পণ্যের লাগামহীন মূল্যে দিশেহারা ভোক্তা

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:২১ পিএম, ০৩ মে ২০২১

নার্গিস জামান :“আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি” কথাটি শুনতে নারাজ ভোক্তা সাধারণ। তাদের কথা, আমরা আদার ব্যাপারী জাহাজের খবরে কাজ কি! ‘ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমার চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি!’ আসলে ক্ষুধা পেটে শুধু খাবার চায়, দামের কথা শুনতে চায় না। আজ চালের মূল্যবৃদ্ধি তো কাল পিঁয়াজের, লবণ থেকে শুরু করে মাছ, মাংস, তেল কোনটি সাধারণ ক্রেতার নাগালের মধ্যে আছে? হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছে যারা তাদের কথা আসছে না। বলছি সাধারণ ক্রেতার কথা, কারণ সাধারণ ক্রেতারা আহাজারি করছে। এই করোনার লকডাউনে ভাতে ডাল মেখে খাওয়াই যেন স্বপ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে অসহায় ও মধ্যবিত্তদের। মাছ মাংস ধরাছোঁয়ার বাইরে। লোকে আহাজারি করে বলছে, “একে তো না খেয়েই মরতে হয়, তার উপরে করোনার উৎপাত! যা একটু কাজ করে ভাত জুটত তাও আর সইছে না! কাজ না করলে ভাত দিবে কে? 
বিশ্বজুড়ে করোনার প্রভাবে মানুষ উদ্বিগ্ন আর এ সময়ে বাজারে পণ্যের দাম ঊর্ধ্বগতি। বরাবর রোজা আসার আগেই বাজারে নিত্যপণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় ফলে মানুষের কষ্টও বেড়ে যায়। ইফতারের জন্য প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম চড়া। বেসন, তেল, কাঁচা সবজি, লেবু ও মাছ-মাংসের দাম নাগালের বাইরে। ভোক্তাদের স্বার্থরক্ষা করবে কে? চাহিদা ও যোগানের সাথে সামঞ্জস্য রেখে মূল্য নির্ধারিত হওয়ার কথা। কিন্তু একমাত্র বাংলাদেশেই কেবল একবার দাম বাড়লে তা আর কমে না, সে যোগান যতই থাকুক না কেন! আর রমজান তো ব্যবসায়ীদের জন্য সওয়াবের চেয়ে বেশি মুনাফার মাস বরকতের মাস হয়েই আসে! রমজানের আগে থেকেই বেড়ে গেছে সব পণ্যের দাম। ভোজ্য তেল, গত বছরের তুলনায় দ্বিগুন দাম। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধি, সে কথা কি ঘরের সহজ সরল মানুষগুলোকে বোঝানো সম্ভব! তারা জাহাজের খবর চায় না, চায় পরিমাণ মতো চাল, তেল, পিঁয়াজ। জনগণ মনে করেন, তেলের মূল্য সরকারের নিয়ন্ত্রণ করা দরকার ভর্তুকি দিয়ে হলেও। 
আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া মাত্রই দেশের ব্যবসায়ীরা তেলের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে। দেশে আগের দামে আমদানিকৃত মজুত করা তেলও আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়া মাত্রই চড়া দামে বিক্রি করে অধিক মুনাফা লাভ করেছে ব্যবসায়ীরা। উল্লেখ্য, দেশে বছরে প্রায় ১৫ লাখ টন ভোজ্যতেলের চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ তেল আমদানি করতে হয়। জানা গেছে, দেশের ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে ৫টি পরিশোধনকারী কারখানা। এ গ্রুপগুলোই মূলত বাংলাদেশের ভোজ্যতেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করে। বেসরকারি কারখানাগুলোর পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) কিছু পরিমাণ সয়াবিন তেল আমদানি করে। 
এ অবস্থায় ভোজ্যতেলের আমদানি শুল্ক কমিয়ে বা শুল্ক মওকুফ করে দাম নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে। সয়াবিনের ওপর তিন পর্যায়ের ভ্যাট আছে। সরকার দুভাবে মূল্যটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। একটা হলো শুল্ক হার কমিয়ে বা শুল্ক তুলে দিয়ে। অথবা টিসিবির মাধ্যমে। সরকার টিসিবি কর্তৃক বেশি পরিমাণ তেল আমদানি করে শুল্ক প্রত্যাহার ও ভর্তুকি প্রদান করে করোনাকালের এই ক্রান্তিলগ্নে জনগণকে কিছুটা হলেও বর্ধিত মূল্য থেকে রেহাই দিতে পারে। জানা গেছে, করোনার কারণে তেল সমৃদ্ধ দেশগুলো তেল উত্তোলন কমিয়ে দিয়েছে ফলে সারাবিশ্বে তেলের দরে এই অবস্থা। যদিও সয়াবিন উত্তোলনকৃত তেল নয়, বরং উৎপাদনকৃত, তবুও ভোজ্য তেল সয়াবিন, সরিষা, সূর্যমুখী, রাইসব্রান প্রভৃতি সব তেলের ওপরেই প্রভাব পড়েছে। তেল বলে কথা! তেলের পাওয়ার কত, তা এখানেই বোঝা যায়! চালিকা শক্তিতে চাই তেল, রন্ধনেও তেল, মর্দনে তো চাই-ই চাই তৈল! তেল ছাড়া কিছু ভাবাই যায় না, তেলের বিকল্প নেই। “তেলে তেল জমে, চাকেতে জমে মধু; বিত্তবানেরা সুখ ভোগে, গরীবের ভোগে কদু!’’
তেলের বিকল্প নেই। যানবাহন থেকে শুরু করে কৃষি, সবকিছুতেই তেল চাই। জ্বালানি না থাকলে জ্বলবেও না, চলবেও না। কিন্তু মানুষের তো চলতেই হবে তাই তেলের মূল্য যতই হোক, বাধ্য হয়ে কিনতেই হয়। কৃষিতেও তেল অপরিহার্য অনুষঙ্গ। ইরিগেশনে প্রচুর সেচ দিতে হয়। সব জমিতে ইলেকট্রিসিটি ব্যবহার করে সেচ দেয়া সম্ভব হয় না। বাড়ি থেকে একটু দূরের জমিগুলোতে তেলের সাহায্য পানি পাম্প করে সেচ দিতে হয়। ফলে তেলের দাম বাড়লে কৃষি উৎপাদনেও ব্যয় বেড়ে যায়। কিন্তু কৃষক সেই অনুপাতে ন্যায্যমূল্য পায় না। মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃষকের কষ্টের সুফল ঘরে তুলে ভোগ করে থাকে। আমাদের অর্থনীতির একটি বড় অংশ আসে কৃষি থেকে। 
কৃষি মন্ত্রনালয়ের তথ্য অনুযায়ী গণমাধ্যমে প্রকাশ, “কৃষিতে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। জীবন-জীবিকার পাশাপাশি আমাদের সার্বিক উন্নয়নে কৃষি ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। টেকসই কৃষি উন্নয়নে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। খোরপোষের কৃষি আজ বাণিজ্যিক কৃষিতে রূপান্তরিত হয়েছে। খাদ্য শস্য উৎপাদন, টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মসংসস্থান ও রপ্তানি বাণিজ্যে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বৈরী প্রকৃতিতেও খাদ্যশস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে উদাহরণ। মোট দেশজ উৎপাদন তথা জিডিপি’তে কৃষি খাতের অবদান ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ।” কৃষিতে আমাদের এগিয়ে যাওয়া স্বস্তিদায়ক হলেও এক্ষেত্রে অস্বস্তিকর খবরও আছে। জিডিপিতে কৃষির অবদান কমেছে। এটি ভালো সংবাদ নয়। কৃষি নির্ভর আমাদের দেশে ফসল উৎপাদন বা আবাদের বিকল্প নেই। আমরা জানি, করোনা মহামারীকালে পুরো বিশ্ব যখন থমকে গিয়েছিল, যখন বিশ্বের উৎপাদন ব্যবস্থায় ধস নামে; তখন কৃষিই সচল রেখেছে অর্থনীতির চাকা। আমাদের দেশেও করোনাকালে যখন মিল কলকারখানা সব বন্ধ, স্থবির হয়ে পড়ে তখনও কৃষি ছিল সচল এবং চরম দুঃসময়ে কৃষি আমাদের পথ দেখিয়েছে সম্ভাবনার। অথচ কিছু সমস্যার কারণে কৃষকের অনীহায় পিছিয়ে পড়ছে কৃষি। 
২০ জুলাই, ২০২০ গণমাধ্যমে প্রকাশ, “জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমছে। গত এক দশকে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। তবে জিডিপিতে বেড়েছে শিল্প খাতের অবদান, প্রায় ৮ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয় এটিকে অর্থনীতির ধারাবাহিক কাঠামোগত পরিবর্তন বলছে। এ ব্যাপারে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম সংশ্লিষ্ট জাতীয় দৈনিকে বলেন, ‘কৃষি খাতের মূল বিষয় হলো জমি। দিন দিন চাষযোগ্য জমির পরিমাণ কমছে। বাংলাদেশ ১ শতাংশ চাষযোগ্য জমি হারাচ্ছে। সরকারের ‘মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক নীতি বিবৃতিতে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এক দশক আগেও জিডিপিতে কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল অনেক। কিন্তু তা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে কৃষি খাতের অবদান ছিল ১৮.০১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১৩.৪৪ শতাংশে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ‘কাঠামোগত পরিবর্তন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ধারাবাহিকভাবে কাঠামোগত পরিবর্তন ঘটেছে। জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান হ্রাস পাচ্ছে এবং শিল্প খাতের অবদান বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১০-১১ অর্থবছরে শিল্প খাতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৭.৩৮ শতাংশ। ২০১৯- ২০ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫.৯২ শতাংশে। এদিকে কৃষি খাতে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমলেও সরকারের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮.২০ শতাংশ। 
জিডিপিতে কৃষিখাতের প্রবৃদ্ধি কমার কারণ হিসেবে অর্থনীতির ধারাবাহিক কাঠামোগত পরিবর্তন এবং চাষযোগ্য জমির পরিমাণ সামান্য হ্রাস পেয়েছে বলে মনে করা হলেও এর আসল কারণ কৃষকের কৃষিকাজে অনীহা বলে মনে করা হচ্ছে। একজন সফল কৃষকের সাথে আলোচনাকালে তার বক্তব্যে কৃষির কিছু প্রতিবন্ধকতা ও ন্যায্যমূল্য না পাওয়াই কৃষি কাজে বিরক্তি ও অনীহার আসল কারণ বলে জানা গেছে। তিনি বলেন, “সার এবং কীটনাশকের দুস্প্রাপ্যতা এবং অনিয়ন্ত্রিত মূল্য, জনবল কম হওয়ায় মজুরের মূল্যবৃদ্ধি, এবং পরিশেষে ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় মূলত কৃষিকাজে অনীহার আসল কারণ। যে কারণে লোকজন কৃষি কাজ ছেড়ে শহরে বা মহানগরে গিয়ে শিল্প কারখানায় কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সার পাওয়া যথেষ্ট ঝামেলার। যদিও পাওয়া যায়, তা কিনতে হয় দুই থেকে তিনগুণ মূল্যে। তার দাবি, “সরকার ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিলার ও সাবডিলারের সংখ্যা বর্ধিত করে দিক। নইলে যে ইউনিয়নে ১৫টি বা তার বেশি ওয়ার্ড থাকে সেই ইউনিয়নের কৃষকদের সার কিনতে অনেক দূরে যেতে হয়। এতে পথখরচা সহ সময়ের এত অপচয় ও হয়রানি হয় যে, কৃষিকাজের প্রতি এমনিতেই বিরক্তি এসে যায়। তার মতে, “সারের ডিলাররা চৌদ্দ টাকা কেজির সারে ২ টাকা লাভ করে, ওদিকে তেলের ডিপোর মালিকরা ৬০ টাকার তেলে ২ টাকা লাভ করে। তাহলে তেলের তুলনায় অত্যন্ত কম লগ্নি করে সারের ডিলাররা একই সমান লাভ করছে। এক্ষেত্রে তাদের লাভ আরেকটু কমিয়ে সীমিত করা উচিত এতে কৃষক একটু হলেও হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এছাড়াও ডিলার ও সাবডিলাররা হাত বদলে, দুই থেকে তিনগুণ অতিরিক্ত মূল্যে সার বিক্রি করা সহ সার প্রদানে কৃষককে হয়রানি করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষরা তা দেখেও দেখেন না। তারা ডিলারের কাছে বসে চা নাস্তা খেয়ে তাদের ভাগের টাকা নিয়ে খুশি মনে সই করে দেন কাগজে।” আরও অভিযোগ হলো, দুই বা তিনটি ইউনিয়নের ডিলাররা একত্রিত হয়ে সিন্ডিকেট করে একচেটিয়া মূল্যেও সার বিক্রি করে থাকে কোন কোন এলাকার মার্কেটে। এসব কারণে কৃষকের কৃষিকর্ম লস প্রজেক্ট হয়ে দেখা দিচ্ছে ফলে তারা কৃষিকাজে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ছে। 
যেহেতু কৃষির বিকল্প নেই, সেহেতু সরকারের এখনই সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। সার, কীটনাশক, বীজ সুলভ ও সহজলভ্য করে কৃষকের হাতের নাগালে পাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি সুষ্ঠু বাজারজাতকরণের মাধ্যমে কৃষকের ন্যায্য পাওনা মেটানোর ব্যবস্থা নিয়ে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। 

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক 
০১৭৩০-২৬৪৪৯৭