মানব পাচার আইন ও আজকের বাংলাদেশ

RezaDhaka RezaDhaka
প্রকাশিত: ০৮:৪০ পিএম, ২৬ অক্টোবর ২০২১

এড. মোঃ মোজাম্মেল হক: আইন মনে করে প্রত্যেক ব্যক্তি আইন জানে। আমি আইন জানি না, ফলে আমি এই অপরাধটি করেছি সুতরাং  আমাকে ক্ষমা করে দেওয়া হোক, এই বলে আইনের হাত থেকে কেউ রক্ষা পাবে না। তাই মানব পাচার আইন কি সে সম্পর্কে একটু আলোচনা করা দরকার। আইনের ভাষায় মানব পাচার অর্থ কোন ব্যক্তিকে ভয়ভীতি প্রদর্শন বা বল প্রয়োগ করিয়া বা প্রতারণা করিয়া বা উক্ত ব্যক্তির আর্থ-সামাজিক বা পরিবেশগত বা অন্য কোন অসহায়ত্বকে কাজে লাগাইয়া বা অর্থ বা অন্য কোন সুবিধা লেনদেন পূর্বক উক্ত ব্যক্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ রহিয়াছে এমন ব্যক্তির সম্মতি গ্রহণ করিয়া; বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বা বাইরে যৌন শোষণ বা নিপীড়ন বা শ্রম শোষণ বা অন্য কোন শোষণ বা নিপীড়নের উদ্দেশ্য বিক্রয় বা ক্রয়, সংগ্রহ বা গ্রহণ, নির্বাসন বা স্থানান্তর, চালান বা আটক করা বা লুকাইয়া রাখা বা আশ্রয় দেওয়াকে বুঝায়।  সহজভাবে বলতে গেলে মানব পাচারের অর্থ এক কথায় বলা যায় কোন ব্যক্তিকে বা ব্যক্তিগণকে প্রতারণা করিয়া দেশের বাইরে বা দেশের ভিতরে  কোথাও লইয়া গিয়া কাঙ্খিত মত কাজ না দিয়া তাহার বা তাহাদের আটক রাখিয়া তাহার বা তাহাদের দিয়া অনৈতিক কাজ করিয়া তাহার বা তাহাদের জীবন বিপন্ন করানোকে বুঝায়। 
ইদানিং পত্রিকায় দেখা যায় যে, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাগরপথে যাওয়ার সময় ভূমধ্যসাগরে বিকল ট্রলার কিংবা নৌকা হতে কিছু মরণাপন্ন ও অসুস্থ নাগরিক উদ্ধার করা হয়েছে এবং উদ্ধারকৃত নাগরিকদের বক্তব্য অনুযায়ী অবৈধভাবে ইউরোপ যাওয়ার পথে ট্রলার কিংবা নৌকা বিকল হাওয়ার কারণে দীর্ঘদিন সাগরে ভাসমান থাকা অবস্থায় আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার জাহাজ বা নৌবাহিনী কর্তৃক উদ্ধার হওয়া এবং উদ্ধার হওয়া নাগরিকদের মুখে, ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় মারা যাওয়া কিছু নাগরিকের খবরও জানা যায়। কি বিভৎস সেই কাহিনী, ক্ষুধায় ট্রলারে মারা যাওয়ার পূর্বেই তাদেরকে নির্মমভাবে সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। আর সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র বাংলাদেশী নাগরিকই নহে এই উপমহাদেশের আরও কতিপয় দেশের নাগরিকও উদ্ধার হয়। মূলতঃ সোনার হরিণ ধরার আশায় অবৈধভাবে গমন ইচ্ছুক এই সকল ব্যক্তিগণ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কাজের সন্ধানের আশায় কিছু অবৈধ দুষ্ট মানব পাচারকারীর চটকদারী বক্তব্যে রাজী হইয়া কিছু বেকার যুবক নিজেদের ভিটা মাটি বিক্রি করে পরিবারকে নিঃস্ব অবস্থায় ফেলে মানব পাচারকারীদের সঙ্গে ভাগ্য উন্নয়নের আশায় অজানা ভবিষ্যতের উদ্দেশ্যে গা ভাসাইয়া দেয়। তারা কোন ভূত ভবিষ্যৎ চিন্তা ভাবনা না করেই এবং বৈধ না অবৈধ এজেন্ট ও বৈধ না অবৈধ পথে বিদেশ যাচ্ছে এরূপ কোন চিন্তা না করেই এবং পথঘাটের কোন প্রকার খোঁজ খবর না নিয়েই তারা সাত সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার উদ্দেশ্য বাড়ি থেকে বের হয়। ট্রেনের পকেটমারদের যেমন রুট ভাগ করা থাকে তেমনি এই সকল মানব পাচারকারী সংঘবদ্ধ দলেরও দেশ বা রুট ভাগ করা থাকে। তারা এই সকল বিদেশ গমনেচ্ছুক আদম সন্তানদের পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন দেশের পাচারকারীদের দায়িত্ব প্রদান করে থাকে। পাচারকারীদের শুধু এদেশেই নহে বিভিন্ন দেশে তাদের আছে সংঘবদ্ধ এজেন্ট, যাদের মাধ্যমে এই সকল বেআইনী কাজ প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছে, ফলে প্রতিনিয়ত প্রাণহানির মত দুর্ঘটনা ঘটছে। আর তার কারণে বহু পরিবার আপনজন হারিয়ে একেবারে নিঃস্ব ও দিশেহারা হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় মাল্টার জেলে বন্দি ১৬৫ বাংলাদেশীর ভাগ্য অনিশ্চিত। উন্নত জীবনমান এবং বেশি আয়ের স্বপ্নে বিভোর হয়ে মানব পাচারকারীদের হাত ধরে শুরু করে তাদের মরণযাত্রা। পরে ভূ মধ্যসাগর থেকে তাদেরকে উদ্ধার করে একটি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থার উদ্ধারকারী জাহাজ। তারপর তাদেরকে  ইউরোপীয় ইউনিয়নের ছোট্ট একটি দ্বীপ দেশ মাল্টায় নিয়ে গিয়ে ডিটেনশন সেন্টার নামক এক প্রকার জেলে রাখা হয়েছে। মাঝে মধ্যেই মাল্টা থেকে উদ্ধার হওয়া বাংলাদেশীদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়। ইতিপূর্বে মাল্টা, গত জুন মাসে ১৫৮ জন এবং তার আগেও ৪৪ জন বাংলাদেশীকে দেশে ফেরত পাঠায় । কি কারণে এই সকল যুবক পরিবার রেখে অনিশ্চিত গন্ত্যব্যের দিকে পা বাড়াচ্ছে সেদিকে আলোচনা করলে দেখা যায় এই সকল বেকাররা দেশে কোন কাজের সন্ধান করতে না পারছে আর অদূর ভবিষ্যতে পারবে এমন কোন আশা বা নিশ্চয়তা যখন না দেখছে তখনই তারা এরূপ কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে। দেশে কাজের পরিধি কমে যাওয়ায় এবং কর্মসংস্থান না থাকায় তারা পরিবার পরিজন দেশে রেখে বিদেশে পাড়ি জামানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে। তারা মনে করছে দেশে কষ্ট করে যখন দু’বেলা ভাত জোটাতে পারছি না তখন দেশে থেকে কি লাভ তাই তারা এরূপ কঠিন  সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হচ্ছে । দেশে নতুন কোন কর্মক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে না দেখে তারা অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার জন্য মনস্থির করছে, কারণ বয়সতো আর বসে থাকবে না, সঙ্গে দুষ্ট পাচারকারীদের গাল গল্পতো আছেই। 
এক পরিসংখ্যানে জানা গেছে শুধুমাত্র চলতি বছরে জুন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপ গেছে ৩৩৩২ জন বাংলাদেশী। আর এই ভূমধ্যসাগরে বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক ডুবে মারা গেছেন বা নিখোঁজ আছেন এমন লোকের সংখ্যা ২৬৯ জন । মূলতঃ পাচারকারীরা তিনটি রুটে বাংলাদেশীদের পাচার করে থাকে। প্রথমতঃ বাংলাদেশ থেকে তুরস্ক, তারপর লিবিয়া সবশেষে ইউরোপ অথবা বাংলাদেশ থেকে প্রথমে ভারত বা শ্রীলঙ্কা পরে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ অথবা বাংলাদেশ থেকে প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাত হয়ে জর্ডান তৎপর লিবিয়া হয়ে ইউরোপ। আর এই সকল রুটে নানা বিপদতো আছেই, কিছুদিন পূর্বেও লিবিয়ার একটি আস্তানায় পাচারের উদ্দেশ্য রাখা মানুষের ওপর নির্মমভাবে গুলিবর্ষণ করে অনেক নিরপরাধ নাগরিককে হত্যা করা হয়। কিছু বেকার লোকজন দেশে কাজের কোন সন্ধান করতে না পেরে এবং দ্রুত আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার আশায় অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে একদিকে যেমন নিজের জীবন বিপন্ন করছে সেই সঙ্গে নিঃস্ব করছে তার পরিবারকেও। ঝুঁকিপূর্ণ এই সকল রুটে ইউরোপ যাওয়ার পথে যদি ভাগ্যক্রমে তাদের মধ্যে কেহ বেঁচেও যায় তবু তাদেরকে বাড়ী ফিরতে বহু কাঠখড়ি পোড়াইতে হয়। 
বেশ কিছু দিন যাবৎ কিছু নারী ও শিশুকে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে সুপারশপ, শপিংমল, কিংবা বিউটি পার্লারে চাকুরি এবং ভালো বেতনের আশ্বাস দিয়ে এবং নানারূপ ফাঁদে ফেলে দালালেরা তাদেরকে দেশের  বাইরে নিয়ে যাচ্ছে এবং তাদেরকে সংঘবদ্ধ এজেন্টদের কাছে হন্তান্তর করছে এবং পরবর্তীতে এই সকল এজেন্টরা ঐ সকল নারী বা শিশুকে কোন পতিতালয়ে বিক্রি করে দিচ্ছে। বাংলাদেশের পুলিশ এই রকম কিছু ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে এই সকল তথ্য উদ্ধার করেছে। ইতিপূর্বে বাংলাদেশী এক শিশুকে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে উটের জকি বানানোর কারণে গোটা দেশব্যাপী হৈ চৈ পড়ে যায়। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সম্প্রতি পাচার হয়ে যাওয়া এক হাজারের মত নারী  ও শিশু দেশে ফিরে এসেছেন। এখনো প্রায় ১০ হাজারের  মত নারী ও শিশু ভারতের বিভিন্ন জায়গায় বন্দি দশায় আছে। 
বছরের পর বছর পাচারকারীদের করে যাওয়া এই সকল অপরাধ দমনের জন্য এবং তাহাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার জন্য সরকার ২০১২ সনে মানব পাচার প্রতিরোধ আইন করে যা মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০১২ নামে অভিহিত। এই আইনের ৬(২) ধারায় মানব পাচার অপরাধের শাস্তি অনধিক যাবজ্জীবন কারাদন্ড এবং অন্যূন ৫ বৎসর সশ্রম কারাদন্ড এবং অন্যূন ৫০ হাজার টাকা অর্থদন্ড এবং এই আইনের ৭ ধারায় সংঘবদ্ধ মানবপাচার অপরাধের শাস্তির বিধান দেওয়া আছে, যাতে সংঘবদ্ধ দলের প্রত্যেক সদস্য উক্ত অপরাধ সংঘটনের দায়ে অভিযুক্ত হবে এবং অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অন্যূন ৭ বৎসর সশ্রম কারাদন্ডে এবং অন্যূন ৫ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন এই আইনে অপরাধ সংঘটনের জন্য প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র বা প্রচেষ্টা চালাইলে উক্ত ব্যক্তি এই আইনের ৮ ধারায় অনধিক ৭ বৎসর এবং অন্যূন ৩ বৎসর সশ্রম কারাদন্ড এবং ২০ হাজার টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হইবেন। এই আইনে পতিতাবৃত্তি করানো, দাসত্বমূলক শ্রম, মানব পাচারের উদ্দেশ্য অপহরণ ও আটক করার জন্য আলাদা আলাদা শাস্তির বিধান দেওয়া আছে। 
প্রতি বৎসর কত লোক বিদেশে পাচার হয় তার কোন সঠিক হিসাব নেই। তবে মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা দুইটি বেসরকারি সংস্থা জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতি ও রাইটস  যশোরের  তথ্যমতে, ভারতে পাচার হওয়া প্রায় ২ হাজার নারীকে গত ১০ বৎসরে আইনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশে ফিরে আনা হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ  সিআইডির তথ্য মতে ২০০৪ সন থেকে ২০২১ সনের মার্চ মাস পর্যন্ত ১৭ বৎসরে দেশ থেকে মানব পাচারের ঘটনায় ৬ হাজার ৭৩৫টি মামলা হয়েছে।  
আইনের কড়াকড়ি প্রয়োগ, মানব পাচারের মামলাগুলো দ্রুততার সাথে বিচার করে শাস্তির ব্যবস্থা, পাশাপাশি দেশে কর্ম সংস্থান-এর ব্যবস্থা করা, অনিশ্চিত বিদেশ যাত্রা নিরুৎসাহিত করার জন্য জাতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে,যাতে কোন ব্যক্তি এই অপরাধীদের ফাঁদে পা না দেয়। আর এভাবেই মানব পাচারের মত অপরাধ এক সময় নির্মূল হবেই হবে । 
লেখক ঃ আইনজীবী, বগুড়া 
০১৭১১-১৯৭৭১৯