নতুন প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:৫৮ এএম, ০২ জুন ২০২১

আব্দুল হাই রঞ্জু: ধর্ষণের মত সামাজিক ব্যাধি প্রতিনিয়তই মহামারিতে রূপ নিচ্ছে। পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ছে ধর্ষণের আগ্রাসন। বিশেষ করে শিশু ধর্ষণের মত ঘটনা আমাদের দেশে যে হারে বাড়ছে, দুনিয়ার অন্য কোন দেশে সে হারে ঘটছে না। এর মুল কারণ হচ্ছে, নৈতিক মূল্যবোধের অভাব ও সামাজিক অবক্ষয়ের দিক থেকে বাংলাদেশ এখন শীর্ষে। কারণ আমাদের দেশে সুশাসনের অভাবে ঘুষ, দুর্নীতি, ব্যাভিচারের মতো ঘটনা দেদার ঘটছে। অপরাধ করে সহসাই অনেকেই পার পেয়ে যায়। ফলে শিশু ধর্ষণের মত অমানবিক জঘন্য অপরাধ কমার বদলে শুধুই বাড়ছে। যে কোন দেশে অপরাধীরা অপরাধ করে যদি শাস্তি পেতে না হয়, তাহলে অপরাধ প্রবণতা বাড়বেই, এটাই স্বাভাবিক। আর এ কারণেই আমাদের দেশে শিশু ধর্ষণ মহামারিতে রূপ নিয়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ধর্ষণ, গণধর্ষণ, ধর্ষণের চেষ্টা আর ধর্ষণজনিত হত্যার মূল শিকার হয়েছে শিশু, অথবা সদ্য অপ্রাপ্তবয়স্ক তরুণীরা। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ধর্ষণের শিকার ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী।
সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার নারীর সংখ্যা প্রায় চার হাজারের বেশি। কিন্তু পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে, উল্লেখিত সময়ে আরো বেশি ধর্ষণের মামলা হয়েছে। আইন ও সালিস কেন্দ্রের হিসাব এবং খোদ পুলিশ সদর দপ্তরের হিসাবে ফারাক থাকলেও শিশু ধর্ষণের ঘটনা যে বাড়ছে, যা নিশ্চিত করেই বলা যায়! প্রকৃত অর্থে কি পরিমাণ ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, তা সঠিকভাবে নিরুপণে সরকারি কিম্বা বেসরকারি ভাবে কোন তথ্যভান্ডার না থাকায় প্রকৃত হিসাবে গরমিল হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপকমিশনার বলেন, ধর্ষণের সব ঘটনায় মামলা হয় না। পরিবার প্রথমেই ঘটনা গোপন করতে চায়। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ঘটনা ঘটছে ঘরের ভেতরে, আপনজনদের মাধ্যমে। ধর্ষণের পর শিশু বিষাদগ্রস্ত হলে বা সবাই জেনে গেলে তখনই পরিবার মামলা করে। তিনি বলেন, গত বছরের প্রথম দুই সপ্তাহে আটটি চাঞ্চল্যকর ধর্ষণ মামলা তাদের কাছে তদন্তের জন্য এসেছে। এমনকি গত বছরের প্রথম ১৮ দিনে জাতীয় এক দৈনিকে ২৩টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার খবর প্রকাশিত হয়েছিল। এর মধ্যে ১৫ জনই শিশু কিশোরী। এমনকি এর মধ্যে দুই বছরের শিশুও রয়েছে। আবার চারজনকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। এমনি প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও শিশু ধর্ষণের ঘটনা ঘটছে। দুই বছরের নিষ্পাপ শিশুকে ধর্ষণের চেষ্টাই প্রমাণ করে, সামাজিক অবক্ষয় মানুষকে পশুর মত নিকৃষ্ট স্থানে নিয়ে গেছে। মানুষ নামের এসব নরপশুদেরকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, আইনের শাসনকে নিশ্চিত করতে না পারলে শিশু কিশোরী ধর্ষণের মত জঘন্য অপরাধ রোধ করা কঠিন হবে। উল্লেখ্য, ২০১৯ সালের অক্টোবরে জাতীয় এক দৈনিকে ‘শিশু বান্ধব আইনের অভাবে বাড়ছে যৌন নির্যাতন’ শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছিল। প্রকাশিত খবরে জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময়ে ৪৯৪ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ব্যাপারে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের চাইল্ড এডোলেসেন্ট অ্যান্ড ফ্যামিলি সাইক্রিয়াটির সহযোগি অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে যৌন হয়রানির শিকার শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, শতকরা ৭৫ ভাগ যৌন হয়রানির ঘটনাই ঘটে পরিবারের ঘনিষ্ঠজন, বন্ধু বা আত্মীয় স্বজনদের মাধ্যমে। পাশাপাশি ছেলে শিশুরাও যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সহমত প্রকাশ করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামও বলছে, যৌন নিপীড়নের শিকার শতকরা পাঁচ ভাগ ছেলে শিশু। আর ৯৫ ভাগ মেয়ে শিশু ধর্ষণ ছাড়াও নানাভাবে যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছে। আবার সংঘবদ্ধভাবেও শিশু ধর্ষণ করা হচ্ছে। এমনকি ধর্ষণের পর হত্যাও করা হচ্ছে। যার কবল থেকে প্রতিবন্ধী শিশুরাও রেহাই পাচ্ছে না। শিশু অধিকার ফোরামের হিসাব মতে, ২০১৪ সালে ১৯৯ জন, ২০১৫ সালে ৫২১ জন, ২০১৬ সালে ৪৪৬ জন, ২০১৭ সালে ৫৯৩ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ২০১৮ সালের ২৯ অক্টোবর আইন ও সালিশ কেন্দ্রের আয়োজনে জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘অনলাইনে শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধ: আইনি পর্যালোচনা’ শীর্ষক আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় সংস্থাটির শিশু অধিকার ইউনিটের সমন্বয়কারী জানান, ২০১১ সাল থেকে ২০১৮ সালের আগস্ট পর্যন্ত ৬৮ জন শিশু অনলাইনে নির্যাতনের শিকার হয়েছে। সাইবার অপরাধের শিকার ১৩৩ জন নারী ও পুরুষের ওপর পরিচালিত এক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হলে অনলাইনে যৌন হয়রানির সংখ্যা অনেকটাই কমে আসবে। তিনি আরো বলেন, ৫৪ শতাংশ ভিকটিম যৌন হয়রানির বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, শিশুবান্ধব আইনের অভাব ও প্রচলিত আইনের সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ার কারণে শিশুদের প্রতি যৌন নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছেই। উক্ত আলোচনা সভায় শিশু যৌন হয়রানির বিষয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, তথ্য ও প্রযুক্তি আইন এবং পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনের পর্যালোচনা করে ব্রাক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের শিক্ষক সাইমুম রেজা তালুকদার বলেন, অনলাইনে শিশুদের অপরাধ বা অপরাধের শিকার শিশুদের বিচার নিয়ে বাংলাদেশে কোন আইনে স্পষ্ট কিছু বলা নেই। তিনি মনে করেন, সাইবার অপরাধ বন্ধে এবং শিশুদের সুরক্ষায় আইনের স্পষ্ট ব্যাখ্যা থাকা দরকার। এ প্রসঙ্গে ডিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (সাইবার সিকিউরিটি অ্যান্ড ক্রাইম) বলেন, ঢাকা শহরের ৬৫ শতাংশ সাইবার ক্রাইম আমাদের পক্ষে টাচ্ই করা সম্ভব হয় না, অথচ এর প্রধান শিকার হচ্ছেন মেয়েরা। এ জন্য সাইবার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো উচিৎ মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন।
সন্তানকে নিয়ে প্রতিটি বাবা-মা’ই স্বপ্ন দেখেন। সে স্বপ্ন ধর্নী-নির্ধন প্রতিটি বাবা মায়েরই সমান। সম্ভাবনাময় এমনি কত শিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে নিষ্পাপ বয়সেই কলংকের বোঝা নিয়েই বেড়ে উঠছে। হয়ত সম্ভ্রম হারানোর ব্যথা সইতে না পেরে কতজনই না আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছে। এ ধরনের যৌন নির্যাতনের ঘটনা এখন নিত্যদিনের! ফলে প্রতিটি বাবা মায়ের সময় কাটে অজানা কোন আতংকে। কিন্তু আমরা তো সভ্য যুগে বসবাস করছি। তারপরও কেন অসভ্য যুগের মত বর্বরোচিত ঘটনা ঘটছে? সমাজ সভ্যতার বিকাশ ঘটছে। মানুষের জীবন মানের উন্নতি হচ্ছে। এরপরও কেন মানুষগুলো এখন পশুর ন্যায় আচরণ করছে? আবার তথ্য প্রযুক্তির উন্নতি ঘটায় এখন মোবাইল, কম্পিউটারের ব্যবহার বেড়েছে। এখন পর্নোগ্রাফির যথেচ্ছা ব্যবহার তরুণ ও কিশোরদের বিপথগামী করছে। মেমোরি কার্ড ও স্মার্ট ফোনের ব্যবহার বেড়েছে, ফলে তার সুবাদে নগ্ন যৌনাচারের ছবি দেখে ছেলে মেয়েরা অপ্রাপ্ত বয়সেই যৌন মিলনে আকৃষ্ট হচ্ছে। ফলে তরুণ কিশোররা বিপথগামী হচ্ছে। যে কারণেই এসব প্রযুক্তির ব্যবহার রোধ করতে না পারলে যৌন ব্যাভিচার বাড়তেই থাকবে। সংগত কারণে কোমলমতি তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরীদের যৌনতার কুফল নিয়ে সচেতন করে তোলা দরকার। কারণ একমাত্র সচেতনতা ব্যতিত প্রযুক্তির সুবাদে পর্নোগ্রাফীর ছড়াছড়ি যেভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তা রোধ করা অনেকাংশেই কঠিন হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক
০১৯২২৬৯৮৮২৮