বৃদ্ধাশ্রমকে ‘না’ বলুন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৩৩ পিএম, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২১

আবু জাফর সিদ্দিকী: পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের সবচেয়ে আপনজন হলো পিতামাতা। আর একমাত্র পিতামাতাই স্বার্থছাড়া ভালবাসে। তবে বিষয়টি বর্তমানে কেমন জানি রূপ নিয়েছে। পৃথিবীতে প্রায় বেশিরভাগ পরিবারে শেষ বয়সে অবহেলার শিকার হন বাবা-মা। কিন্তু কেন এই অবহেলা, কেন তাদের হেয় করা? অতি স্নেহ-আদরে যাদের বড় করে তোলেন, তারাই কেন তাদের দুঃসময়ে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা দেখান। নিজে কষ্ট করে যে বাবা তার ছেলের খরচ চালিয়ে যান দিনের পর দিন, সেটাই কি ছিল তার অপরাধ? বছরের পর বছর যে বাবা পুরনো শার্ট, প্যান্ট আর লুঙ্গি পরে সন্তানের যাবতীয় খরচ চালিয়ে যেতেন, নিজে না খেয়ে সন্তানকে টাকা পাঠাতেন, যাতে সে অন্য বন্ধুদের কাছে ছোট না হয়, সেটা হয়তো ছিল বাবার অপরাধ। মা-বাবার কষ্টার্জিত অর্থ দিয়ে খেয়ে পরে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদেরকে ভুলে যাচ্ছি আমরা। 
সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের সর্বনি¤œ স্তর এটি। সমাজ বা ধর্ম কেউ আমাদেরকে এটা শিক্ষা দেয়না। নিজে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে একটু ভালো থাকার জন্য মা-বাবার ঠাঁই করে দিচ্ছি বৃদ্ধাশ্রমে। নিজেরাই রেখে আসছি বৃদ্ধাশ্রমে অথবা তাদের সাথে দুর্ব্যবহার করছি যাতে তারাই বৃদ্ধাশ্রমে চলে যায়। ইসলাম মা-বাবাকে অনেক অনেক সম্মান ও মর্যাদা দিয়েছেন। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে এ সংক্রান্ত বিষদ আলোচনা রয়েছে। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তোমরা আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও ইবাদত কর না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার কর।’ (বনি ইসরাইল : ২৩)। অন্যত্র এসেছে, ‘আল্লাহ তোমাদেরকে তোমাদের মায়ের গর্ভ থেকে বের করেছেন। তোমরা কিছুই জানতে না। তিনি তোমাদের কর্ণ, চক্ষু ও অন্তর দিয়েছেন, যাতে তোমরা অনুগ্রহ স্বীকার কর। ’ (সূরা নাহল : ৭৮)।

হাদিসে আছে, এক সাহাবি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে প্রশ্ন করলেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজ কোনটি?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘সময় মতো নামাজ পড়া।’ তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘এরপর কোনটি?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করা।’ তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, ‘এরপর কোনটি?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করা।’ (বুখারি : ১/৭৬)। একদিন এক লোক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে হাজির হয়ে আরজ করল, হে আল্লাহর রাসূল! আমার কাছে সবচেয়ে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিকারী কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ সে লোকটি আবারও প্রশ্ন করল, তারপর কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা।’ লোকটি আবারও জিজ্ঞেস করল, তারপর কে? তিনি বললেন, তারপর তোমার ‘পিতা’ (বুখারি : ৫৯৭১)।
মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহারে রয়েছে অফুরন্ত কল্যাণ। ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেন, ‘পিতা-মাতার সন্তুষ্টিতেই আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং পিতা-মাতার অসন্তুষ্টিতে আল্লাহর অসন্তুষ্টি লুকানো।’ (তিরমিজি : ২/১২)। অন্য হাদিসে আছে, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘সন্তানের ওপর পিতা-মাতার দায়িত্ব কী?’ রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন, ‘তারা উভয়ে তোমার জান্নাত অথবা জাহান্নাম।’ (ইবনে মাজাহ : ২৬০)। হজরত আসমা বিনতে আবু বকর (রা.) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার মুশরিক মা আমার কাছে এসেছে। আমি কি তার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করব? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, সদ্ব্যবহার কর।’ (বুখারি : ৩১৮৩)। 
বৃদ্ধ বয়সে মানুষ অসহায় হয়ে পড়ে। তারা শিশুর মত হয়ে যায়। ছোট শিশুরা যেমন ভাল-মন্দ বুঝে না ঠিক তেমনই বৃদ্ধরাও কিছু বুঝে না। তবে সে পরিস্থিতিতে মেজাজ গরম না করে তাদের সাথে ধীরস্থিরভাবে কথা বলতে হবে। কেননা আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন কিছু না বুঝলে তাদেরকে বার বার জিজ্ঞেস করতাম। তারা তখন বিরক্ত না হয়ে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দিতেন। বৃদ্ধ বয়সে মানুষ তার সন্তান, নাতি-নাতনিদের সঙ্গে একত্রে থাকতে চান। তাদের সঙ্গে জীবনের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নিতে চান। 
সারাজীবনের কর্মব্যস্ত সময়ের পর অবসরে তাদের একমাত্র অবলম্বন এই আনন্দটুকুই। এর চেয়ে বেশি কিছু চাওয়ার থাকে না। জীবন-যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় মা-বাবা ব্যয় করেন সন্তানদের ভাল ও সুখি রাখার জন্য। কোনো মা-বাবার ঠিকানা বৃদ্ধাশ্রমে যেন না হয় সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে। আমাদের সবার তাদের জন্য তৈরি করতে হবে একটা নিরাপদ ও সুন্দর পৃথিবী। এ ক্ষেত্রে সরকারকেও আইনের মাধ্যমে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মাকে সেবা যতœ করার পরিবর্তে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে যেন হাফ ছেড়ে বাঁচার চেষ্টা! সবাই মিলে বৃদ্ধাশ্রমকে ‘না’ বলার এটাই যেন প্রকৃত সময়।
লেখক ঃ প্রাবন্ধিক
[email protected] 
০১৭৬৪-৯৯৩০৯৬