দেশি ফল বেশি খাই, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াই

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৪:০১ পিএম, ২০ মে ২০২০

 আতাউর রহমান মিটন :বিশ্বজুড়ে করোনা সংক্রমণের বিস্তৃতি ঘটছেই। কিন্তু প্রকৃতি তো আর থেমে নেই। শুরু হয়েছে বাঙালির অন্যতম প্রিয়, রসালো ফলের মধু ঋতু বা মধু মাস। সাধারণতঃ বাংলা জ্যৈষ্ঠ মাসকে মধুমাস বলা হয়। কারণ এ মাসেই বাজারে আসতে শুরু করে ফলের রাজা আম, সুস্বাদু লিচু, আনারসসহ আরও নানা ধরনের ফল। আগামী ভাদ্র মাস পর্যন্ত বাজারে আরও নানা ধরনের ফল পাওয়া যাবে যার মধ্যে অন্যতম হলো কাঁঠাল, জাম, তাল, লটকন, জামরুল, পেয়ারা ইত্যাদি। মধুমাসকে ঘিরে আমাদের আত্মীয়তা সংস্কৃতিতেও মধুরতা দেখা যায়। এ সময় জামাইদের দাওয়াত করা হয়। এক বাড়ি থেকে অন্য বাড়িতে ডালা ভর্তি ফল পাঠিয়ে দেয়া, বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানে ফল দিয়ে আপ্যায়নসহ শুভেচ্ছা বিনিময় বা উপঢৌকন হিসেবেও আমাদের রসালো ফল বিশেষ করে সুস্বাদু আম ব্যবহার করতে দেখা যায়।

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে প্রায় এক কোটি ৩০ লাখ টন ফল উৎপাদিত হয়। এর প্রায় ৫০ শতাংশ বাজারে আসে জ্যৈষ্ঠ থেকে ভাদ্র মাসের মধ্যে। আমরা সকলেই জানি, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে পৃথিবীর প্রথম ১০টি দেশের মধ্যে অবস্থান করছে। বিশ্ব বাজারে বাংলাদেশের সুস্বাদু আমের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের লিচু’র স্বাদ বিশ্বে তুলনাহীন। কৃষি বিজ্ঞানীরা মনে করেন, বাংলাদেশ ফল উৎপাদনে আরও ভাল করার সম্ভাবনা রয়েছে। গত দুই দশকে দেশে ফল উৎপাদন বৃদ্ধির হার ১১ শতাংশের ওপরে হলেও তা অপর্যাপ্ত। বিশেষ করে পাশের দেশ থাইল্যান্ড বা ফিলিপাইন, ভিয়েতনামের সাথে তুলনা করলে আমাদের ফল ভান্ডারে আরও অনেক কিছু যোগ করার আছে। আমাদের ফল নিয়ে গবেষণা ও সম্প্রসারণের জন্য আরও কাজ করা দরকার। সম্প্রতি আমরা দেখছি আমাদের দেশে থাই পেয়ারা, আপেল কূল, ড্রাগন ফল ইত্যাদি চাষে আগ্রহ বাড়ছে। সামর্থ্যবান কৃষকেরা এই ধরনের চাষে এগিয়ে এলেও দেশের সকল পর্যায়ে ফল চাষ সম্প্রসারণে কারিগরী ও অন্যান্য সেবা প্রদান এখনও সীমিত বলেই কৃষকরা মনে করেন। বিশেষ করে তরুণ উদ্যোক্তাদের এ ধরনের উচ্চ মূল্যের ফল উৎপাদনে বেশি বেশি সম্পৃক্ত করা হলে এবং দেশেই ফল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ছোট ছোট প্লান্ট স্থাপনে সহায়তা দেয়া হলে তরুণ উদ্যোক্তারা এই খাতে এগিয়ে আসতে পারে।

একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, করোনাকালে দেশের অন্যান্য খাতের মত ফল চাষীরাও বিপাকে পড়েছেন এবং তারা দারুণভাবে ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে যদিও বলা হয়েছে ফল পরিবহনে সরকারের পক্ষ থেকে বিশেষ কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এ ছাড়াও যে সকল প্রক্রিয়াজাতকরণ কোম্পানি ফলের বড় ক্রেতা তাদেরকে বেশি বেশি করে ফল কেনার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে অনুরোধ করা হবে। পাশাপাশি খাদ্য সহায়তা কার্যক্রমেও যাতে ফল অন্তর্ভূক্ত করা হয় সে ব্যাপারেও অনুরোধ করা হচ্ছে। এত কিছু সত্ত্বেও বাজারে ফলের ক্রেতা কম। ঢাকার বাজার দিয়ে তো সবকিছু বিবেচনা করা যাবে না। দেশের মানুষের হাতে নগদ  টাকা সরবরাহ না থাকায় এবং মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা দারুণভাবে শঙ্কায় থাকায় মানুষ এখন খাদ্যের পেছনে ব্যয় কমিয়ে দিয়েছে। খুব প্রয়োজন না হলে শখ করে বাজার থেকে আম-জাম-লিচু কিনে খাওয়ার প্রবণতা এবার কমে গেছে। এমতাবস্থায়, চাহিদা কম থাকায় বড় বড় ফল বিক্রেতারাও আর আগের মত করে বাগান কেনা বা ট্রাকে ট্রাকে ফল কিনছেন না। এতে করে দেশের বাণিজ্যিক ফল চাষীরা বিরাট ক্ষতির সম্মুখিন হয়েছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য অবশ্য সরকার বিশেষ প্রণোদনা সহায়তা ঘোষণা করেছে। করোনার বিস্তৃতির প্রেক্ষিতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কৃষির জন্য যে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করেছেন তাতে ফল চাষীরাও অন্তর্ভূক্ত। কিন্তু প্রণোদনার অর্থ পাবার ব্যাপারে ব্যাংক ব্যবস্থার দৌরাত্ম ও জটিলতার বাধা পেরিয়ে প্রান্তিক কৃষকেরা প্রণোদনার অর্থ সময়মত হাতে পাবে কিনা সেই অনিশ্চয়তা থেইে যাচ্ছে।  

করোনা আতঙ্কে দেশের মানুষ আজ বিপর্যস্ত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা ছোঁয়াচে হলেও একটু সচেতন হলে করোনার ভয় জয় করা অসম্ভব নয়। করোনা ভাইরাস এর বিস্তৃতি ঘটছে। কম-বেশি সকলেই ঝুঁকিতে আছি। ‘আমি করোনায় সংক্রমিত হবো না’, এই নিশ্চয়তা দেয়া সম্ভব নয়। কিন্তু সম্ভবতঃ এটা বলা সম্ভব যে আমি আমার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে করোনাকে মোকাবেলা করতে পারি। বিজ্ঞানীরা ইতোমধ্যে বলেছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাদের মধ্যে বেশি এবং যারা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও ভিটামিন সি, ডি, ই, জিংক ইত্যাদি সমৃদ্ধ খাবার বেশি করে খাবেন তারা অপেক্ষাকৃত সহজে করোনাকে মোকাবেলা করতে পারবেন। আফ্রিকার একটি দেশ মাদাগাস্কার এর প্রেসিডেন্ট আন্দ্রে রাজোয়েলিনা দাবি করেছেন, তাদের দেশের একটি ভেষজ ‘আর্টেমেশিয়া’ থেকে তৈরী ওষুধ করোনা প্রতিরোধ ও করোনামুক্তিতে কাজ করছে। এদিকে, বায়োকেমিস্ট রাজাগোপাল চট্টোপাধ্যায় দাবি করেছেন, আমাদের ত্রিফলা (আমলকি, হরিতকি ও বহেড়া) মিশ্রণ শরীরে করোনার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সহায়তা করে। তিনি আরও বলেছেন, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মজবুত করতে নিয়মিত আমলকি, হরিতকি, বহেড়া, আমড়া ইত্যাদি নিয়মিত খাওয়া দরকার। পাশাপাশি বেদানা বা ডালিম, ধনে পাতা, পুদিনা, ঘৃতকুমারী ইত্যাদি দেশি ফল ও ভেষজ নিয়মিত খেলে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রায় সব ধরনের রোগ মোকাবেলায় মানুষের সক্ষমতা বাড়তে পারে।

মহান ¯্রষ্টা মানুষ সৃষ্টির আগে প্রকৃতি সৃষ্টি করেছেন। মানুষের আরোগ্য প্রকৃতির মধ্যেই রয়েছে কিন্তু মানুষ সেটা জানে না বা মানে না। অবহেলা ও অনাদরে পড়ে থাকা বাংলাদেশের বহু ভেষজ, বহু ফল ও লতা-পাতার ভেতরে যে কত অসাধারণ সব গুণ বা ক্ষমতা লুকিয়ে রয়েছে তা আমরা জানি না। যেমন আমরা জানি না আমাদের সমপরিমাণ সজনে পাতায় রয়েছে কমলার চেয়ে সাতগুণ বেশি ভিটামিন সি, কলার চেয়ে তিনগুণ বেশি পটাশিয়াম, গাজরের চেয়ে চারগুণ বেশি ভিটামিন এ, দুধের চেয়ে চারগুণ বেশি ক্যালসিয়াম এবং দইয়ের চেয়ে দ্বিগুণ বেশি আমিষ রয়েছে। জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ বিশ্বের বহু দেশেই সজনে পাতার চা খাওয়ার প্রচলন বাড়ছে। আমাদের দেশে সজনে সব্জি হিসেবে জনপ্রিয় হলেও সজনে পাতা খাওয়ার অভ্যাস খুব বেশি দেখা যায় না।

যা হোক, মধুমাসে আমরা যেন বেশি বেশি দেশি ফল খাই সেই অনুরোধটা আমি সকলের কাছে করছি। আমাদের দেশে খাদ্যমান বা গুণ দেখে খাবার খাওয়ার অভ্যাস নাই বললেই চলে। শিক্ষিত পরিবারগুলোও খাবারের গুণ নয়, এর বাহ্যিক চেহারা এবং বিজ্ঞাপনের ভাষা শুনে খাবার নির্বাচন করে। আর তাদের দেখে অনুকরণ করে সমাজের সাধারণ পরিবারগুলো। যেমন আমাদের গ্রামাঞ্চলেও এখন অতিথি আপ্যায়নে কোমল পানীয় ব্যবহার করা হয় অথচ আগে ডাব বা লেবু’র শরবত বা মৌসুমী ফলের শরবত দিয়ে অতিথি আপ্যায়ন করা হতো। আমরা এখন ফ্রেস খাবারের চাইতে প্যাকেটজাত বা ফ্রিজে দীর্ঘদিন ধরে রাখা খাবারগুলো খাই। এর ফলে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তো কমছেই সাথে সাথে বাড়ছে অসংক্রামক ব্যাধিগুলো।
কথায় আছে চিনলে জরি, না চিনলে জঙ্গলের খড়ি। আমাদের দেশি ফলে পুষ্টি বেশি অথচ আমাদের নজর বিদেশি ফলের দিকে। আমাদের প্রকৃতিতেই যে রোগ নিরাময়ের কত শত-হাজার উপায় রয়েছে তা না জেনে আমরা ছুটে চলেছি কোম্পানীর ওষুধের দিকে। বিজ্ঞানীরা যে বারবার করে বলছেন, রোগ প্রতিরোধ রোগের চিকিৎসার চেয়ে উত্তম তাহলে আমরা প্রতিরোধের পথগুলো ছেড়ে চিকিৎসার কথা বেশি করে ভাবছি কেন? আমাদের তো জানা দরকার কোন খাবারে কী আছে। আমরা প্রকৃতি থেকে নিম গাছ কমিয়ে ফেলছি আর বাড়াচ্ছি কথার তিক্ততা। এটা কী ভাল কথা? আমরা একটু কষ্ট করে জানার চেষ্টা করলে আমাদের হাতের কাছে থাকা সহজ উপায়গুলো অবলম্বন করে খুব সহজেই ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়াজনিত অনেক ক্ষতিকারক রোগ থেকে নিজেকে ও পরিবারের সবাইকে রক্ষা করতে পারি।

অজ্ঞতা ও উদাসীনতা যে কেবল আমাদের স্বাস্থ্য সমস্যাকে জটিল করছে তা নয় বরং আমাদের দারিদ্র্য ও অপুষ্টি সমস্যাকেও প্রকট করছে। অপুষ্টির প্রভাবে আমাদের জাতীয় মেধার সামষ্টিক বিকাশ কম হচ্ছে। তাই আমাদের বেশি বেশি করে জানা প্রয়োজন আমাদের খাবার সম্পর্কে। আমাদের রান্নাঘরে নিত্য ব্যবহৃত উপকরণগুলির মধ্যে কি ধরনের রোগ প্রতিরোধ বা কি কি অসুখের সমাধান রয়েছে তা জানলে আমরা সকলেই লাভবান হবো। আমাদের রসুন, হলুদ, দারুচিনি, আদা, লবঙ্গ, এলাচ, মেথি, জিরা, মহুরি, ইত্যাদি কোনটা কিভাবে আমাদের রক্ষা করে সেটা জানলে আমরা এই খাবারগুলোর প্রতি আরও বেশি বেশি আগ্রহী হবো। করোনা ভাইরাস নিয়ে চারিদিকে বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। নানাজনের নানামত রয়েছে। আমি সেই বিতর্কে যাচ্ছি না। আমি আবহমানকাল থেকে আমাদের দেশে খাবারের মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধের যে ধরনের সুরক্ষা কৌশল ব্যবহৃত হয়েছে তার আলোকে এই মধুমাসে সকলকে বেশি করে দেশি ফল খাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী করার চেষ্টা করছি। ফল খেলে কোন ক্ষতি হবে না। মৌসুমী ফল বেশি করে খান। আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ান।

বিজ্ঞানীরা করোনা ভাইরাসের টিকা আবিষ্কার, সহজতম চিকিৎসার উপায় ইত্যাদি নিয়ে গবেষণা করছেন। আমরা আশাকরি খুব শীঘ্রই বিশ্ব আলোর মুখ দেখবে। আমাদের দেশে ইতোমধ্যে কোন কোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক করোনা চিকিৎসায় সফল হওয়ার দাবি করেছেন যা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। আমরা চাই এর বিস্তার হোক। তবে বসে তো থাকা যাবে না। হাতের কাছে যা আছে তাই নিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। লড়াই করতে হবে আমাদের সামর্থ্যরে মধ্যে থেকেই। আসুন আমরা আমাদের নিজেদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাই।

ফলের মৌসুমে আমরা যেন বেশি করে ফল খাই এটাই আমার অনুরোধ। আর সরকারের কাছে বিশেষভাবে চাওয়া যেন ফল উৎপাদকদের ক্ষতি চিহ্নিত করে তাদের যথাযথ সহায়তা দেয়া হয়। করার আছে অনেক কিছু। রসালো ফলের মাসে আমাদের মধ্যে সম্পর্কের তিক্ততা, চিন্তার জড়ত্ব কমিয়ে যদি আমরা সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসি এবং মানুষকে সত্যিকারের ভালবেসে তাদের কল্যাণের জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নেই তাহলে কোন বাধাই আমাদের সামনে অজেয় থাকবে না। কবির মত করে আমরা আবারও বলব, ‘আমরা টুটাব তিমির রাত, বাধার বিন্ধ্যাচল’।
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯