মানুষ প্রমাণ করেছে তারা ধর্মভীরু তবে ধর্মান্ধ নয়

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৯:৪৬ পিএম, ১১ মে ২০২১

মাশরাফী হিরো: বাঙালি তার জাত চিনিয়েছে। যখনই ক্রান্তিকাল এসেছে তখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চরিত্র এ জাতির চিরায়ত আদর্শ। যা তাদের অস্থি-মজ্জায় বহমান। ক্ষণিকের জন্য বিভ্রান্ত করা গেলেও সুদূর প্রসারী ফল বয়ে আনা সম্ভব হয়নি। ঘুরে ফিরে বাঙালি তার স্বরূপে ফিরে গেছে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচন চলেছে গত ১ মাস যাবৎ। নানা প্রপাগান্ডা এবং অপপ্রচার চলেছে এই নির্বাচনকে ঘিরে। তৃণমূল কংগ্রেসের হেভিওয়েট নেতাদের কব্জা করেছে বিজেপি। হিন্দুত্ববাদ ছড়িয়ে পুরো ইন্ডিয়ার ন্যায় পশ্চিমবঙ্গেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে চেয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহ্্’রা। কিন্তু সফল হতে পারেননি। নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে এর আগে পশ্চিমবঙ্গে কখনোই এত কালো টাকার ছড়াছড়ি হতে দেখা যায়নি। তাছাড়া বিজেপি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে এমন কোন কৌশল নেই যা প্রয়োগ করেনি। কেন্দ্রীয় আধা সরকারি বাহিনী, গণমাধ্যম এবং নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। নির্বাচনকে দারুনভাবে প্রভাবিত করেছে সিবিআই। যা কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা পরিচালিত হয়ে থাকে। তাছাড়া নির্বাচন কমিশন তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাপারে অনেকটা অনমনীয় মনোভাব দেখিয়েছে। বিজেপি মমতা বন্দোপাধ্যায়কে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেছে। পাকিস্তানী তকমা লাগিয়ে দিতেও ছাড়েনি।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এক সময়ের খুব কাছের সহকর্মী নন্দীগ্রামের কৃষক আন্দোলনের নেতা শুভেন্দু অধিকারী তো বলেই দিলেন জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গকে বাংলাদেশ বানাতে চাচ্ছেন। তবে নন্দীগ্রামে শুভেন্দু অধিকারী বিজয়ী হয়েছেন তার পারিবারিক ঐতিহ্য এবং কৃষক আন্দোলনের কারণে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি মরণ কামড় দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এর কারণ হলো রাজনৈতিকভাবে পশ্চিমবঙ্গ সবসময় এগিয়ে। পশ্চিমবঙ্গের নেতৃত্ব শুধু বিধায়ক নির্বাচন নয় বরং লোকসভা নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আর পশ্চিমবঙ্গের মানুষও তাদেরকেই নেতা বানায় যারা নয়াদিল্লি পর্যন্ত ভূমিকা রাখে। অনেক নির্বাচন পর্যবেক্ষকই মনে করেন বিজেপিকে ঠেকাতে গিয়ে মানুষ তৃণমূলকে বেশি করে আঁকড়ে ধরেছে। যার ফলে সিপিআইএম এবং কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সংযুক্ত মোর্চা একেবারেই দাঁড়াতে পারেনি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষগুলি সম্মিলিতভাবে তৃণমূলকে শক্তিশালী করার চেষ্টা করেছে। যদি বিজেপি এভাবে মাঠে না নামতো তাহলে মানুষ হয়তো সংযুক্ত মোর্চাকেও কিছুটা সমর্থন দিত। অনেকে বলছেন ৩টি আসন থেকে বিরোধী দলের তকমা পাওয়া এটাইবা কম কিসের। অনেকের মতে বিজেপি আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গে আরো ভালো করবে। কিন্তু আমার তা মনে হয় না। কারণ বাঙালিরা বিধায়ক নির্বাচনে স্থানীয় দলকেই বেছে নিবে। হয় তৃণমূল কংগ্রেস নয়তো সিপিআইএম। সিপিআইএম’র ৩৬ বছরের শাসন শেষে মানুষ ২০১১ সালে বেছে নিয়েছিলো তৃণমূল কংগ্রেসকে। তারা বিজেপি এবং কংগ্রেসকে বেছে নেয়নি। আবার যখন স্থানান্তর হবে তখন তৃণমূল থেকে সিপিআইএম-এ স্থানান্তর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যার প্রমাণ নন্দীগ্রামের আসন। মমতা বন্দোপাধ্যায় এবং শুভেন্দু অধিকারীর সাথে যুদ্ধে নেমেছিলেন সংযুক্ত মোর্চার প্রার্থী মিনাক্ষী মুখার্জি। যিনি সিপিআইএম-এর যুব সংগঠনের সভাপতি।

পরিশীলিত বক্তব্য এবং তার রাজনৈতিক সংস্কৃতি পশ্চিমবঙ্গবাসীকে মোহিত করেছে। সারা পশ্চিমবঙ্গে তার একটি আলাদা অবস্থান তৈরি হয়েছে। তারপরও তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়েছে নন্দীগ্রামে। অনেকে মনে করছেন দুই হেভিওয়েটের চাপে তিনি হারিয়ে গেছেন আসলে তা নয়। তাহলে তো গোটা পশ্চিমবঙ্গ দখল করা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নন্দীগ্রামে হারার কথা না। বরং মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে যেমন গোটা পশ্চিমবঙ্গের নেতা মনে করেছে তেমনি মিনাক্ষী মুখার্জিকেও পুরো পশ্চিমবঙ্গের নেতা মনে করছে। নেতৃত্বের দ্বন্দ্বে শুভেন্দু অধিকারী এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের চাইতে পরবর্তীতে কিছুটা এগিয়ে থাকবেন মিনাক্ষী মুখার্জি তা বলাই বাহুল্য। হয়তো মিনাক্ষী মুখার্জির হাত ধরেই পশ্চিমবঙ্গে ফিরে আসতে পারে জ্যোতিবসু-বিমানবসুদের সিপিআইএম-এর অতীত ঐতিহ্য। গত কয়েকদিন যাবৎ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিজয়ে মানুষের উচ্ছ্বাস প্রকাশ হচ্ছে। বাংলাদেশও এক্ষেত্রে পিছিয়ে নেই। বাংলাদেশে যারা অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি ধারণ করেন তারা তো আছেনই বরঞ্চ দুই ধাপ এগিয়ে আছেন যারা বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনা লালন করেন তারা। এর কারণ হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির পরাজয়ে তারা খুশি। কিন্তু বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক চেতনার অধিকারী হেফাজতে ইসলামের পক্ষে তারা কথা বলতে দ্বিধা করে না। তারা পশ্চিমবঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে থাকলেও বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তির সমর্থক। যা মানুষকে কিছুটা হাসির খোরাক জোগায়। বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িক মানুষগুলো হেফাজতে ইসলামের অত্যাচারে কিছুটা হতাশ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু সরকার তাদেরকে হতাশ করেনি। বরং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশকে রক্ষা করেছে। বাঙালি জাতির ঐতিহ্য সমুন্নত রেখেছে। শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন সরকার সঠিক পথেই এগুচ্ছে। তাদের লম্ফঝম্পও বন্ধ হয়ে গেছে। এখন ধরনা দিতে হচ্ছে সরকারের কাছে। বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গের মানুষ প্রমাণ করেছে তারা ধর্মভীরু তবে ধর্মান্ধ নয়। আর শেখ হাসিনা এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমাণ করেছেন তারা বাঙালির অসাম্প্রদায়িক চেতনার বাতিঘর।
লেখক: যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক
বগুড়া জেলা আওয়ামী লীগ 
[email protected]
০১৭১১-৯৪৪৮০৫