কেন বারবার সুন্দরবনে অগ্নিকান্ড

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ১০:২০ পিএম, ০৮ মে ২০২১

অলোক আচার্য : বাংলাদেশের প্রাণের আঁধার বলা হয় সুন্দরবনকে। সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য এবং অক্সিজেন আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অথচ বিভিন্ন সময় নানা কারণে এই বন ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে যেমন প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে একইভাবে রয়েছে মানুষের অসৎ উদ্দেশ্য। সম্প্রতি সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এটাই প্রথমবার নয়। এর আগেও আগুন লেগেছে। ক্ষতি হয়েছে মাতৃস্বরূপ সুন্দরবনের। এর পেছনে প্রাকৃতিক কারণ রয়েছে না অন্য কোনো কারণ রয়েছে তা খুঁজে বের করা জরুরি। এ নিয়ে গত ২০ বছরে ২৩ বার সুন্দরবনে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এসব অগ্নিকান্ডে সুন্দরবনের ৭১ একর ৭০ শতাংশ বনভূমির গাছ, বিভিন্ন প্রকারের ঘাস, লতাপাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার আর্থিক মূল্য ১৮ লাখ ৫৫ হাজার ৫৩৩ টাকা। এভাবে কেন বারবার আগুনে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তা জানা জরুরি। এর ফলে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক বন্য প্রাণী প্রাণ হারাচ্ছে। এসব অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটির সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করার উদ্যোগ নিতে হবে। 
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, বিভিন্ন সময় গঠিত তদন্ত প্রতিবেদনে জোরালোভাবে তিনটি সুপারিশ করা হয়। এগুলো হচ্ছে, সুন্দরবন সংলগ্ন লোকালয়ের সঙ্গে মিশে যাওয়া নদী ও খাল খনন, অগ্নিকান্ডপ্রবণ এলাকায় প্রতি ২ কিলোমিটার পর পর ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করে নজরদারির ব্যবস্থা করা, চাঁদপাই রেঞ্জের ভোলা নদীর কোলঘেঁষে বনের পাশ দিয়ে কাঁটাতার অথবা রশির নেট দিয়ে বেড়া দেওয়ার ব্যবস্থা করা। কিন্তু এখন পর্যন্ত তিনটির একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়নি। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঘন ঘন শিকার হচ্ছে। এর মধ্যে আমাদের দেশে ঘূর্ণিঝড় বিভিন্ন সময়ে ক্ষয়ক্ষতির কারণ হচ্ছে। প্রাণহানির সাথে সাথে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে ব্যাপক। অতি সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের হাত থেকে ঢাল হয়ে আমাদের রক্ষা করেছে বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন। কেবল বুলবুলের হাত থেকেই নয় এর আগে ২০০৭  সালের ১৫ নভেম্বর মারাত্মক ঘূর্ণিঝড় সিডরের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে রক্ষা করতে এবং ২০০৯ সালের ২৫ মে ঘূর্ণিঝড় আইলার বিরুদ্ধে বুক পেতে দাঁড়িয়েছিল। না হলে আমাদের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি হতো। ঘূর্ণিঝড় সুন্দরবনে আঘাত করে দুর্বল হয়ে পড়ে। মায়ের আঁচলের মতো ঢাল হয়ে খুলনা ও সাতক্ষিরা উপকূলকে রক্ষা করেছে। তাই বাঁচাতে হবে এই অস্তিত্বকে। পৃথিবীর বহু বনের মতো সুন্দরবনেও লোভী মানুষের চোখ রয়েছে। চোরাকারবারীদের লোভী দৃষ্টি রয়েছে এই বনের দিকে। সুন্দরবন,  বাংলাদেশের জীববৈচিত্র্যের আঁধার। কেবল নামে সুন্দর নয়, মুগ্ধ করার মত গঠনশৈলী আর প্রাণী সম্পদের নিদর্শন এই সুন্দরবন। অসংখ্য পরিচিত অপরিচিত বৃক্ষরাজি, প্রাণীকুল নিয়ে যুগ যুগ ধরে দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় অবদান রেখে চলেছে। সুন্দরবনের কথা শুনলেই মনের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে গায়ে ডোরাকাটা রয়েল বেঙ্গল টাইগার, গোলপাতা, জোয়ার ভাঁটা আর মৌয়ালদের কথা। 
মানুষের লোভের শিকার ও প্রাকৃতিক কিছু কারণে আমাদের সুন্দরবনও আয়তন হারাচ্ছে। বর্তমানে নানা কারণে ছোট হতে হতে প্রকৃত আয়তনের এক তৃতীয়াংশে পৌছেছে। ভারতীয় উপমহাদেশ দুইভাগে ভাগ হলে সুন্দরবনের দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের এবং বাকিটা ভারতের অংশে পড়েছে। 
১৮৭৫ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। প্রাকৃতিক সম্পদের পাশাপাশি প্রাণী ও ভেষজের আঁধার সুন্দরবন। সবাই মিলেই সুন্দরবনকে বাঁচাতে হবে। আইলা, সিডর বা বুলবুল শেষ দুর্যোগ নয়। এরকম দুর্যোগ আরও অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। নিজেদের রক্ষা করতে উদ্যোগী হয়ে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে যেকোনো উপায়ে বারবার আগুন লেগে সুন্দরবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে সুন্দরবনের অস্তিত্ব আরও সংকটে পড়বে। আমাজনের মতো বিশাল বনও আগুন লাগার ঘটনায় আজ এর আয়তন কমছে। সুন্দরবনের আগুন লাগার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং তদন্ত কমিটির সুপারিশ সমূহ বাস্তবায়ন করা বেশি প্রয়োজন। না হলে এরকম অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটতেই থাকবে। আর একসময় বিভিন্ন কারণে সুন্দরবন তার গৌরব হারাবে। আমাদের দেশ তখন মুখোমুখি হবে মহাসংকটের। সুন্দরবন আমাদের রক্ষা করছে, সুন্দরবনকে আমরা সবাই মিলে বিশ^ ঐতিহ্য হিসেবে টিকিয়ে রাখবো। 
লেখক ঃ শিক্ষক ও কলামিস্ট 
ংড়ঢ়হরষ.ৎড়ু@মসধরষ.পড়স
০১৭৩৭-০৪৪৯৪৬