অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে শ্রমজীবী মানুষ

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১০:২৩ পিএম, ০৮ মে ২০২১

ওসমান গনি: দিন যায়, মাস যায়, বছরের পর বছর যায় চিরাচরিত নিয়মে সবকিছুর পরিবর্তন হলেও শুধুমাত্র পরিবর্তন হয়নি দেশের খেটে খাওয়া মানুষের ভাগ্যের। অর্থাৎ যাদেরকে আমরা শ্রমিক বলে থাকি। প্রতি বছর ১লা মে দিবস কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসাবে পালন করা হয়ে থাকে। পৃথিবীর প্রতিটি দেশই জাতীয়ভাবে যথাযথ মর্যাদার সাথে দিবসটি পালন করে থাকে। মে দিবস যাওয়ার পর কে রাখে কার শ্রমিকদের কথা। শ্রমিকরা কি খেয়ে আছে নাকি না খেয়ে আছে তার খবরও তো কেউ কোনদিন নেয় না। নেওয়ার প্রয়োজনবোধও করে না। অথচ এই শ্রমিকদের জন্যই ১৮৮৬ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরে শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ ও রক্তাক্ত ঘটনার স্মৃতিবিজড়িত মে দিবসের ডাক এখনো সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। 
প্রায় দেড়শ’ বছর ধরে বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষ তাদের ন্যায্য অধিকার ও জীবনমানের উন্নয়ন ও নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলন করে এলেও পুঁজি বিকাশের তুলনায় শ্রমিক শ্রেণির অবস্থার তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। প্রতিবছর বিশ্বে ঘটা করে মে দিবস পালিত হলেও করোনার দীর্ঘমেয়াদী সংক্রমণের কারণে বিশ্বজুড়ে ভিন্ন এক প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। বিশ্বের সব মানুষ জীবনের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক ঝুঁকিতে থাকলেও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ। ফলে মে দিবস এবার এক ভিন্ন আঙ্গিকে পালিত হয়েছে। লকডাউনের মধ্যে বাংলাদেশে মে দিবস ঘটা করে পালনের সুযোগ হয়নি। একদিকে কোটি কোটি মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়া, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের দিশেহারা অবস্থা। দু’বেলা দু’মুঠো খাওয়াই এখন তাদের জন্য মুশকিল হয়ে পড়েছে। বেকারত্ব ও দারিদ্র্যের কষাঘাতে তাদের এখন ত্রাহি অবস্থা। হু হু করে বাড়ছে দারিদ্র্যের হার। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ইতোমধ্যে নতুনভাবে দুই কোটিরও বেশি মানুষ দরিদ্র হয়ে গেছে। হতদরিদ্রের সংখ্যাও সমানুপাতে বাড়ছে। বিগত এক বছরে করোনার প্রভাবে বাংলাদেশসহ সারারিশ্বের অর্থনীতিতে বড় ধরনের বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। শিল্পোৎপাদন এবং আমদানি-রফতানি আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। প্রবৃদ্ধি পাঁচ শতাংশের নিচে নেমেছে। গত বছর করোনার ধাক্কা সামলিয়ে মানুষ কর্মজীবনে ফেরার চেষ্টায় যখন উদগ্রীব এবং কলকারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা হতে শুরু করে তখনই নতুন করে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ যেন সব লন্ড ভন্ড করে দিয়েছে। সরকার চেষ্টা করছে লাখ লাখ দরিদ্র পরিবার ও কর্মহীন মানুষকে সহায়তা করতে। গার্মেন্ট, কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে প্রণোদনা দিয়ে উজ্জীবীত রাখতে। তারপরও করোনার ভয়াল থাবার কাছে সবকিছুই যেন ন্যুব্জ হয়ে পড়ছে। 
বাংলাদেশের মানুষ সবচেয়ে বেশি কর্মজীবী অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত। এ খাতে লাখ লাখ ক্ষুদ্র থেকে মাঝারি ধরনের উদ্যোক্তা যেমন রয়েছে, তেমনি লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষও রয়েছে। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মানুষগুলো সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে। কাজ হারিয়ে এবং কাজ না পেয়ে তারা বেকার বসে আছে। দু’বেলা খাওয়ার মতো অবস্থায় তারা নেই। খেটে খাওয়া এসব মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মতো যেন কেউ নেই। আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। তারা না পারছে হাত পাততে, না পারছে সংসার চালাতে। এদের সহায়তা করার মতো উদ্যোগও পরিলক্ষিত হচ্ছে না। 
যার জন্য বাধ্য হয়ে অনেক পরিবার রাজধানী ছেড়ে গ্রামে চলে গেছে। সেখানে গিয়েও যে তাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে, তার নিশ্চয়তা নেই। গত বছর করোনাকালে আমাদের মূল অর্থনৈতিক খুঁটি হয়ে ছিল কৃষিখাত। কৃষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমে ফসলের বাম্পার ফলন খাদ্য সংস্থানের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়ায়। দেখা যাচ্ছে, এক বছরের মাথায় দেশে খাদ্যসংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। 
এ পরিস্থিতিতে সরকারকে বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ টন চাল আমদানি করতে হচ্ছে। এবারের বোরো মৌসুমে সরকার ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্র নির্ধারণ করেছে। সাধারণত এই লক্ষ্যমাত্রা কখনোই পূরণ হয় না। মিলার ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারসাজির ফলে কৃষক ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। তা নাহলে, খাদ্য সংকট প্রকট হয়ে উঠার আশঙ্কা রয়েছে। নিত্যপণ্যের বাজার অনিয়ন্ত্রিত হয়ে রয়েছে। জিনিসপত্রের দাম মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। বাজার নিয়ন্ত্রণে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি। 
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯