সাবধান, সাপ আতঙ্ক!

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:৫২ পিএম, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

আমির খসরু সেলিম:বর্ষাকাল শেষ হয়ে চলছে। এখনও কোথাও রিমঝিম বৃষ্টির সাথে গরম খিচুড়ি আর কবিত্বের চর্চা চলে। কোথাও বা আকস্মিক প্লাবনের সাথে জলাবদ্ধতার অস্থিরতার সাথে যুদ্ধ করতে হয়। জলমগ্ন, পিচ্ছিল পথ দিয়ে সতর্ক হয়ে পথ চলতে হয় এ সময়। পড়ে গিয়ে হাত-পা ভাঙ্গার সম্ভাবনা তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে মূর্তিমান আতঙ্কের মতো একটি নাম। সাপ ! দৈনিক পত্রিকার পাতা খুললেও চোখে পড়ে সাপের কামড়ে মৃত্যুর খবর। মরুভূমি, বনজঙ্গল, পাহাড়, শহর-গ্রাম, নদী-সমুদ্র অর্থাৎ পৃথিবীর প্রায় সব জায়গাতেই সাপের দেখা পাওয়া যায়। প্রাকৃতিক পরিবেশের আনুকুল্য থাকায় আমাদের দেশে সাপের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি।মাছ শিকারের সময় জেলেরা অহরহ সাপের মুখোমুখি হয়। মাছ ধরার জালে পেঁচিয়ে থাকা সাপটাকে সাহসী মানুষগুলো অনেক সময় লেজ ধরেই ছুঁড়ে ফেলে পানিতে। আবার বন্যার সময় মাচা, গাছ বা উঁচু ভবনে মানুষের পাশাপাশি আশ্রয় নেয় সাপও।
কিন্তু দেখা যায়, মানুষরা সাপ দেখামাত্র সেটাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে । আবার অসাবধানে সাপকে ভয় পাইয়ে দেবার জন্যেও ওর ছোঁবলের শিকার হতে হয়। সাপ যেহেতু চোখে ভাল দেখতে পায়না, তাই সামান্য নড়াচড়াকেই ওরা হুমকি বলে ধরে নিতে পারে। সবমিলিয়ে দেখা যায়, বর্ষাকাল এবং বর্ষাপরবর্তি জলাবদ্ধতার সময়ে সাপের ছোবলে প্রাণহানীর ঘটনা বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় বেশি জায়গা দখল করে পত্রিকার পাতায়।একটু ভেবে দেখুন, হাত-পা নেই এরকম একটি প্রাণী কোথায় বা কিভাবে বসবাস করতে পারে। নিজে তো বাসা তৈরি করার ক্ষমতা নেই। তাহলে কোনো গর্ত, গাছের কোটর, পরিত্যক্ত বা আবর্জনাময় কোনো জায়গায় এরা বসবাসের জায়গা তৈরি করে নেয়। ইঁদুরকে খেয়ে গিয়ে সেই ইঁদুরেরই বাসা যদি সাপের ভালো লেগে যায় তাহলে তো কথাই নেই। শেয়াল বা খরগোশের খুঁড়ে রাখা গর্তেও ওদের আপত্তি নেই। এসব গর্ত সাধারণত মাটিতে বা মাটির কাছাকাছি হয়ে থাকে। বর্ষাকাল বা বর্ষাপরবর্তি জলাবদ্ধতা হলে স্বাভাবিকভাবেই এসব গর্ত পানিতে ডুবে যায়। তখন সাপ বেচারা আর কি করে! স্বাচ্ছন্দের বাসাটি তখন ত্যাগ করে ‘রেফিউজি’ হয়ে যেতে হয়। 
এ অবস্থায় সাপরা বাধ্য হয়ে অনেক সময় মানুষের বাসস্থানে ঢুকে পড়ে। জায়গা করে নেয় মানুষের বাড়ির সেই জায়গাগুলিতে যেখানে চলাচল কম কিংবা যে আসবাবগুলিতে কম হাত দেয়া হয়। বিশেষ করে শুকনো খড়ি রাখার জায়গা, ‘স্টোররুমে’ যেখানে কম ব্যবহৃত জিনিসগুলি পড়ে থাকে এরকম জায়গা সাপদের কাছে প্রিয় হয়ে ওঠে। আরেকটু ভেবে দেখুন, সাপ শীতল রক্তের প্রাণী। তাই একটু বাড়তি উষ্ণতা পাওয়া যায়, এরকম জায়গাই ওদের বেশি পছন্দ।সাপ যেরকম চোখে ভাল দেখতে পারে না, তেমনি শোনার জন্যও ওদের কানের মতো কোনো অঙ্গ নেই। বরং বলা যায়, ওরা শব্দ ‘অনুভব’ করে। সাপের জিহ্বায় ‘জ্যাকবসন অর্গান’ নামে একটি ক্ষুদ্র অঙ্গ আছে। এর মাধ্যমে মাটি আর বাতাস থেকে গন্ধ গ্রহণ করতে পারে ওরা। সাপের কিছু বিশেষ অঙ্গ তাপ সনাক্ত করতে সাহায্য করে। এর সাহায্যে অন্ধকারে উষ্ণ রক্তবিশিষ্ট প্রাণীর উপস্থিতি টের পায় ওরা। 
স্বাভাবিক প্রাণী বা অন্যান্য সরী-সৃপদের মতো সাপের হাত-পায়ের মতো অঙ্গ না থাকায় ওদের এতো বিচিত্র আর  অস্বাভাবিক দেখায়। ওরা বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রাণী যেমন ইঁদুর, ঘাসফড়িং এসব শিকার করে মানুষের অনেক উপকার করে। জীবন হারানোর ঝুঁকি না থাকলে সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করেনা ওরা। ওদের খাবারের চাহিদাও খুব বেশি নয়। বেশির ভাগ সাপ সপ্তাহে মাত্র একবার খাবার গ্রহণ করে। বড় বড় সাপ মাসে মাত্র কয়েকবার খায়। শীতল রক্তের প্রাণীর বৈশিষ্ট অনুসারে অনেক সময় বড় আকারের সাপ কয়েকবছর পর্যন্ত না খেয়ে কাটাতে পারে। 
বেশিরভাগ সাপই বিষাক্ত নয়। নির্বিষ সাপের কামড়ের ফলে অনেকে ভয় পেয়ে হার্টফেল করে মারা যায়। আবার সাপ কামড়ালে উপযুক্ত চিকিৎসা না নিয়ে অনেকে ওঝা বা ঝাঁড়-ফুকের মতো অন্ধবিশ্বাসের আশ্রয় নিতে যান। ফলে আক্রান্ত মানুষটির মৃত্যু ত্বরান্বিত হতে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর ধরনটিও হয় অনেক যন্ত্রণাদায়ক। সাপেকাটা রোগির চিকিৎসার বিষয়ে বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানতে স্বনামধন্য চিকিৎসক ডাঃ সামির হোসেন মিশুর দ্বারস্থ হলাম। তিনি জানালেন, জেলা সদরের প্রধান হাসপাতালটিতে সাপেকাটা রোগির উপযুক্ত চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকে। সাপের বিষের প্রতিষেধক সংরক্ষণ করার প্রক্রিয়া বেশ জটিল। তাই উপজেলা পর্যায়ে এর প্রাপ্যতা কম।যেহেতু সাপেকাটার চিকিৎসার কিছুটা সীমাবদ্ধতা আছে, আবার এই প্রাণীটির সাথে আমাদের দেখা হয়ে যাবার সম্ভাবনাও থাকে, তাই সাবধানতাই আমাদের প্রধান অবলম্বন। বর্ষাকালে পথ চলার সময় কিংবা ঘর পরিষ্কার করার সময় শব্দ করুন। কাউকে সাপ কামড়ালে তাকে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। সাপ দেখলেই তাকে আক্রমণ করতে যাবেন না। মনে রাখবেন, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় ওদেরও ব্যাপক অবদান আছে।
লেখক : ছড়াকার, সংবাদকর্মি
০১৭১৭-৪৫২৩৯৬