চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এবং আমাদের দায়

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৭:৪৫ পিএম, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২১

অলোক আচার্য : আজকাল নানাভাবে রাস্তায় চলতে মানুষের দুর্ঘটনার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পেয়েছে। জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে। এসব ঝুঁকি বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে আমাদের গড়ে ওঠা মানসিকতা। যে ঘটনাগুলো একটু সচেতন হলেই রোধ করা সম্ভব ছিল সেই দুর্ঘটনাগুলো রোধ করা যাচ্ছে না। এর মধ্যে একটি হলো চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ এবং তাতে ঘটে চলা দুর্ঘটনা আমাদের মনের বিবেককে প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়। আমরা সঠিক শিক্ষা দিতে পারছি না। যারা এই কাজটি করছে তাদের বোঝাতে ব্যর্থ যে এর ফলে ট্রেনের এবং কোনো মানুষের ক্ষতি হতে পারে যা উচিত নয়। এটি একটি শিক্ষা যা পরিবার এবং সমাজ থেকেই পাওয়া উচিত। অন্যের ক্ষতি করা থেকে বিরত থাকার শিক্ষা এই প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার ঘাটতি রয়েছে। চলন্ত ট্রেনে পাথর বা ঢিল ছুড়ে মারায় কখনো কেউ আহত হয় আবার কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয় ট্রেনের কোনো অংশ। এ কোন শিক্ষা আমাদের? অন্যের ক্ষতি করার মানসিকতা এই ঘটনার পেছনের কারণ। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। কিন্তু এসবের পরেও এ ঘটনা থামছে না। আমাদের একজনের কাছে যা খেলা অন্যজনের কাছে তা বিপদের কারণ হতে পারে। ক্ষেত্র বিশেষে তা বড় কোনো ক্ষতির কারণও হতে পারে। আমরা বুঝে অথবা না বুঝে অন্যকে বিপদে ফেলার মতো কাজ করি। ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে  যিধঃ রং ঢ়ষধু ঃড় ঃযব পধঃ রং ফবধঃয ঃড় ঃযব ৎধঃ। সম্প্রতি নীলফামারীরর সৈয়দপুরে চলন্ত ট্রেনে ছোড়া পাথরের আঘাতে আজমির ইসলাম নামে পাঁচ বছরের এক শিশু চোখ হারাতে বসেছে। 

এই চলন্ত ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। আবার এই ঘটনাই যে শেষ সেটাও বলা যায় না। এই যে চলন্ত ট্রেনে পাথর বা অন্য পদার্থ ছুঁড়ে মারার মতো বদ অভ্যাস সেটা যে কতটা ক্ষতিকর হতে পারে তা কি সেই ব্যক্তি অনুধাবন করতে পারে? এই নিরপরাধ শিশুটির চোখের কোনো ক্ষতি হলে তার দায় কার? এ ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছুঁড়লে যে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে এই জ্ঞানটুকু সবারই আছে। তা জানা সত্ত্বেও এ কাজটি করছে কেউ। একটি গল্প আছে। এক পুকুরে বাস করতো কয়েকটি ব্যাঙ। একদিন সেই পুকুরের তীরে দাঁড়িয়ে একটি শিশু সেখানে পাথর ছুঁড়ে মারছিল। এতে কয়েকটি ব্যাঙ মারা যায়। শেষ পর্যন্ত একটি ব্যাঙ উঠে এসে বালকটিকে জিজ্ঞেস করে কেন সে এভাবে পাথর ছুঁড়ে মারছে? জবাবে বালকটি বলে যে সে খেলা করছে। তখন ব্যাঙটি জানায় যে তোমার জন্য যা খেলা আমাদের জন্য তা মৃত্যু। এই গল্পটি আমাদের এক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আমরা প্রায়ই সচেতনভাবেই যেসব কাজ করি তা অন্যের জীবনের ঝুঁকি তৈরি করে। রাস্তায় কলা খেয়ে তার খোসাটি রাস্তায় ফেলে রাখি। একবারও ভাবি না যে এতে যে কারও দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমনকি নিজেরও।

 এটা বোঝা যায় যখন নিজের পরিবারের কেউ এ ধরনের ঘটনায় আহত হয়। আমাদের অভ্যাস যা সমাজটাকে আরও সুন্দর ও স্বাভাবিক করতে পারে সেই অভ্যাসগুলো রপ্ত করার বিপরীতে বদ অভ্যাসগুলো রপ্ত করছি। এই অভ্যাসের বিষয়টি একজন থেকে অন্যজনে প্রবাহিত হচ্ছে। যদি কেউ রাস্তায় নোংরা ফেলে যায় তাহলে অপরজনও সঠিক স্থানে ময়লা না ফেলে সেখানেই ফেলে যাবে। অর্থাৎ তার কাজ যদি অন্যায় না হয় তবে আমি করলে অন্যায় হবে কেন? ঠিক এই নিচু মানসিকতাই সমাজ অধঃপতনের কারণ। এ অভ্যাসগুলো আমাদের কাছ থেকেই এই প্রজন্ম শিখছে। তাদের বদলাতে হবে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চল জোনে এক বছরের মধ্যে ৭৪ টি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটেছে। ২০২০ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত পশ্চিম রেলের বিভিন্ন রুটে এসব পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। জানা যায়, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারা দেশের ২০ জেলার ৭০টি স্থানকে পাথর নিক্ষেপে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ ধরনের সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে হলে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। এলাকাগুলোর আশেপাশের সবাইকে এই সচেতনতার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এরাই এই কাজটি করে। এরা অবুঝ। এদের বোঝাতে হবে। পরিবার থেকেও এই কাজটি করা যেতে পারে। 
 লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলাম লেখক
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬