দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সুপেয় পানির তীব্র সংকট

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:১৯ পিএম, ০৪ মে ২০২১

আব্দুল হাই রঞ্জু:দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলা ঝিনাইদহ। এ জেলার শৈলকুপা, কালীগঞ্জ, কোট চাঁদপুর, মহেশপুর, হরিণাকুন্ডু ও ঝিনাইদহ সদর সহ মোট ৬টি উপজেলা এখন পানিশূন্য। মাঠ-ঘাট, বিল-ঝিল, জলাশয়, পুকুর-নদী কোথাও পানি নেই। পানি নেই নলকুপেও। ফলে এসব এলাকার মানুষ পানির জন্য হাঁহাঁকার করছে। জেলার ভিতর দিয়ে নবগঙ্গা, কুমার, বেগগতি, চিত্রা, কপোতাক্ষ, গড়াই নদী প্রবাহিত হলেও একমাত্র গড়াই  বাদে সব নদীই এখন মৃত্যু। এমনকি পানিশূন্য এসব নদীতে এখন নানা জাতের ফসলের চাষাবাদ হচ্ছে। আবার পানির অভাবে কৃষক জমিতে পানি দিতে না পারায় মাটি ফেঁটে চৌঁচির হয়ে গেছে। এর মধ্যে শৈলকুপা উপজেলার অবস্থা নাজুক বেশি। এ উপজেলার প্রায় ৩০ হাজার নলকুপ পানির অভাবে অকেজো হয়ে পড়ে আছে। ফলে সুপেয় খাবার পানি, গৃহস্থালী কাজকর্মে পানির অভাবে যেমন অচলাবস্থা দেখা দিয়েছে, অন্যদিকে পশু পাখির বিশুদ্ধ পানিও মিলছে না। শৈলকুপা উপজেলার বাইরে আরও যে ৫টি উপজেলা রয়েছে, সবমিলে প্রায় লক্ষাধিক নলকুপ এখন পানির অভাবে অকেজো হয়ে পড়েছে। ফলে হুমকির মুখে পড়েছে জনস্বাস্থ্য। 
মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত অভিঘাতে অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অসময়ে বন্যা, শিলাবৃষ্টি, গরম হাওয়া, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোর মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ এখন বাংলাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে বাংলাদেশের অভিন্ন ৫৪টি নদীর পানির উৎস মুখ চীন, ভারত ও নেপাল। উজান থেকে বয়ে আসা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আমরা বঞ্চিত। আবার ভূ-উপরিস্থ বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহারও করতে পারি না। ফলে একমাত্র ভরসা ভূ-গর্ভস্থ পানি। যে পানি আমরা গভীর, অগভীর, নলকুপের মাধ্যমে উত্তোলন করে পান করা, গৃহস্থালী কাজ করা, সেচে যথেচ্ছ ব্যবহার হওয়ায় হুহু করে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকুলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির নানামুখী সমস্যা দেখা দিয়েছে। উপকুলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানির পরিমাণ বেশি। এ সংকট দিনে দিনে আরো ঘনিভূত হচ্ছে। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি এখন ভূ-অভ্যন্তরে প্রবেশ করছে। শংকার বিষয় হচ্ছে, মিঠা পানির নদীতেও লবণাক্ত পানি ঢুকে গেছে। গত মার্চের শেষ সপ্তাহে দক্ষিণাঞ্চলের মিঠাপানির নদী মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়ায় হঠাৎ করেই দেখা মিলেছে লবণাক্ত পানির। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুস্ক মৌসুমে উজানের পানি কম প্রবাহিত হওয়ায় এবং সঠিক পরিমাণে বৃষ্টিপাত না হওয়ায়, দক্ষিণাঞ্চলের কোন কোন নদীর পানি লবণাক্ত হয়ে উঠেছে। এতে করে জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার পাশাপাশি পরিবেশ বিপর্যয়েরও শংকা দেখা দিয়েছে। পরিবেশবিদদের মতে, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত কীর্তনখোলা নদীর পানিতে তড়িৎপরিবাহিতা অনেক কম ছিল। মার্চ মাসে এসে এ পরিমাণ আরো বেড়ে যায় এবং নদীর পানির তাপমাত্রাও বৃদ্ধি পায়। ফলে লবণাক্ততার সংকট সৃষ্টি হয়। এ প্রসঙ্গে ‘বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন ও বাংলাদেশ নদী বাঁচাও আন্দোলন’ বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়কারী রফিকুল আলম বলেন, ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত একটি সরেজমিন সার্ভে হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, শুস্ক মৌসুমে সাগরের লবণাক্ত পানি তেঁতুলিয়া নদী পর্যন্ত চলে আস্ছে। সে সময় আমরা পরিবেশ অধিদপ্তর সহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করেছিলাম। বাস্তবেই এখন মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেুঁতলিয়া নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়েছে। যে কারণে যতদ্রুত সম্ভব এসব নদীর পানি পরীক্ষা করে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে আমাদের জলজ সম্পদের ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের জীবন-জীবিকা এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশংকা করছেন পানি বিশেষজ্ঞরা। 
অবশ্য পরিবেশ অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারি বায়োকেমিস্ট মোঃ মুনতাসির রহমান বলেন, প্রতি মাসেই নদীর পানি পরীক্ষা করা হয়। তাতে দেখা যায়, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসে মেঘনা, কীর্তনখোলা ও তেঁতুলিয়া নদীর পানির অনেকটাই পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কীর্তনখোলা নদীর ৬টি স্পট থেকে পানি সংগ্রহ করে পরীক্ষার পর পানিতে তড়িৎপরিবাহিতা প্রতি সেন্টিমিটারে ৩১৪ থেকে ৩৪০ মাইক্রোসিমেন্স পর্যন্ত পাওয়া গেছে। এর আগে এই মাত্রা ৩০০ থেকে ৪০০ এর মধ্যেই ছিল। কিন্তু মার্চ মাসে এসে প্রতি সেন্টিমিটারে মাইক্রোসিমেন্স পাওয়া গেছে,  এক হাজার ৩৩১ থেকে এক হাজার ৩৬২ পর্যন্ত, যা মানদন্ডের চেয়ে অনেক বেশি। এটি চিন্তার বিষয়, যা নিয়ে অধিকতর বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন। এ প্রসঙ্গে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের কোস্টাল স্টাডিজ অ্যান্ড ডিজিস্টার ম্যানেজম্যান্ট বিভাগের চেয়ারম্যান ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, এসব নদীতে ফেব্রুয়ারির তুলনায় মার্চে লবণাক্ততা কয়েকগুণ বেড়েছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকুলীয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সব নদীতে কম-বেশি লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এ জন্য দায়ী মূলত বৃষ্টির অভাব এবং উজানের পানির প্রবাহ কমে আসা। বাস্তবে উজান থেকে যে পরিমাণ পানি প্রবাহিত হওয়ার কথা, সে পরিমাণ পানি না এলে সমুদ্রের পানি বাইব্যাক করে নদীতে চলে আসবে, এটাই স্বাভাবিক মর্মে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি আরো বলেন, লবণাক্ততা বেড়ে গেলে নদীতে বসবাসকারী প্রাণীর গ্রোথ বাঁধাগ্রস্ত হবে, এমনকি ইলিশসহ নানা প্রজাতির মাছের উৎপাদনেও বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তবে তিনি বলেন, এটা নিশ্চিত করে বলার সময় এখনও আসেনি। কারণ নদীর পানিতে তড়িৎপরিবাহিতা বেড়ে যাওয়ায় কি ধরনের কেমিক্যাল কম্পোজিশনগুলো বেড়েছে সেগুলো জানতে হবে। তাহলে বোঝা যাবে, কি কারণে হঠাৎ লবণাক্ততা বেড়ে গেছে?
বাস্তবতা হচ্ছে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, ঝড়-তুফান, উজানের পানির স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁধার কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর যেমন অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে পানি শূন্যতা দেখা দিচ্ছে, আবার উজান থেকে ভাটিতে সঠিক মাত্রার পানি প্রবাহ না থাকায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি উপরে ওঠে আসছে। এসব সংকটতো কম-বেশি লেগেই আছে। এ ছাড়া গত ৮ এপ্রিল স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের বরাত দিয়ে কানাডার টরেন্টোভিত্তিক সংবাদমাধ্যম বিএনএন ব্লমবার্গ জানায়, বাংলাদেশের আকাশে মিথেন গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। যদিও উক্ত প্রতিবেদনে বাংলাদেশের আকাশে মিথেনের উপস্থিতিকে ‘রহস্যময়’ আখ্যা দিয়ে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনে গোটা বিশ্বের যেসব দেশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রকৃত অর্থে গ্রিনহাউস গ্যাস হিসেবে পরিচিত মিথেনের ঘন আস্তরণের সন্ধান পাওয়ায় পরিবেশবিদগণ উদ্বিগ্ন। তারা মনে করেন, নির্বিচারে গাছকাটা, কলকারখানা, যানবাহনের ধোঁয়া, ডিজেল ও পেট্রোল পোড়ানোর ফলে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন গ্যাসের পরিমাণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। শংকার কারণ হচ্ছে, এ বছর প্যারিসভিত্তিক কোম্পানী ক্যারোস এসএএস নামের একটি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি মিথেন গ্যাস নিঃসরণের সর্বোচ্চ ১২টি হার শনাক্ত করেছে। যার সবগুলোই ঘটেছে বাংলাদেশে (সূত্র: দৈনিক আমাদের সময়, তাং- ৯/৪/২১)।
বাস্তবেই জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রকৃতি ক্রমেই রুক্ষ হয়ে উঠছে। যে কারণে দেশে এখন সর্বত্রই কম-বেশি পানির সংকট দেখা দিয়েছে। পানির স্তরও নিচে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ মাত্রাতিরিক্ত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণেই পানির স্তর নেমে যাচ্ছে এবং ভূ-গর্ভে পানিশূন্যতা দেখা দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য সমসাময়িক পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি সুষ্ঠু পানিনীতি প্রণয়ন করে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহারকে নিশ্চিত করতে হবে। যেমন-বৃষ্টি ও বন্যার পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করতে হবে। যা বাস্তবায়নে প্রতিবছর বাজেটে বরাদ্দ রেখে নদী-নালা খনন এবং বৃষ্টির পানি দেশের সর্বত্র সংরক্ষণের ব্যবস্থা করে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। তা না হলে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা যেমন সম্ভব হবে না, তেমনি পানিশূন্যতা, লবণাক্ততা থেকে শুরু করে প্রাকৃতিক নানা সংকটের সম্মুখীন হতে হবে মানুষকে। 
ইতিমধ্যেই কপোতাক্ষ নদে হঠাৎ করেই লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটেছে। এতে স্থানীয় কৃষি জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ফলে সাতক্ষীরা, কলারোয়া ও যশোর জেলার কেশবপুরসহ নদীর তীরবর্তী জমির সেচের পানির চাহিদা মিটতো কপোতাক্ষের পানি দিয়ে। সেখানে গত এক মাস আগে হঠাৎ চিরায়ত পানির ধারা পরিবর্তন হয়ে লোনা পানির অনুপ্রবেশ ঘটে। এতে সেচ সংকটে কপোতাক্ষের ওপর নির্ভরশীল মানুষ চরম বিপাকে পড়েছেন। এমনকি পানির অভাবে গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পেও নির্বিঘেœ সেচ কার্য চালানো সম্ভব হচ্ছে না। গত ১ মাসে পানির অভাবে দুই বার বন্ধ করতে হয়েছে সেচ প্রকল্পের পানি সরবরাহ। মূলত জিকে সেচ প্রকল্পের আওতায় কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার ১ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম চলে। জিকের কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা যায়, সেচ প্রকল্পটি পদ্মার পানির ওপর নির্ভরশীল। পদ্মা পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভর করে সেচ কার্যক্রম কি ভাবে পারিচালিত হবে। যখন পদ্মায় পানির পরিমাণ কম থাকে তখন সেচ কার্যক্রম চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। জানা গেছে, জিকে সেচ চালু রাখতে হলে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানি প্রবাহ প্রয়োজন কমপক্ষে ৩৪ হাজার কিউসেক। কিন্তু যখন উক্ত পয়েন্টে পানি প্রবাহ ২৪ হাজার কিউসেকে এসে দাঁড়ায়, তখন আর সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হয় না। অবশ্য পানির সংকটের বিষয়ে জিকে প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান বলেন, জিকের সেচ চালু রাখতে এবার তাদের একটু বেশিই হিমশিম খেতে হয়েছে। এর মূল কারণ হিসেবে তিনি বৃষ্টির পানির দুষ্প্রাপ্যতাকেই দায়ী করেছেন। মূলত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে অনাবৃষ্টি এবং উজানের পানির স্বাভাবিক গতিপ্রবাহে বাধার কারণে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মিঠা পানির সংকট দিন দিন তীব্র হচ্ছে। আবার সমুদ্রের ভূ-পৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাওয়ায় সমুদ্রের লোনা পানি এখন উপরে উঠে আসছে। ফলে নতুন নতুন সংকট সৃষ্টি হচ্ছে। যে কারণে ভূ-গর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। তা না হলে মানুষের জীবন-জীবিকা, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়বে।
  লেখক: প্রাবন্ধিক
[email protected]
-০১৭১২৭১৬৯৭২