ওযু করার সুন্নাত তরীকা ও ফযীলত

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৪৭ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

আলহাজ¦ হাফেজ মাও: মুহাম্মদ আজিজুল হক: ওযু আরম্ভকারীর জন্য জগ, বদনা, লোটা  ইত্যাদিতে পানি নিয়ে কিবলার দিকে মুখ করে কোনো উঁচু জায়গায় বসা, যাতে পানির ছিঁটা শরীরে না পড়ে। এরপর ওযুর নিয়ত করা। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি মনকে রুজু করে কি জন্য ওযু করা হচ্ছে সেদিকে খেয়াল করা। ওযুর শুরুতে বিসমিল্লাহ বলা। হাদিসে আছে, ‘বিসমিল্লাহ ওয়াল হামদুলিল্লাহ’ পড়ে ওযু করলে যতক্ষণ ওই ওযু থাকবে ততক্ষণ ফেরেশতারা তার নামে অনবরত সাওয়াব লিখতে থাকবে। (বুখারী) ওযুর অঙ্গগুলো ডানদিক থেকে ধোয়া শুরু করা। সর্বপ্রথম উভয় হাত কব্জি পর্যন্ত তিনবার ধোয়া। তিনবার কুলি করা। মিসওয়াক করা। মিসওয়াক না থাকলে আঙ্গুল দিয়ে দাঁত পরিষ্কার করা। রোজাদার না হলে গরগরা করে খুব ভালোভাবে কুলি করা। তবে রোজাদার এরূপ করবে না। কারণ, হয়তো কিছু পানি গলার ভিতরে চলে যেতে পারে। তারপর তিনবার নাকে পানি দেয়া এবং বাম হাত দ্বারা নাক পরিষ্কার করা। এরপর উভয় হাতে মুখ ধোয়া এবং মুখমন্ডল ধোয়ার সময় দাঁড়ি খেলাল করা। এমনভাবে মুখমন্ডল ধোয়া, যাতে মাথার চুল থেকে শুরু করে চিবুকের নিচ পর্যন্ত এবং এক কানের লতি থেকে অপর কানের লতি পর্যন্ত সর্বত্র পানি পৌঁছে এবং উভয় ভ্রƒর নিচেও পানি পৌঁছে, কোথাও শুষ্ক না থাকে। অতঃপর ডান হাত ও বাম হাত কনুই সহকারে তিনবার করে ধোয়া এবং এক হাতের আঙ্গুল অপর হাতের আঙ্গুলের মাঝে প্রবিষ্ট করে খেলাল করা, আংটি, রিং, চুড়ি ইত্যাদি থাকলে নেড়ে নেয়া, যাতে বিন্দু মাত্র শুষ্ক না থাকে। একবার পূর্ণ মাথা মাসাহ করা।

তারপর কান মাসাহ করা। উল্লেখ্য, কানের ছিদ্রের মধ্যে কনিষ্ঠ আঙ্গুল দ্বারা এবং কানের ভিতরের অংশ শাহাদত আঙ্গুল দ্বারা আর কানের উপরি অংশ বৃদ্ধাঙ্গুলি দ্বারা মাসাহ করা, তারপর উভয় হাতের আঙ্গুলগুলোর পিঠ দ্বারা গর্দান তথা ঘাড় মাসাহ করা কিন্তু গলা মাসাহ করা নিষিদ্ধ। এরপর ডান পা তিনবার এমনিভাবে বাম পাও তিনবার টাখনু সহকারে ধোয়া এবং বাম হাতের কনিষ্ঠাঙ্গুলি দিয়ে পায়ের আঙ্গুল খেলাল করা। ডান পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুলি থেকে খেলাল শুরু করে বাম পায়ের কনিষ্ঠাঙ্গুলিতে খেলাল শেষ করা। ওযুর সবকটি অঙ্গ ডলে ডলে ধোয়া। যাতে সামান্য অংশও শুকনো না থাকে। ওযুর মাঝে দেরি না করা, অর্থাৎ এক অঙ্গ ধোয়া শেষ করে অন্য অঙ্গ ধোয়া। তারতীবের সাথে ওযু করা। তথা উপরে বর্ণিত নিয়মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। ওযুর মাঝে এই দুআ পড়া, “আল্লাহুম্মাগফিরলী যামবী ওয়াসসিলী ফী দারী ওয়া বারিক লী ফী রিযকী”। ওযু শেষ করে কালেমায়ে শাহাদত পড়া।

অতঃপর এই দুআ পড়া, “আল্লাহুম্মাজ আলনী মিনাত তাওয়া বীনা ওয়াজ আলনী মিনাল মুতাত্বাহ হিরীন”। ওযুর বেঁচে যাওয়া অতিরিক্ত পানি দাঁড়িয়ে পান করা। ওযুর শেষে গামছা, তোয়ালে ইত্যাদি ব্যবহার করা। এটাই হলো ওযুর সুন্নাত তরীকা বা পদ্ধতি। ওযুর ফযীলত সম্পর্কে হযরত আবু হুরাইরা (রাঃ) থেকে হাদিসে বর্ণিত, একদিন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন, আমি কি তোমাদের এমন কিছু আমল সম্পর্কে বলব, যেগুলোর বরকতে আল্লাহ তায়ালা গোনাহসমূহ মুছে দেন এবং মর্যাদা বৃদ্ধি করেন? উপস্থিত সাহাবায়ে কেরাম বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! অবশ্যই বলুন। তখন রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেন, (১) কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে ওযু করা। (২) মসজিদের দিকে অধিক কদম দেয়া। (৩) এবং এক ওয়াক্ত নামায শেষ করার পর অপর নামাযের প্রতীক্ষায় থাকা।

আর এটাই হলো ‘রেবাত’ (মুসলিম)। ‘এটাই বেরাত’ তথা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ। হাদিসে ব্যাখ্যাকারগণের মতে এখানে শত্রু বলে নফস  শয়তানকে বুঝানো হয়েছে। কেননা ওযু ঠিকমতো করে নামায আদায় করা নফস ও শয়তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার শামিল। দ্বিতীয়ত হতে পারে যুদ্ধে শত্রুর বিরুদ্ধে নিজের জীবনবাজি রেখে যে সাওয়াব পাওয়া যায়, ভালোভাবে ওযু করে নামাযের প্রস্তুতি গ্রহণের মধ্যেও সে সাওয়াব রয়েছে। হযরত উসমান (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে ওযু করে তার গোনাহসমূহ তার শরীর থেকে বের হয়ে যায়, এমনকি তার নখের নিচে থেকেও বের হয়ে যায়। (বুখারী ও মুসলিম) ওজু অবস্থায় মৃত ব্যক্তি শহীদী মর্যাদা লাভ করে। এক ব্যক্তি নবীজির খেদমতে এসে আরজ করল, ইয়া রাসূলাল্লাহ! হযরত নূহ (আঃ) থেকে আপনার উম্মত পর্যন্ত এত উম্মতের মধ্যে আপনার উম্মতকে কিরূপে চিনে নিবেন? জবাবে বললেন, ঈমানদার বান্দার হাত-পায়ের যেটুকু পর্যন্ত ওযুর পানি পৌঁছবে কিয়ামতের দিন তাকে সে পর্যন্ত নূরের অলঙ্কার দ্বারা বিভূষিত করে দেয়া হবে অর্থাৎ তখন ওযুর বরকতে তাদের চেহারা ও হাত-পা উজ্জলভাবে চমকাতে থাকবে। অন্য কেহ এরূপ হবে না। (মিশকাত)। 
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক-ইসলামী গবেষক 
০১৭৩৪-৭১৮৩৬০