ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট বাংলাদেশে!

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১২:০২ এএম, ২৮ মে ২০২১

মোহাম্মদ নজাবত আলী : না আতঙ্ক কাটছেনা। ভয় কাটছেনা। আমাদের প্রতিনিয়ত তাড়িত করছে মহামারি করোন্।া বিগত প্রায় দেড় বছর মৃত্যুদূত বৈশ্বিক মহামারি হিসাবে করোনা গোটা বিশ্বকে থমকে দিয়েছে। বিশ্ববাসির চলার গতিকে রুদ্ধ করেছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ভয়াব্হ অবস্থা। আমাদের শঙ্কা হচ্ছে করোনার তৃতীয় ঢেউ ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট নিয়ে ইতিমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যশোর ও সাতক্ষীরায় কয়েকজনের দেহে এ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে এবং তা যদি ছড়িয়ে পড়ে তাহলে বাংলাদেশের জন্য তা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ এবং নিয়ন্ত্রণের বাইরে যা আমাদের সামাল দেওয়া অত্যন্ত কঠিন। 

কেননা আমরা এখনো করোনা থেকে শিক্ষা নেইনি, সতর্ক হইনি। প্রধানমন্ত্রী ঈদের আগে বার বার বলার চেষ্টা করলেন, এবারে ঈদে বাড়ি না গিয়ে যার যার কর্মস্থল থেকে ঈদ করুন। স্বাস্থ্য সেবার সাথে যারা জড়িত তারা স্ব-স্ব অবস্থান বা কর্মস্থল থেকে ঈদ উদযাপন করলেও বিশেষ করে গার্মেন্টস কর্মীরা সরকারের সে নিষেধাজ্ঞাকে অমান্য বা উপেক্ষা করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি না মেনে সড়ক ও নৌ পথে গাদাগাদি করে বাড়িতে ফিরে। করোনা নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য দূরপাল্লার বাস বন্ধ থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে ছোট ছোট যানবাহনে তাড়াহুড়া করে বাড়ি ফিরে। আমরা বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখেছি নৌ-পথে, লঞ্চে উপচেপড়া মানুষের ভিড়। ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরতে আবারো সেই একই দৃশ্য। এমতাবস্থায় বিশেষজ্ঞদের অভিমত, করোনার তৃতীয় ঢেউ যে কেউ বহন করছেনা তার নিশ্চয়তা কোথায়। আর যদি করোনার তৃতীয় ঢেউ ছড়িয়েই পড়ে তাহলে করোনার ইতিহাসে আমাদের দেশের জন্য হবে সেটা সবচেয়ে ভয়াবহ। আসলে আমরা এখনো সতর্ক হইনি, শিক্ষা নেইনি, স্বস্থ্যবিধি মানছিনা।

 আর গ্রামে-গঞ্জে তো স্বাস্থ্যবিধি মানার কোনো বালাই নেই। স্বাস্থ্য বিভাগ ও সরকারের কোনো দিকনির্দেশনা মানা হচ্ছেনা। যে যার মত চলছে। মনে হয় করোনায় কোনো ভয় নেই ভীতি নেই। এর কারণ হলো আমার কাছে যেটা মনে হয়েছে, হাসপাতালের বাইরে বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে করোনায় আক্রান্ত হয়ে তেমন কেউ প্রাণ হারায়নি। হয়তো মারা গিয়েছে গ্রামের মানুষ হাসপাতালে কিন্তু গ্রামের বাড়িতে নয়। এ কারনেও হয়তো মানুষ ভাবছে গ্রামাঞ্চলে কোনো করোনা নেই। অনেকেই বলে, কোথাও করোনা নেই। কিসের করোনা। এই যে, মানুষের মনে একটা অবিশ্বাস ও ভ্রান্ত ধারণা বিরাজ করছে। অথচ সেটা ভুল। সে ধারণা মন থেকে মুছে না যাওয়া পর্যন্ত মানুষ পুরোপুরি স্বাস্থ্যবিধি মানবে বলে বিশ্বাস হয়না। এটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ধারণা। তাই আমার মতের সাথে অনেকের হয়তো দ্বিমতও থাকতে পারে। 

অতীতে অনেক দুর্যোগ মহামারী কেটে গেছে কিন্তু এ ভাবে পৃথিবীর মানুষ এক ঘর হয়ে পড়েনি। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এ এক কঠিন বাস্তবতাকে না মানার কোনো উপায় নেই। কারণ সারা পৃথিবীতে করোনা ভাইরাস মানুষের শান্তি, আনন্দ উচ্ছ্বাস কেড়ে নিয়েছে। সংগত কারণে মানুষের মনে কোনো সুখ নেই, শান্তি নেই, শুধু আতঙ্ক। করোনার বাইরে দেশে এখন অন্য কোনো খবর নেই। এমন দুর্যোগ আমরা অতীতে দেখিনি। এ এক মহামারি দুর্যোগ কবে কখন শেষ হবে তা বলা মুশকিল। আমরা এখনো বিপদমুক্ত নই। কারণ বাংলাদেশে আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যু কখনো বাড়ছে আবার কখনো কমছে। আমাদের ভয় এবং উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে করোনার তৃতীয় ঢেউ নিয়ে। বিভিন্ন গবেষক, বিজ্ঞানী, বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থা সতর্ক বার্তা দিয়েছে এ ভাইরাস আরো অনেক দিন থাকবে। তাহলে আমাদের এ ভাইরাস নিয়েই বেঁচে থাকতে হবে।  কিন্তু আমাদের সতর্ক হওয়া ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কোনো বিকল্প নেই।  

ভাবতে অবাক লাগলেও এটাই সত্য যে, কোভিড-১৯ বা করোনা রহস্যময় এক অদৃশ্যময় জীবাণু থমকে দিয়েছে পুরোবিশ্বকে। লকডাউনে গোটা বিশ্ব আজ অচল। ব্যবসা বাণিজ্য, অর্থ উপার্জনের ক্ষেত্র, মানুষের কর্মস্থল আজ স্থবির করে দিয়েছে করোনা। নীতি নৈতিকতা মানুষ শিক্ষা থেকে অর্জন করে। সে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজ বন্ধ। লাখো শিক্ষার্থীর জীবন আজ অনিশ্চিত। ছোট ছোট নিষ্পাপ শিশুরাও শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছে না। করোনা ভাইরাসের প্রকোপে পৃথিবী অচল। আমাদের দেশেও করোনা নিয়ন্ত্রণে দফায় দফায় লকডাউন বাড়ানো হলেও কার্যকর কোনো সুফল মিলছে বলে মনে হয়না। কেননা দুর্বল লকডাউন দিয়ে শতভাগ কিছু আশা করা যায়না। তবুও এ লকডাউন আমরা মানছিনা। পোশাক শিল্পসহ প্রায় সবধরণের প্রতিষ্ঠান খোলা রয়েছে। ঘরে থাকলে জীবিকা সংকট, বাইরে গেলে জীবনের সংকট এমতাবস্থায় মানুষ জীবন বাঁচাতে ঝুঁকি নিয়ে রোজগার করছে। সরকার ইতিমধ্যে অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে লকডাউন শিথিল করেছেন। পোশাক কারখানা খুলেছে। উপচেপড়া শ্রমিক ও মানুষের ঢল। এভাবে চললে এবং স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব না মানলে করোনার তৃতীয় ঢেউ এর দাপট আরো বেড়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। কিন্তু অর্থনীতিকেতো সচল রাখতে হবে। নইলে রাষ্ট্রের গতি থমকে দাঁড়াবে এটাও ভাবতে হবে। তাই লকডাউন ছাড়াও অন্য কোনো উপায়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে মানুষের জীবন স্বাভাবিক রাখা যায় কি না তা গবেষক ও রাষ্ট্রকে ভাবা দরকার। তবে একদিন না একদিন এ ভাইরাস চলে যাবে কিন্তু তার ক্ষত চিহ্ন থাকবে এ পৃথিবীতে। করোনা পৃথিবীর ইতিহাসে, ইতিহাস হয়ে থাকবে। কেননা এ ভাইরাস স্থবির করে দিয়েছে পুরো বিশ্ব ও মানচিত্র। 

আমাদের গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষ করোনার প্রথম দিকে বলাবলি করছিল করোনা ভাইরাসে কোনো মুসলিম মারা যাবেনা বা আক্রান্ত হবেনা। কিন্তু বিজ্ঞান ও অতীত ইতিহাস বলে কোনো ব্যাধিরই ধর্ম নেই। করোনা ভাইরাস বা কোভিড-১৯ এর কোনো স্থান, কাল, পাত্রভেদ নেই। ধর্ম, বর্ণ নেই। কেননা করোনার হাত থেকে কোনো ধর্মের মানুষই রেহাই পাচ্ছেনা। কী হিন্দু, কী মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান। কোনো দেশই করোনা মুক্ত নয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে করোনার ভয়াবহ অবস্থা। সব ধর্মের মানুষ ও গোটা বিশ্ব আজ করোনার কাছে হার মেনেছে। করোনার হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে যার কারণে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ প্রায় নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু থেমে থেমে লকডাউন দেয়া বা লকডাউন শিথিল করা নিয়ে বিজ্ঞ মহলে নানান প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এতে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকবে কীভাবে? এমতাবস্থায় করোনার তৃতীয় ঢেউ এর সংক্রমণ ছড়িয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। তবে আমাদের দেশে আক্রান্ত ও মৃত্যু যেভাবে উঠানামা করছে তাতে এ পরিস্থিতিকে কোনোভাবেই ভালো বলা যাবেনা। তবে প্রধানমন্ত্রী করোনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন যা প্রশংসনীয়।

প্রত্যেক রোগ জীবাণুরই প্রতিষেধক বা ঔষধ রয়েছে। করোনা মহামারির প্রতিষেধক হিসাবে বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলো ও বিভিন্ন কোম্পানীগুরো এ ভাইরাসের প্রতিষেধক হিসাবে টিকা আবিষ্কার করেছে। তবে আশার কথা এই যে, প্রধানমন্ত্রীর দ্রুত যোগাযোগ, আন্তরিকতা ব্যবস্থাপনার কারণে বিশ্বের অনেক দেশের আগেই বাংলাদেশ টিকা পেয়েছে। মানুষের জীবন রক্ষায় বর্তমান বাংলাদেশে টিকাদান কর্মসূচি চলছে। টিকা একটি প্রতিষেধক মাত্র। টিকা নিলেই যে, স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবেনা এটা সঙ্গত নয়। তাই টিকা নেয়ার পরও আমাদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া বর্তমানে সবকিছু খোলা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি নিয়ে কম সমালোচনা হচ্ছেনা। ইতিমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ঘোষণা করেছেন, শিক্ষার্থীদের টিকা দেওয়ার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হবে। অপরদিকে শিক্ষামন্ত্রণালয় জুনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে চায়। স্কুল খোলা মানেই সব দায়িত্ব সরকারের।  যাহোক, আমাদের সুরক্ষায় আমাদেরই নজর দিতে হবে। স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া জরুরি। আমরা অধিকাংশই মাস্ক ব্যবহার করছিনা। নেই কোনো সামাজিক দূরত্ব, মানা হচ্ছেনা স্বাস্থ্যবিধি। এসব কারনেও করোনার তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। উর্ধ্বমূখী বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্যবিদ আবু জামিল ফয়সল। তাই সরকারকে এসব বিষয়ে কড়াকড়ি আরোপ ও নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। কিন্তু এটাও ঠিক যে, কোনো কঠিন ও জটিল বিষয় কোনো সরকারের পক্ষেই একাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয় যদি না জনগণ তাতে সম্পৃক্ত না হন। তাই আমাদের অবশ্যই বুঝতে হবে করোনা নিয়ে হেলাখেলা নয়। 

বৈশ্বিক মহামারি করোনায় কোটি কোটি মানুষ যেমন আক্রান্ত হচ্ছে তেমনি মারাও যাচ্ছে লাখ লাখ। কিন্তু মরণব্যাধি এ মহামারি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নির্দেশনাগুলো মানুষ মানছেনা। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা, স্বাস্থ্য সচেতন হওয়া, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা এ বিষয়গুলোর দিকে বাংলাদেশের মানুষের তেমন কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। করোনাকালে স্বাস্থ্য সচেতন সম্পর্কে আমাদের কোনো গুরুত্ব নেই। এই গুরুত্ব না থাকাটা অবশ্যই বিপজ্জনক। করোনায় যে, পরিবার বা স্বজনরা আক্রান্ত হয়েছে বা মৃত্যুবরণ করেছে শুধু তারাই অনুভব করতে পারে এ মৃত্যু কষ্ট শোক ও বেদনার। অন্যরা তা অনুধাবন করতে পারেনা। যত দিন যাচ্ছে সারা বিশ্বে করোনার ভয়াবহতা আশংকাজনকভাবে বাড়ছে।তবে আমাদের আশংকার বিষয় হচ্ছে, করোনার তৃতীয় ধাপের সংক্রমণ নিয়ে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত বিশ্বের অনেক দেশের মত বাংলাদেশেও করোনার তৃতীয় ঢেউ অনিবার্য। তাই জনগণকে স্বাস্থ্যবিধি মানা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিপক্ষকে আরো উদ্যোগী হতে হবে। তা নাহলে পরিণতি সামাল দেয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কারণ বিশ্বের অনেক দেশ এখন করোনার তৃতীয় বা চতুর্থ ঢেউ নিয়ে শঙ্কিত। অতীতেও দেখা গেছে, এ ধরনের মহামারি কমে গিয়ে আবারো বাড়ার ইতিহাস আছে। যদি তাই হয় তাহলে বিশেষজ্ঞদের মতে অতীত মহামারির ইতিহাস বলে তৃতীয় ধাপটি হবে ভয়াবহ। এ পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে সামাজিক দূরত্ব, স্বাস্থ্য সচেতন ও সতর্কতার উপর জোর দিয়েছে। পরিস্থিতির মোকাবেলায় কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের চিত্র একেবারেই উল্টো। যদি করোনার তৃতীয় ঢেউ বাস্তবেই বাংলাদেশে আঘাত হানে, তবে তা সামাল দেওয়া বড় কঠিন হবে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারনা। আমাদের মাঝে যে, স্বাস্থ্য সচেতনতাবোধ কমে গেছে তা বাড়াতে হবে।  
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট 
[email protected] 
০১৭১৯-৫৩৬২৩১