করোনার শিক্ষা

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৯:১৬ পিএম, ১১ জুন ২০২১

রবিউল ইসলাম রবীন : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা দ্রুত করোনা বিস্তারের কথা বিবেচনা করে ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি কোভিড-১৯ কে মহামারি ঘোষণা করে। তারপরই করোনা ’টক অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ হয়ে ওঠে। পৃথিবীর ৭২০ কোটি মানুষ এই মহামারির কাছে অসহায় হয়ে পড়ে। কবরস্থান আর চিতায় মানুষের মৃতদেহ দেখা যায় শুধু। লকডাউনে সমগ্র পৃথিবী স্থবির হয়ে পড়ে। ভয় আর আতঙ্ক মানুষের মনে বাসা বাধে। স্কুল-কলেজ বন্ধ হয়ে আছে। অভাব, দরিদ্রতায়, অসুস্থতায় পৃথিবীর বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। রোগটি নতুন। এর কোন ওষুধ আবিষ্কার হয়নি। কিন্তু করোনা প্রতিরোধে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা হাত ধোওয়া, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সহ যে সকল বিধিমালা দিয়েছিল, তাও আমরা অনেকে অবজ্ঞা করেছি, নেগেটিভ ভাবে নিয়েছি। তবে সবচেয়ে যেটি ভরসার কথা করোনার একাধিক টিকা আবিস্কার হয়েছে এবং তার প্রয়োগও শুরু হয়েছে। 

বেশিরভাগ মানুষ বিশ্বাস করে যে, করোনা হচ্ছে প্রকৃতির কাছে মানুষের অসহায়ত্ব। এমনকি ২০২০ আমাদের দেখিয়েছে যে অসহায়ত্ব থেকে মানবতার দূরত্ব আসলে কতখানি। সবচেয়ে যেটি সুখের কথা মহমারি এখন আর প্রকৃতির কাছে অনিয়ন্ত্রিত শক্তি নয়। বিজ্ঞান এগুলোকে মোকা-বেলাযোগ্য করে ফেলেছে। করোনার টিকা আবিষ্কার হয়েছে। তাও অল্প দিনের ব্যবধানে। তারপরও বিশ্বজুড়ে কেন এত মৃত্যু? এত দুর্ভোগ? কারণ আর কিছুই নয়, রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি। কিন্তু কি দেখতে হলো। মানুষ অসুস্থ রোগী নিয়ে একের পর এক হাসপাতাল খুঁজেও চিকিৎসা পাচ্ছে না। একবিংশ শতাব্দিতে আমাদের যা দেখতে হলো তা গভীর লজ্জার? সৃষ্টিকর্তা আমাদের মাফ করুক। 
বিগত শতকগুলিতে ১৭২০, ১৮২০ এবং ১৯২০ সালে তিনটি মহমারি আমরা দেখেছি। প্লেগ, কলেরা, ইনফ্লুয়েজ্ঞা মহামারিতে লাখ লাখ মানুষকে আমরা হারিয়েছি। স্ফানিস ফ্লুতে প্রায় ৫ কোটি মানুষ মারা যায়। করোনা ভাইরাসের মতো অতীতের ওই মহামারিগুলিতে কয়েক দফায় আঘাত হেনেছে। তখন থেকেই পৃথিবীতে দেখা গেছে মানুষে মানুষে বিচ্ছিন্নতা। অতীতের সেই মহামারিগুলিতে গ্রামের পর গ্রাম মানুষ মারা গেছে। মানুষের কিছুই করার ছিল না। অনেক পর হলেও বিজ্ঞানিরা সেই সকল রোগের টিকা আবিষ্কার করেছে। কিন্তু এখনও কলেরা, বসন্ত, এইডস কে পুরোপুরি জয় করা যায় নি। সেই সকল রোগকে সাথে করেই মানুষ চলছে। হয়তো করোনার ক্ষেত্রেও আমাদের তাই করতে হবে। বিশ্বখ্যাত ’ল্যানসেট’ পত্রিকায় বিজ্ঞানীরা মন্তব্য করেছেন, করোনা প্রতিবছর সিজনাল রোগ হিসেবে দেখা দিতে পারে। 

২০১৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথম করোনাভাইরাসের ভয়াবহতা টের পাওয়া যায়। এর মাত্র কিছুদিন পর ২০২০ সালের জানুয়ারির মধ্যে বিজ্ঞানীরা শুধু ভাইরাসটিকে শনাক্ত করতেই সক্ষম হননি বরং এর জিনোম সিকোয়েন্স আবিষ্কার করে। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে এই ভাইরাসের শিকল কীভাবে ছিন্ন করা সম্ভব এবং এক বছরের কম সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য কার্যকর টিকা পর্যন্ত তৈরি হয়ে যায়। মানুষ ও জীবাণুর মধ্যে যুদ্ধে মানুষ এতটা শক্তিশালী ছিল না। করোনার এই বছর একদিকে যেমন জীবপ্রযুক্তির অভূতপূর্ব অর্জনকে সামনে এনেছে, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তির শক্তিকেও দেখিয়ে দিয়েছে। ১৯১৮ সালে আপনি মানুষকে কোয়ারেন্টিনে রাখতে পারতেন কিন্তুু সংক্রমণের পূর্বধারনা করতে পারতেন না, কে ভাইরাস  বহন করছে আর কে করছে না, তা বুঝতে পারতেন না। ফলে সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে আপনে যখন মানুষকে ঘরে বন্দী করে রাখতেন, তখন স্বাভাবিকভাবেই অর্থনীতি ভেঙে পড়তো, সামাজিক শৃঙ্খলা নষ্ট হতো এবং অনেক মানুষ ¯্রফে অনাহারে মারা যেত।

পৃথিবীতে যখন কালমৃত্যু থাবা বিস্তার করেছিল, তখনকার একটা দৃশ্যের কথা কল্পনা করুন। তখন ফসল কাটার সময় কৃষকদের যদি ঘরে থাকতে বলা হতো, তাহলে কী হত? দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা দিত। যদি কৃষকদের ফসল কাটতে বলা হতো, তাহলে তারা ভাইরাসে আক্রান্ত হতো। উভয় সংকট। কী করবে তাঁরা? এখন ২০২১ সালে একই দৃশ্য কল্পনা করুন। একটামাত্র জিপিএস মেশিন দিয়ে আপনে ফসল কাটতে পারেন, যেখানে মানুষের সংক্রমিত হওয়ার আশঙ্কা শূন্য। সমস্যা আরো আছে। ফসল উৎপাদনই তো যথেষ্ট নয়। আপনাকে সেই ফসল বা শস্য পরিবহন করে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে নিয়ে যেতে হবে। মাঝে মধ্যে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে এক শহর থেকে আরেক শহরে নিতে হবে। ইতিহাস সাক্ষি, মহামারির সময় এক স্থান থেকে আরেক স্থানে ভ্রমণ হচ্ছে সবচেয়ে বড় খলনায়ক। আগের যুগে বাণিজ্যিক জাহাজগুলো থেকেই সবচেয়ে বেশি মহামারি ছড়িয়েছে। উদাহরণ হিসবে বলতে পারি, কালমৃত্যু পূর্ব এশিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়েছিল সিল্ক রোডের মাধ্যমে। 

প্রযুক্তি সবচেয়ে বেশি অবদান রাখছে চাকরি ক্ষেত্রে। ১৯১৮ সালে লকডাউনের মধ্যে অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোট-কাচারি কাজকর্ম চালু রাখা ছিল অসম্ভব বিষয়। এখন আমরা কি দেখছি? সবকিছুই প্রায় অনলাইনে চলছে। বাংলাদেশের ওয়াসার এমডি নাকি অনলাইনে আমেরিকা থেকে অফিস করছে। তবে ডেলিভারিম্যান থেকে শুরু করে, চিকিৎসক, পুলিশ, নার্স, সাংবাদিকসহ অন্যান্যরা যাঁরা সম্মুখযোদ্ধা হিসেবে কাজ করছেন, তাদের প্রতি আমাদের সহানুভূতির চোখে তাকাতেই হবে। কারণ, তাদের কাজটি শারীরিক। এখনো তাঁরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। আমরা আশা করতেই থাকবো, আগামী দিনগুলিতে বিজ্ঞান, রাজনীতিবিদরা সেই সব উদ্যোগি ভূমিকা পালন করবে, যা করেছিল তাদের উত্তরসুরীরা। পুরোনা রাজনীতি ভেঙে পড়ার কালে নতুন রাজনৈতিক সমাজ এভাবেই গড়ে ওঠে। আমাদের হয়তো নবজাগরণ নেই, তবে অন্ধকারে এটাই হয়তো রূপালি রেখা। শেষে প্রার্থনার সুরে বলি, উই শ্যাল ওভার সাম ডে। সৃষ্টিকর্তা অবশ্যই আমাদের সংকট কেটে দেবেন।
লেখক ঃ সহকারি অধ্যাপক-কলামিষ্ট 
০১৭২৫-০৪৫১০৫