শিক্ষা না থাকার কারণেই এক ধরনের কুসংস্কারে মানুষ বিশ্বাস করত। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা-প্রযুক্তি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেনি। মানুষ তখন  শিক্ষার অভাবে কুসংস্কারে আবদ্ধ ছিল। এখন বিশ্ব উন্নত হয়েছে। শিক্ষা, জ্ঞান, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব এগিয়ে যাচ্ছে। সে কলেরা বা বসন্তের যুগ আর নেই। এখন নতুন নতুন ব্যাধি সংক্রমণ শুরু হয়েছে যেমন করোনা মহামারি। দেশে করোনা পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। সংক্রমণ ও মৃত্যু যেন কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। এ যেন অপ্রতিরোধ্য পাগলা ঘোড়া লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছেনা। করোনা যখন প্রথম আমাদের দেশে আঘাত হানে তখন আমাদের তেমন কোনো অভিজ্ঞতা না থাকলেও এমন পরিস্থিতি হয়নি। দেশে এমন কোনো অঞ্চল নেই যেখানে করোনার ঝুঁকি নেই। কম আর বেশি এইটুকুই পার্থক্য। বাংলাদেশে অঞ্চল ভেদে যেভাবে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে তাতে দ্রুত কঠিন পদক্ষেপ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, সামাজিক দূরত্ব নিশ্চিত করা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলে প্রত্যেককেই সুরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে পরিস্থিতি সামাল দেয়া কঠিন  হয়ে পড়বে। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যুর হিসেবটা অনেকটা নির্ভর করে পরীক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর। আমাদের স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দূর্নীতি ইত্যাকার নানা কারণে স্বাস্থ্য খাত প্রায় ভেঙে পড়ার উপক্রম। এক বছর তিন মাস হলো আমাদের করোনার সাথে বসবাস। এ ১৫ মাসে স্বাস্থ্য সেবা সন্তোষজনক নয়। হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন নেই। করোনার এ ভয়াবহ অবস্থায় দেশে জেলা হাসপাতালে অক্সিজেন সরবরাহ থাকা জরুরি কিন্তু বাস্তবে তা নেই। কেন নেই, এর উত্তর আমাদের অজানা। ১৫ মাসে করোনায় আমাদের অভিজ্ঞতা থাকার পরও কেন সে আগের অবস্থানে পড়ে থাকব বিষয়টি দুঃখজনক। সরকার টিকার ব্যবস্থা গ্রহণ করার জন্য আমরা সরকারকে ধন্যবাদ জানাই। কিন্তু এ টিকার বাইরেও করোনা রোগীর চিকিৎসার জন্য যা যা প্রয়োজন তা কি পর্যাপ্ত রয়েছে ? 
করোনা একটি নতুন মহামারি। তাই করোনার মত একটি মরণব্যাধি থেকে রক্ষা পেতে হলে আমাদের করণীয় কি ? বিষেশজ্ঞরা যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা আমাদের মেনে চলতে হবে। তাদের পরামর্শ উপেক্ষা করা কোনোভাবেই উচিত নয়। প্রথমতঃ এ সংক্রমন রোধ করা। তার মানে সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বাজায় রাখা অর্থাৎ ঘর থেকে বের না হওয়া। শারীরিক দূরত্ব নিশ্চিত করতে সরকারকে বার বার লকডাউনে যেতে হচ্ছে। কিন্তু কিছুদিন আগে আমরা দেখেছি একদিকে লকডাউন অন্যদিকে সবকিছু খোলা। যত্রতত্র মানুষ অবাধে চলাফেরা করছে। দোকানপাট বন্ধ আবার খোলা। অর্থাৎ লকডাউন বলতে যা কিছু বুঝায় তা আমরা ভুলে গেছি। ঢিলেঢালা, আংশিক লকড্উান, কঠোর লকডাউন, আবার সর্বাত্মক লকডাউন নামে লকডাউন পুরো শব্দটিকে বিভাজন করা হয়েছে। লকডাউন কার্যকর হয়নি। যার কারণে দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে বলে বিষেশজ্ঞরা মনে করছেন। কিন্তু লকডাউন কেন কার্যকর হয়নি  বা হচ্ছেনা এর কারণ চিহ্নিত না করে যতই কঠোরতা অবলম্বন করা হোকনা কেন এর সুফল পাওয়া কঠিন। 
আমি করোনা নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা করতোয়াসহ কয়েকটি পত্রিকায় লিখি। বিষেশজ্ঞদের পরামর্শ ও নির্দেশনাগুলো বিস্তারিতভাবে বলার চেষ্টা করেছি। বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র লকডাউন বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, মুখে মাস্ক পরিধানকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছে। লকডাউন মানেই ঘর থেকে বের না হওয়া। আমাদের দেশে কয়েকবার অঞ্চলভেদে লকডাউন দেয়া হলেও তা কার্যকর হয়নি আশানুরূপ। করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু ক্রমাগতভাবে বেড়ে যাওয়ায় এবার বিষেশজ্ঞদের  পরামর্শে সরকার সারাদেশে এক সপ্তাহের কঠোরতম লকডাউন বা শাটডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আগের লকডাউন কার্যকর না হওয়ার পিছনে কতকগুলো কারণ আছে। ঘরে থাকলে জীবিকার সংকট। বাংলাদেশ অগ্রগতি ও উন্নয়নের দিকে ধাবিত হলেও এখনো দারিদ্র জনগোষ্ঠী, নি¤œ আয়ের মানুষ রয়েছে। নবাব শায়েস্তা খানের আমলে টাকায় ৮ মণ চাল পাওয়ার ইতিহাস আমরা জানি, পাশাপাশি দারিদ্র জনগোষ্ঠীর কথাও জানা যায়। যা হোক জীবিকার তাগিদে ঘরের বাইরে গেলে আক্রান্ত হওয়ার ভয়, আবার ঘরে থাকলে খাদ্য সংকট। বাংলাদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর একটা অংশ এখনো ছোট খাট ব্যবসা বাণিজ্য করে জীবন জীবিকা নির্বাহ করছে। আবার কেউ কেউ মজুরি দিয়ে পরিবার পরিজনের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেয়ার প্রাণান্তকর চ্ষ্টো করছে। সমাজের এ শ্রেণির মানুষের অবস্থা কী হবে ? ছোট মাঝারি ব্যবসায়ী, ব্যাংক, বীমা, এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে তারা কিস্তি পরিশোধ করবে কিভাবে ? কেননা এ লকডাউনেও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কিস্তির টাকার জন্য চাপ প্রয়োগ করবে। লকডাউনে সবকিছু বন্ধ থাকলে কিস্তির টাকা কিভাবে পরিশোধ করবে ? লকডাউন চলাকালীন সময়ে কিস্তির টাকা আদায় বন্ধে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। আবার গরীব অসহায় মানুষের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করতে না পারলে এবারের লকডাউনও কতটা কার্যকর হবে তা প্রশ্ন সাপেক্ষ। গণমাধ্যমে এসেছে এবারে লকডাউনে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকরাী বাহিনীর পাশাপাশি বিজিবি ও সেনাবাহিনীও মাঠে থাকবে। সব ঠিক আছে কোনো সমস্যা নেই। ক্ষুদ্র, মাঝারি ব্যবসায়ী, দরিদ্র, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন জীবিকার কথা সরকারকে বিবেচনায় নেয়া দরকার। 
প্রাণঘাতি করোনার ছোঁবল থেকে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে সরকার, ডাক্তাররা হিমসিম খাচ্ছে। বিশ্বের বড় বড় শহরে লকডাউন ঘোষণা করে মানুষকে ঘরবন্দি করে রেখেছে। তারা আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান বাংলাদেশও লকডাউন চলছে। লকডাউন মানেই ঘরবন্দি হয়ে থাকা। বাইরে না যাওয়া। এ বন্দি হয়ে থাকা মানেই নিজে ও পরিবারকে করোনার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঘরবন্দি হয়ে থাকতে পারলে এ ভাইরাসের হাত থেকে অনেকাংশে রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা এখনো সচেতন হতে পারিনি। আগে দেখা গেছে নানা অজুহাতে লকডাউন উপেক্ষা করে মানুষজন রাস্তায় নামে। সবার আগে বাক্তিগত সচেতনতা। আমাদের অবশ্যই সচেতন হওয়া দরকার। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের না হওয়া। যদি বের হতেই হয় তাহলে অবশ্যই সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এর ব্যত্যয় হলে আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। জনগণ যদি সচেতন না হয়, ঘরবন্দি হয়ে না থাকে তাহলে সরকারের নানা ধরনের উদ্যোগ ও প্রচেষ্টা ব্যাহত হবে। মানুষকে সচেতন করার ক্ষেত্রে আইন প্রশাসন কঠোরতার চেয়ে জনগণের বোধগম্যতা ও সচেতনতা বেশি জরুরি। 
সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাবে আগের লকডাউন কার্যকর হয়নি। জনগণের মাঝে সচেতনতা বাড়ছেনা। এখন প্রশ্ন আসতে পারে কীভাবে জনগণকে সচেতন করা যায়, কারা কারা এর সাথে সম্পৃক্ত হতে পারে। স্ব স্ব এলাকার সরকার দলীয় নেতা, স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধিদের একাজে সম্পৃক্ত করা যায়। কিন্তু আমরা তা কি করছি ? বিষেশজ্ঞরা সব সময় বলে আসছেন শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। মুখে মাস্ক পরিধান করুন। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষই তা শুনছেনা, পরামর্শ মানছেনা। আমাদের করোনা নিয়ে এক ধরনের অবহেলা, তাচ্ছিল্য করা, গোয়ার্তুমী, উদাসীনতা রয়েছে। মানুষজন অযথা বাইরে ঘোরাফেরা করছে। লকডাউনে গরীব অসহায় মানুষদের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করে, স্বাস্থ্যবিধি, সামাজিক বা শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখা, অকারণে বাইরে চলাফেরার ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে। মনে রাখতে হবে আমাদের উদাসীনতা, গুরুত্বহীনতার কারণে করোনা ভাইরাস যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেদিকটার প্রতি শুধু প্রশাসন নয় সবাইকে অধিকতর সতর্ক ও সচেতন হওয়া দরকার। আমরা যদি সচেতন হই, বিষেশজ্ঞদের পরামর্শ শারীরিক বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলি তাহলে আমরা সুস্থ থাকব ভাল থাকব। আসুন আমরা নিজের সুরক্ষা নিজেই করি। লকডাউন বা শাটডাউনে জনগণের ভোগান্তি বাড়বে এটা মনে করেই আমাদের প্রত্যেককে সচেতন হওয়া দরকার। কেননা সাধারণ মানুষের অসচেতনতা, আমাদের ভয়াবহ পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। করোনা বর্তমান যে রূপ ধারণ করছে এর জন্য সাধারণ মানুষের অসচেতনতা কম দায়ী নয়। 
দেশের করোনা পরিস্থিতি দিন দিন অত্যন্ত খারাপের দিকে যাচ্ছে। প্রতিদিন শনাক্ত ও মৃত্যু বাড়ছে। ইতিমধ্যে দেশে করোনায় ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়েছে। পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে বিপজ্জনক অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এ অবস্থায় দেশে কঠোর লকডাউনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এর আগে অঞ্চলভেদে লকডাউন দিয়ে তার তেমন কোনো সুফল মিলেনি। তাই সরকার মানুষের জীবন রক্ষায় এবারে হার্ড লাইনে যাচ্ছে। সারাদেশে সর্বাত্মক লকডাউন করোনা সংক্রমনের উর্ধ্বগতি রোধকল্পে বৃহস্পতিবার থেকে তা কার্যকর হয়েছে। এ সময় দেশের জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব সরকারি বেসরকারি অফিস, গণপরিবহন, (পণ্য পরিবহন ছাড়া) শপিংমলসহ সবকিছু বন্ধ থাকবে। এককথায় মানুষজন যেন অযথা বাইরে আসতে না পারে তার জন্য সরকার প্রশাসনিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। মানুষের জীবন রক্ষায় সরকারের সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, হত দরিদ্র মানুষগুলোকে আর্থিক সহায়তা প্রদান ও খাদ্যাভাব দূরীকরণ করাও কম জরুরি নয়। আশাকরি সরকার এবিষয়গুলো অবশ্যই আমলে নিবেন। 
লকডাউন বা শাটডাউনের পাশাপাশি আমরা মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট প্রার্থনা করি, তিনি যেন সমগ্র মানবজাতিকে রক্ষা করেন। কেননা আমরা এ করোনাকালে বড় অসহায়। সরকারের বিভিন্ন গৃহীত পদক্ষেপেও এ ঘাতক ব্যাধি প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বিশ্বের অনেক উন্নত রাষ্ট্র সামাল দিতে হিমসিম খাচ্ছে। তাই, সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপের পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তা যেন আমাদের রক্ষা করেন। 
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৭১৯-৫৩৬২৩১