গ্রামের মানুষের চিকিৎসা প্রসঙ্গে

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৯:৪৯ পিএম, ১১ মে ২০২১

রবিউল ইসলাম রবীন: অপ্রিয় হলেও সত্য যে গ্রাম বা মফস্বলে বিভিন্ন পেশার অনেক মানুষ থাকতে বা দায়িত্ব পালন করতে চায় না। বিশেষ করে ’বিখ্যাত বা সেলিব্রেটিরা’ তো নয়। ’গ্রামে থাকা সম্ভব নয়’- এই মনোভাব নিয়ে এক দৌড়ে কেউ কেউ ঢাকা যেতে চান। রাজনীতিবিদরাও কালে ভদ্রে গ্রামে আসেন। ঈদ বা পূজা পার্বণ ছাড়া তাঁরা রাজধানী ছাড়েন না। আর আসেন নির্বাচনের সময়। বাংলাদেশের অনেক কিছুই রাজধানী ঘিরে। উন্নত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা সহ অনেক উন্নত কিছু বলতে গেলে সেখানেই। সমস্ত ক্ষেত্রে বিখ্যাত হওয়ার প্রায় একমাত্র ঠিকানা রাজধানী। অনেকের মনে করে রাজধানীতে না থাকলে ব্যাপক অর্থ উপার্জন হয় না। বিখ্যাত হওয়া যায় না। সেলিব্রেটি হওয়া যায় না। আরাম আয়েসের কথা নাই বা তুললাম। সুতরাং রাজধানী ছাড়া যাবে না। কোন কারণে চাকরি ক্ষেত্রে মফস্বলে যদি পোষ্টিং হয়েই যায়, কিভাবে ছয় বা এক বছরের মধ্যে পূর্বের অবস্থানে অর্থাৎ রাজধানীতে ফিরে আসা যায়, সেটাই সেই ব্যক্তির একমাত্র ধ্যান জ্ঞান হয়ে যায়। তাহলে গ্রামের বা মফস্বলের মানুষগুলোর কী হবে? তাঁদের চিকিৎসার দায়িত্ব কারা নেবেন?  উপজেলা  বা ইউনিয়ন পর্যায়ে সরকারি চিকিৎসা ব্যবস্থা বলতে এখনো  ২০ বা ৫০ শয্যার হাসপাতাল বা উপস্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই একমাত্র ভরসা। কিন্তু বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় আমরা প্রায়ই দেখতে পাই সেখানে  চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মচারির সংকট। অধিকাংশ হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নেই, এক্স-রে মেসিন থাকলেও হয়তো নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বছরের পর বছর। সর্বোপরি চিকিৎসক সংকটই প্রকট। এইসব হাসপাতালগুলিতে রোগীর তুলনায় বেডের সংখ্যা কম। ফলে হাসপাতালের বারান্দায় বা মেঝেতে অনেক রোগীদের ঠিকানা হয়ে যায়। অধিকাংশ ওষুধ এসব হাসপাতালে বাইরে থেকে কিনতে হয়।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক চিকিৎসা ও জনস্বাস্থ্য সাময়িকী ল্যানসেট। দ্য ল্যানসেট গ্লোবাল হেলথ কমিশন অন হাই কোয়ালিটি হেলথ সিষ্টেমস নি¤œ ও মধ্যম আয়ের স্বাস্থ্য বিষয়ে গবেষণা করছেন। কমিশন বলছে, ক্যানসার, জন্মগত ত্রুটি, মানসিক রোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের জটিলতা থেকে মৃত্যু ঠেকাতে সেবার মান বৃদ্ধির পাশাপাশি সেবা প্রতিষ্ঠানের ব্যবহার বড়ানোর ওপর বিশেষ জোর দিতে হবে। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে অসন্তুষ্টি আছে। চার বছর আগে দেশের সরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান নিয়ে এক জরিপ প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলিতে মৌলিক স্বাস্থ্য পরীক্ষার দক্ষতা খুবই নি¤œ মানের। ১০টির মধ্যে মাত্র একটি হাসপাতালে রক্তের হিমোগ্লোবিন পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ হেলথ ফ্যাসিলিটি সার্ভে ২০১৪ নামের ওই জরিপ প্রতিবেদন তৈরি করেছিল স্বাস্থ্য মন্ত্রালয়ের অধীনস্থ জাতীয় জনসংখ্যা গবেষণা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান (নিপোর্ট) ও যুক্তরাষ্ট্রের দাতা সংস্থা ইউএসএআইডি। জরিপে দেখা গেছে, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালে ৩৮ শতাংশ চিকিৎসকের পদ ও ২০ শতাংশ নার্সের পদ শূন্য। মাত্র ২৬-৩৬ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে সুঁইয়ের মাধ্যমে দেওয়া অত্যাবশ্যকীয় ওষুধ, অ্যাটিবায়োটিক এবং শিরায় দেওয়া তরল ওষুধ পাওয়া যায়।  অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ডায়াবেটিস,হৃদরোগ ও ¯œায়ুরোগের মানসম্পন্ন চিকিৎসা দিতে প্রস্তুত থাকে না। যক্ষ্মার চিকিৎসা দেয় এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ৪৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে যক্ষা চিকিৎসার নির্দেশিকা জরিপের সময় পাওয়া যায় নি।

আর একদম গ্রাম পর্যায়ে  চিকিৎসার একমাত্র  অবলম্বন  কমিউনিউটি ক্লিনিক। সেখানেও কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) পদে আছে জনবল সংকট। অধিকাংশ সেন্টারে এই পদে লোক নেই। ফলে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে গ্রামের মানুষ। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জনগণের দোরগোড়ায় প্রাথমিক গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে। এই কমিউনিটি ক্লিনিক হয়ে উঠেছে গ্রামের অনেক সুবিধা বঞ্চিত মানুষের চিকিৎসার ঠিকানা। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিতে চিকিৎসকরা না থাকতে চায় এই বলে যে সেখানে থাকার পরিবেশ নেই। অবকাঠামো সমস্যা। কিন্তু তাঁরা বাসা ভাড়া হিসেবে যে টাকা পান তা দিয়ে মফস্বলে পর্যায়ে থাকার ব্যবস্থা এখন হয়েছে। অন্যান্য পেশার অনেকে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকছে। উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে ইউএনও, এসি ল্যান্ড সহ অফিসার পর্যায়ে অনেকে  থাকছেন। সেখানে স্কুল, কলেজের শিক্ষকরা, এনজিও কর্মকর্তরাও থাকেন।

 সবাই মিলে থাকলে সমাজ সমৃদ্ধ হবে। মানুষ উপকৃত হবে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক এখন সর্বত্র। অনেকের সন্তানরা লেখাপড়া করছে মফস্বলে এবং তারা ভাল করছে। এখন গ্রামের রাস্তাঘাট আগের চেয়ে ভাল হয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে যাঁদের পদায়ন হয়েছে, সেখানে চিকিৎসকদেরও থাকার আবশ্যকতা রয়েছে। মোট কথা গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা চিকিৎসকদের থাকতে হবে। তবে সরকার আরও বাড়িঘর তৈরি করতে পারে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে খুঁজলে দেখা যাবে, অনেক ক্ষেত্রে পদের অতিরিক্ত সংখ্যক চিকিৎসক প্রেষণে বা সংযুক্তি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া আছে। কেউ কেউ উচ্চ শিক্ষা নিতে সচেষ্ট। উচ্চশিক্ষা নিতে বাধা নেই। তবে কারা উচ্চশিক্ষা নেবেন এবং কোন  প্রক্রিয়ায়, সেটি সরকার কর্র্তৃক নির্ধারিত নিয়মে হতে হবে। আর মেধা ও জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বাছাই করে এই সুযোগ দিলে বিভ্রাটও হবে না। তা না করে যার যার সুযোগমতো দেনদরবার করে এসব করায় গ্রামাঞ্চলের চিকিৎসা ব্যবস্থায় সংকট অবস্থা বিরাজ করছে। অবশ্য এ ক্ষেত্রে আমাদের বিনিয়োগ অনেক কম।

একটা সময় গ্রামে কবিরাজি চিকিৎসায় একমাত্র অবলম্বন ছিল। এখনও কিছু আছে। আবার গ্রাম পর্যায়ে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসক এখন পাওয়া যায়। অল্প সংখ্যক পল্লী চিকিৎসক বা এলএমএফ চিকিৎসক ইদানিং গ্রামে দেখা যাচ্ছে। গ্রামের অনেক রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা এখন এই পল্লী চিকিৎসকরাই করছেন। কিন্তু তবুও সংকট থেকেই যায়। কারণ গ্রামে বা ইউনিয়ন পর্যায়ে রোগ নির্ণয়ে উন্নত ডায়াগনস্টিক সেন্টার নেই। ডায়াবেটিস, হৃদরোগের বা অন্যান্য জটিল রোগের জরুরি সেবা গ্রামে নেই।  ইউনিয়ন পর্যায়ে এ্যাম্বুলেন্স নেই। ফলে রোগী পরিবহণের সমস্যা মারাত্মক। এই রকম সমস্যা নিয়ে যুগের পর যুগ ধরে গ্রামের মানুষ দিন যাপন করছে। ্বিষয়টি মানবিক। গ্রামের মানুষকে স্বাস্থ্যসম্মত চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে যা যা করার দরকার, সরকারকে তাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
লেখক ঃ কলামিস্ট, সহকারী অধ্যাপক
০১৭২৫-০৪৫১০৫