আসহাবে ফীলের বিস্ময়কর ও শিক্ষণীয় কাহিনী

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৯:১৯ পিএম, ১১ জুন ২০২১

আলহাজ¦ হাফেজ মাও: মুহাম্মদ আজিজুল হক: সূরা ফীলে আসহাবে ফীল তথা হস্তিবাহিনীর ঘটনা সংক্ষেপে বর্ণিত হয়েছে। অধিকাংশের মতে, ঘটনার ৫০দিন পরে নবীজি (সাঃ) জন্মগ্রহণ করেন। ইয়ামানের শাসনকর্তা আবরাহা ইয়ামানের রাজধানী সানআয় “আল কুল্লাইস” নামক একটি বিশাল গির্জা নির্মাণ করে। অতঃপর আবরাহা হাবশার স¤্রাটের নিকট এই মর্মে পত্র প্রেরণ করলো যে, আমি এখানে এক নজীরবিহীন গির্জা নির্মাণ করেছি। এটা নির্মাণের উদ্দেশ্য এই যে, গোটা দুনিয়ার মানুষ মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত বায়তুল্লাহকে তাওয়াফ করে, সেখানে হজ¦ পালন করে, এখন আমি তাদের সকলের অন্তরাত্মা এই গির্জার দিকে ফিরিয়ে দিব। এটাই হবে সকলের হজ¦ব্রত পালন করার স্থান। আরববাসীরা যখন আবরাহার এই উদ্দেশ্যের কথা জানতে পারলো তখন তাদের একজন রাগে অগ্নিশর্মা হয়ে গির্জায় প্রবেশ করে মলমূত্র ত্যাগ করে তা অপবিত্র করে দিল। আবরাহা যখন জানতে পারলো কোন আরবীয় লোকের দ্বারা এ কাজ হয়েছে, তখন সে শপথ করে বললো, আমি যতক্ষণ পর্যন্ত কাবাগৃহকে ধ্বংস না করবো ততক্ষণ পর্যন্ত শান্ত হবো না। দূর্ধর্ষ আবরাহা ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ৬০ হাজার পদাতিক ও ৯টি অথবা ১৩টি হাতি সহকারে মক্কার পথে রওনা হয়। পথে যু-নফর এবং খাশআম এলাকায় নুফাইল ইবনে হাবিব লোকজন নিয়ে আবরাহার পথ রোধ করে। কিন্তু তারা উভয়ে পরাজিত এবং গ্রেফতার হয়। এ সেনাদল তায়েফের নিকটবর্তী হলে বনু সাকীফ অনুভব করলো যে, এত বড় শক্তির মোকাবিলা করার ক্ষমতা তাদের নেই এবং এই আশংকাও করলো যে, হয়তো তাদের লাত দেবতার মন্দিরও তারা ভেঙ্গে ফেলবে। ফলে তাদের সরদার মাসউদ ইবনে মুআত্তাব একটি প্রতিনিধি দল নিয়ে আবরাহার সাথে দেখা করে। তারা আবরাহাকে বলে, আমরা আপনাকে মক্কার পথ দেখাবার জন্য একজন পথ প্রদর্শক দিচ্ছি। 


দয়া করে আমাদের এই মন্দির ভাঙ্গবেন না। আবরাহা তাদের এ প্রস্তাব গ্রহণ করে। অতঃপর বনু সাকীফ আবু রিগাল নামক এক ব্যক্তিকে তার সাথে দেয়। মক্কার অদূরে ‘আলমাগান্মাস’ স্থানে পৌঁছলে আবু রিগাল মারা যায়। সেখানে স্থানীয় অধিবাসীদের ও কুরাইশদের উট, ছাগল, ভেড়া যা মরুদ্যানে চরে বেড়াচ্ছিল তা আবরাহার সৈন্যরা লুট করে নেয়। এর মধ্যে রাসূলুল্লাহ (সাঃ)-এর দাদা আব্দুল মুত্তালিবেরও ২০০ উট ছিল। এরপর আবরাহা তার দূত হানাতা হামিরীকে এই সংবাদ দিয়ে কুরাইশ সরদারের নিকট প্রেরণ করলো, আমরা তোমাদের সাথে লড়াই করতে আসিনি। বরং কাবাঘর বিধ্বস্ত করাই আমাদের একমাত্র উদ্দেশ্য। সুতরাং এ ব্যাপারে যদি তোমরা আমাদের বাধা না দাও, তাহলে আমরা তোমাদের কোন ক্ষতি সাধন করবো না। হানাতা মক্কার সবচেয়ে বড় সরদার খাজা আব্দুল্লাহ মুত্তালিবের সাথে সাক্ষাত করে আবরাহার পয়গাম পৌঁছে দেয়। আব্দুল মুত্তালিব বলেন, ‘তার সাথে যুদ্ধ করার শক্তি আমাদের নেই। এটা আল্লাহর ঘর, তিনি চাইলে তার ঘর হেফাজত করবেন’। দূত বলে, আপনি আমার সাথে আবরাহার কাছে চলুন। তিনি সম্মত হন। হযরত আব্দুল মুত্তালিব এতই সুশ্রী, আকর্ষণীয় ও প্রতাপশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন যে,  আবরাহা তাকে দেখে অত্যন্ত প্রভাবিত হয়ে পড়ে। সে নিজে সিংহাসন থেকে নেমে এসে তাকে বিনয়ের সাথে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি চান?  তিনি বললেন,  আমার যে উটগুলি ধরে নেয়া হয়েছে সেগুলি আমাকে ফেরত দেয়া হোক।

 আবরাহা বললো, আপনাকে দেখে তো আমি বড় প্রভাবিত হয়েছিলাম। কিন্তু আপনি নিজের উটের দাবী জানাচ্ছেন অথচ কাবাগৃহ সম্পর্কে কিছুই বলছেন না। আপনার এ বক্তব্য আপনাকে আমার দৃষ্টিতে মর্যাদাহীন করে দিয়েছে। জবাবে তিনি বললেন, আমি তো আমার উটের মালিক। তাই সেগুলো ফেরত দেয়ার আবেদন জানাচ্ছি। আর কাবাঘরের একজন রব-মালিক আছেন। তিনিই এর হেফাজত করবেন। আবরাহা বললো, তিনি আমার হাত থেকে একে রক্ষা করতে পারবেন না। খাজা আব্দুল মুত্তালিক বললেন, এ ব্যাপারে আপনি ও তিনি জানেন। একথা বলে তিনি নিজের উটগুলো নিয়ে চলে আসেন। অতঃপর তিনি ও কুরাইশদের আরো কয়েকজন সরদার কাবার দরজার কড়া ধরে আল্লাহর কাছে এই বলে দুআ করেন, আল্লাহ যেন তার ঘর ও কাবার খাদেমদের রক্ষা করেন। পরের দিন আবরাহা মক্কায় প্রবেশ করার জন্য এগিয়ে যায়। কিন্তু তার বিশেষ হাতি “মাহমুদ” ছিল সবার আগে সে হঠাৎ বসে পড়ে। বহু চেষ্টা করেও তাকে সামনে নেয়া যায় না। এ সময় আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষুদ্রাকৃতি আবাবিল পাখি ঠোঁটে ও দু’পায়ে কংকর নিয়ে উড়ে আসে এবং সেনাদলের ওপর সেই পাথর কণা বর্ষণ করতে থাকে। হযরত ইবনে আব্বাসের মতে, যার ওপরই পাথর কণা পড়তো তার সারা গায়ে চুলকানি শুরু হতো। আর চুলকাতে চুলকাতে চামড়া ছিড়ে গোশত ও রক্ত পানির মত ঝরে পড়তো এবং হাড় বেরিয়ে যেত। আবরাহার অবস্থাও এরূপ হয়। হুড়োহুড়ি করে তারা ইয়ামানের দিকে পালাতে থাকে। আবরাহা খাশআম এলাকায় পৌঁছে মারা যায়। 
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক 
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০