চালের দাম বাড়ছে, কমার লক্ষণ নেই!

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:৪৮ এএম, ০৫ জুন ২০২১

হাদিউল হৃদয়:মহামারির এই সংকটকালে চালের দামও ক্রমাগত বাড়ছে। বাংলা-দেশের নিম্ন আয়ের মানুষের প্রতিদিনের খাদ্য মোটা চালের দাম এখন ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি। এক কেজি চাল কিনতে হচ্ছে ৬৪ টাকায়। শুধু মোটা চাল নয়, সব ধরনের চালের দামই বিগত বছরের চেয়ে অনেক বেড়ে যাওয়ায় কষ্টের মধ্যে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষসহ স্বল্প আয়ের পরিবারগুলো। বাজারে চালের এই দাম বৃদ্ধিকে বলা হচ্ছে অস্বাভাবিক। বাঙালির প্রতিদিনের অন্যতম খাবার ভাত। কিন্তু নিত্যদিনের সেই পণ্যের দাম যেন লাগাম ছাড়া। গত কয়েক মাসে চালের দাম বেড়েছে কয়েকবার, বাড়ছেই লাগামহীনভাবে। গত এক বছরে খোলা বাজারে মোটা চালের দাম ১৩ থেকে ১৪ টাকা বেড়ে ৪২ টাকা থেকে ৪৫ টাকা হয়েছে। ফলে বেড়ে গেছে নিত্যদিনের বাজার খরচ, কষ্টে পড়েছে সাধারণ মানুষ। কিন্তু, সত্যি বলতে কি গত বোরো মৌসুম পর্যন্ত দেশে কোনো খাদ্য ঘাটতি ছিল না। গত বছর আমাদের প্রয়োজন ছিল ৩ দশমিক ৫৮ কোটি মেট্রিক টন খাদ্যশস্য। আমাদের উৎপাদন হয়েছে ৩ দশমিক ৬০ কোটি টন। 

গত মৌসুমেই ইন্দোনেশিয়াকে পিছনে ফেলে তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ হয়েছিল বাংলাদেশ। গত বছর আমাদের ঐ অর্থে কোনো আমদানি করতে হয়নি। আমরা বলতে গেলে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলাম। অর্থাৎ, উৎপাদন ও ভোগ ছিল প্রায় সমানে সমান। কিন্তু, প্রাকৃতিক দুর্যোগে যখন আমাদের গত আমন মৌসুম মার খায়, তখন সরকার অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে ধান চাল সংগ্রহ করার যে উদ্যোগ নেয় তা ব্যর্থ হয়। কারণ, ধান ও চালের যে উৎপাদন মূল্য তার চেয়ে কম মূল্যে ধান-চাল কেনার দাম ধার্য করে সরকার। চাল ৩৬ টাকা ও ধান ২৬ টাকা। কিন্তু, কৃষকের উৎপাদন মূল্যই হচ্ছে ধান প্রায় ৩০ টাকা ও চাল ৪০ টাকা। সুতরাং প্রায় ৮ লাখ টন কেনার লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করলেও সরকার কিনতে পেরেছ মাত্র ৮৫ হাজার টন। কারণ মিলার ও কৃষক সরকারি গুদামের চেয়ে বাজারে বেশি দাম পাচ্ছিল। এটাও মজুদ কম হওয়ার একটা বড় কারণ। বর্তমানে চালের দাম বাড়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কারণ বোরো ধান বাজারে উঠেছে। সরকারও সাড়ে ১১ লাখ টন চাল ও সাড়ে ছয় লাখ টন ধান কেনার উদ্যোগ নিচ্ছে। মিকভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কৃষকের যা উৎপাদন মূল্য তার চেয়ে এক টাকা বেশি দামে চাল কেনা হবে। সরকারের এ উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই। কিন্তু এবারও সরকারের মূল্য থেকে বাজারে ধানের দাম বেশি। তাই এবারও লক্ষ্য পূরণ না হবার সম্ভাবনা বেশি।  

এ অবস্থায় ধানের বাজার বাড়তি, অতি বৃষ্টি, আমদানি চালের ওপর ভ্যাটসহ বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ব্যবসায়ীরা চালের দাম বাড়িয়েছে। এছাড়া দাম বাড়ার মূল কারণ হলো- মিল মালিকরা চাল স্টক করছেন। অতিরিক্ত মুনাফার লোভে দাম বাড়িয়েছেন। আগে মোকাম মালিকরা চাল সরবরাহের পর পাইকারি ব্যবসায়ীরা সুবিধামতো দামে বিক্রি করতো। কিন্তু সম্প্রতি মিল মালিকরা মূল্য নির্ধারণ করে দিচ্ছেন। নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কমে বিক্রি করলে তার দায় ব্যবসায়ীদের নিতে হচ্ছে। মিল মালিকরা প্রতিদিনই চালের দাম বাড়াচ্ছেন। মিল মালিকরা স্টক করা বন্ধ করলে চালের দাম এমনিতেই কমে যাবে।

তবে চালের দাম বাড়ায় সুফল কৃষকরা পাচ্ছেন না। কারণ মৌসুমের শুরুতেই মিল মালিকদের কব্জায় চলে যায় অধিকাংশ ধান। বছরের নতুন বোরো মৌসুমের চালের সরবরাহ শুরু হয়। ভারতীয় চালের আমদানি প্রায় বন্ধ। আবার হাওর এলাকায় ফসল নষ্ট হওয়ার কারণে আগামী দিনে চালের সরবরাহ কিছু কম হওয়ার তথ্যের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও বাজারে পড়েছে। সব মিলিয়ে চালের বাজারে টান পড়েছে বলেই দাম এত চড়ে গেছে। তবে মিল মালিকেরা হাজার হাজার মেট্রিক টন ধান গুদামজাত করে রেখে অল্প চাল করে বেশি দামে বিক্রয় করছে। ফলে দিনমজুর সাধারণ নি¤œ আয়ের মানুষেরা এখন সংকটে পড়েছেন চালের দাম নিয়ে। সংকটে পড়েছেন নি¤œ মধ্যবিত্তরাও। 
দরিদ্র মানুষের বড় চিন্তা তো মোটা চালের দাম নিয়ে, সেখানেও একটা ধাক্কা লাগবে। চালের প্রাপ্তিতে একটা ঘাটতি তৈরি হতে যাচ্ছে, সেটা দৃশ্যমান। এটা মোকাবিলায় সরকারকে নানা কর্মসূচি নিতে হবে। গতানুগতিক উপায় নয়, একটা উদ্যোগী মনোভাব থাকতে হবে।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-সংগঠক
০১৭১৫-৬৫৯৯৭০