হাত গুটিয়ে থাকার সুযোগ নেই

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:৪৯ এএম, ০৬ জুন ২০২১

মামুন রশীদ: জলবায়ু পরিবর্তন, পৃথিবীর আব-হাওয়া পাল্টে যাবার কথা অনেক দিন থেকেই আলোচনায়। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে বিজ্ঞানীরা সতর্ক করছিলেন। ওজন স্তর ফুটো হয়ে যাবার কথাও অনেক পুরনো। কিন্তু সেই পুরনো কথার গুরুত্ব কেউ দেয়নি। আর দিলেও তা যে যথাযথভাবে দেওয়া হয়েছে, এমন বলার সুযোগ নেই। বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তা মানুষ শুনেছে। রাষ্ট্রপ্রধানরা তহবিল সংগ্রহের জন্য বিভিন্ন ফোরামের নানা আয়োজনে উত্তেজক কথাবার্তা বলে হাততালি নিয়েছেন এবং নিচ্ছেন। একে অন্যকে দোষারোপের সংস্কৃতিও রয়েছে। আর ধনী রাষ্ট্রগুলো যেভাবে কার্বন নিঃসরণ করছে, তার বিপরীতে দরিদ্র রাষ্ট্রগুলো রীতিমতো অসহায়। ফলে একদিকে দোষারেপের সংস্কৃতি, দরিদ্র দেশগুলোর আহাজারি, পৃথিবীব্যাপী সচেতন মানুষদের আর্তনাদ অন্যদিকে বায়ুমন্ডলে অবিচ্ছিন্নভাবে কার্বন নিঃসরণ চলতে থাকে। ফলে বিজ্ঞানীদের সতর্কবার্তাও ফলতে শুরু করেছে। মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে, হিমালয়ের বরফ গলছে। সেই পানি ধেয়ে আসছে সমুদ্রে। বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা। আর ওজোন স্তরের ফুটো বাড়তে থাকারও প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বের তাপমাত্রার যে পরিবর্তন তাও স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। পেছনের একশ বছরের তাপমাত্রা মিলিয়ে দেখে, বায়ুম-ল এবং পৃথিবী পৃষ্ঠ উষ্ণ হয়ে ওঠার প্রমাণও হাতে নাতে ফলতে শুরু করেছে। 

মাঝে কয়েকদিন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিল পরিবেশবাদীরা। গত বছর বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী ছড়িয়ে পড়ার পর, সবাই যখন জীবন বাঁচাতে ঘরে ঢুকে পড়ে, তখন প্রকৃতিও প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করে। কল-কারখানা বন্ধ, গাড়ির চাকা ঘুরছে না, পেট্রোল, ডিজেল পুড়ছে না। আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ইটভাটাগুলোতে কাঠ পুড়ছে না, গাছ কাটা প্রায় বন্ধ, তখন পরিবেশও নিজেকে ফিরে পেতে শুরু করে। বায়ু দূষণের শীর্ষে থাকা আমাদের রাজধানীতেও দূষণের পরিমাণ কমে আসে। সূচকেও আমাদের উন্নতি হয়। এতো গেলো অদৃশ্য এবং বায়বীয় কথাবার্তা। পরিবেশের দৃশ্যমান উন্নতিও তখন মানুষের কাছে পরিষ্কার হয়ে উঠতে থাকে। আমাদের সমুদ্র সৈকতে শেষ কবে ডলফিন দেখা গেছে, তা কেউ মনেই করতে পারে না। সেখানেও করোনাকালে ঝাঁকে ঝাঁকে ডলফিন এসে হাজির হয়। তাদের উপস্থিতিতে প্রাণ ফিরে পায় সৈকত। সাগরপাড়ে উঠে আসে সামুদ্রিক কচ্ছপ। সংবাদমাধ্যমে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকৃতিপ্রেমী মানুষকে আশাবাদী করে। প্রকৃতির সজীবতায় মানুষও হাফ ছাড়ে। কিন্তু এ দৃশ্য সাময়িক। করোনা মাহামারীর মাঝেই আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা স্পষ্ট দেখতে শুরু করি। করোনার মাঝেই আমাদের ওপর গতবছর ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘূর্ণিঝড় আম্পান। সেই রেশ কাটতে না কাটতেই দেখা দেয় বন্যা। সে সময় উজানের নেমে আসা ঢলে দেশের প্রায় অর্ধেকের বেশি জেলা তলিয়ে যায়। আশ্রয়হীন হয় অসংখ্য মানুষ। বন্যা এবং ঘূর্ণিঝড়ের সঙ্গে আমাদের পরিচয় থাকলেও, গতবারের মতো দীর্ঘমেয়াদী বন্যা আমাদের দেশেও বিরল। কয়েক দফা বন্যায় দেশের উত্তরের অনেক জেলাই তলিয়ে যায়। এবারে আমাদের ওপর দিয়ে বয়ে গেলো ঘূর্ণিঝড় ইয়াস। যদিও আম্পান বা তার আগে বয়ে যাওয়া ঘূর্ণিঝড় ফণী যেমন ছোবল দিয়েছিল, ইয়াস ততটা না পারলেও, খুব কমেও ছাড়েনি। 
সবমিলিয়ে বর্তমান অবস্থায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যে আমাদের ওপর পড়তে শুরু করেছে, তা স্পষ্ট। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর যে তালিকা বহুপূর্ব থেকেই অনুমিত, আমরা সেই তালিকাভুক্ত দেশ। ফলে আমাদের ভয় আরও বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনে বিশ্বের যেসব দেশ আজ সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত, বাংলাদেশ তার অন্যতম। প্রতিবছরই আমাদের লাখ লাখ মানুষ ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, দাবদাহ ও খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়া। মেরু অঞ্চলের বরফ গলায় সমুদ্রের উচ্চতা বেড়ে আমাদের ভূখন্ডের অনেক অংশই তলিয়ে যাবে। নষ্ট হয়ে যাবে আমাদের জীববৈচিত্র্য। 
জলবায়ু পরিবর্তন আজকের পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় সংকট। এই সংকটের ভয়াবহতা শুধু বাংলাদেশেই নয়, দেশে দেশে উপলব্ধি হতে শুরু করেছে। দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে প্রকৃতি। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ঋতুবৈচিত্র্য। প্রকৃতি তার স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলছে। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলেও পরিবর্তন ঘটছে। ঘন ঘন ঘূর্ণিঝড়, সাইক্লোনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ বেড়েছে। বন্যা অনেকস্থানেই স্থায়ী রূপ নিচ্ছে। বজ্রপাতের পরিমাণ বেড়েছে, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুর হারও বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। শুধু আমাদের দেশেই নয়, অন্যান্য দেশেও জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহতা স্পষ্ট হতে শুরু করেছে। সাম্প্রতিক সময়ে অনেক দেশেই তাপমাত্রা পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে মাত্রাতিরিক্ত গরমে কাহিল হয়ে পড়েছে মানুষ। 
যা থেকে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীরা যে সতর্কবার্তা দিয়ে আসছেন, তার সত্যতা উপলব্ধি করতে পারছে সাধারণ মানুষ। জলবায়ু ও আবহাওয়ার পরিবর্তন আজ স্বীকৃত সত্য। বিভিন্ন গবেষণাপত্রেও গত একশ বছরের পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে দেখানো হয়েছে। ইতোপূর্বে বিজ্ঞানীরা যেমন আশঙ্কা করেছেন, এখনও তাদের সেই আশঙ্কা, যা আজ সাধারণের মাঝেও ভীতির জন্ম দিচ্ছে। কারণ একথা স্পষ্ট যেভাবে বায়ুমন্ডল এবং পৃথিবী পৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে, যেভাবে মেরু অঞ্চলের বরফ গলছে সে ধারা যদি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে সামনে যে দুর্যোগ অপেক্ষা করছে তা কোনোভাবেই সামাল দেওয়া যাবে না। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে পৃথিবীর কোন দেশই মুক্ত থাকবে না। পরিস্থিতির এই বিপজ্জনক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েই আমাদের সতর্ক হতে হবে। এক্ষেত্রে ধনী দেশগুলোর দায়িত্ব বেশি হলেও, আমাদেরও হাত গুটিয়ে থাকার সুযোগ নেই। কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পৃথিবীর উত্তপ্ত হওয়া ঠেকাতে হবে। তাহলেই পৃথিবী বিপদমুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।  
লেখক ঃ কবি-সাংবাদিক
০১৯১২-৩০৬৩৫৬