করোনাভাইরাস: খাদ্য নিরাপত্তা ও বর্তমান বাস্তবতা

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৩:১৬ পিএম, ১৯ মে ২০২০

এস. এম. আরিফ ইফতেখার: বিশ^ খাদ্য কর্মসূচীর (ডব্লিউ এফ পি) তথ্য অনুযায়ী, সমগ্র বিশে^ করোনাভাইরাসের প্রভাবে প্রায় তিন কোটি মানুষ অনাহারে প্রাণ হারাতে পারেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত বিশে^র সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রসমূহের অর্থনৈতিক অবনমন বিশ^ খাদ্য কর্মসূচীর আওতায় প্রায় ১০ কোটি মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেবার বিষয়টিও তাই এখন হুমকির মুখে পড়েছে। সাহায্যকারী দেশসমূহের ভঙ্গুর অর্থনৈতিক অবস্থা এই সঙ্কটময় মুহূর্তে বিশ^ খাদ্য কর্মসূচীতে সহায়তার পরিমাণকে হ্রাস করতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। বাস্তবিক অর্থে এর পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।     
করোনাভাইরাস বাংলাদেশের অর্থনীতির উপরও ক্রমান্বয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিশ^ শ্রম সংস্থা (আইএলও), এশিয়ান উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর তথ্য মতে, বাংলাদেশের মোট কর্মজীবীদের প্রায় ৮০-৯০ ভাগই অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির সাথে যুক্ত। তাই, লকডাউনে এই বড় সংখ্যক স্বল্প আয়ের মানুষের পক্ষে ঘরে বসে প্রতিদিনের খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটানো প্রায় অসম্ভব। অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে কর্মরতদের খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেই কেবল তাঁদের অধিকাংশের পক্ষে ঘরে থাকা, শারীরিক বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা সম্ভব হবে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের হিসেব মোতাবেক বাংলাদেশ সরকারের খাদ্য গুদামে বর্তমানে প্রায় ১৬.৯৫ লাখ মেট্রিক টন খাদ্য মজুদ রয়েছে তন্মধ্যে চাল ১৩.৮৭ লাখ মে. টন এবং গম ৩.০৮ লাখ মে. টন। এই মজুদ সন্তোষজনক এবং খাদ্য শস্য ঘাটতির কোন সম্ভাবনা নেই বলে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক ‘খাদ্য শস্য পরিস্থিতি’ বিষয়ক এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
খাদ্য শস্যের পর্যাপ্ত মজুদ দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণের নিশ্চয়তা দিলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে খাদ্য সবার কাছে পৌঁছে দেয়া এবং খাদ্য কেনার সামর্থ্য থাকার বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, মজুদকৃত খাদ্য দেশের মানুষের জন্য সরবরাহ করা হলেও অসাধু ব্যবসায়ী বা তৎসংশ্লিষ্ট কেউ যদি অন্যায়ভাবে তা মজুদ রাখে এবং দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে কৃত্রিম সংকট তৈরী করে তখন খাদ্যের অনিশ্চয়তা তৈরী হয়। বিশিষ্ট নোবেল বিজয়ী বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন দুর্ভিক্ষের কারণ হিসেবে শুধু খাদ্যের কম উৎপাদনই নয় বরং পর্যাপ্ত খাদ্য মজুদ থাকার সত্ত্বেও যদি সুষম বন্টন না হয় তবুও দুর্ভিক্ষ হতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। তাই সংকটকালীন এ সময়ে দেশে মজুদকৃত খাদ্য সরবরাহের পর্যাপ্ততা, সুষম বন্টন, স্বচ্ছতা এবং সহজেই পণ্য কেনার সামর্থ্যতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর খাদ্য সহায়তা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যে ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের প্রায় আড়াই কোটি মানুষের জন্য রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন যেন তাঁদের অন্যতম মৌলিক চাহিদা খাদ্যের সমস্যায় পড়তে না হয়। পাশাপাশি আরও ৫০ লাখ দরিদ্র পরিবারের জন্য জরুরি ভিত্তিতে রেশন কার্ড প্রস্তুতেরও নির্দেশনা দিয়েছেন। খাদ্যের মজুদ বাড়াতে প্রায় ৬ লাখ মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহের (২৬ এপ্রিল ২০২০ থেকে ৩১ আগস্ট ২০২০ পর্যন্ত) লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে বোরো মৌসুমের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। করোনাভাইরাসের প্রভাবজনিত এই সংকটকালীন মুহূর্তে হোম কোয়ারেন্টাইন, লকডাউন ভেঙে ধান সংগ্রহ করার বিষয়টি সত্যিকার অর্থেই একটি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যত: সবার সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন।
বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য পরিস্থিতির পাশাপাশি খাদ্য পরিস্থিতিও ক্রমশ: অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউ এইচ ও) প্রধান মহাপরিচালক টেড্রস আ্যাডহানম গ্রেব্রেইসুস যখন কোভিড-১৯ কে সোয়াইন ফøু’র চেয়েও দশ গুণ শক্তিশালী ক্ষতিকর ভাইরাস হিসেবে চিহ্নিত করেছেন তখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাকে প্রদেয় আর্থিক সহায়তা বন্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। যা এই মুহূর্তে সমগ্র বিশে^র মানুষের স্বাস্থ্য সেবার বিবেচনায় অত্যন্ত অপ্রত্যাশিত ও হতাশাজনক একটি সিদ্ধান্ত। অন্যদিকে, বিশ^ খাদ্য সংস্থা (এফ এ ও) এর ডিরেক্টর অব ইমারজেন্সিস্ ডোমিনিক কার্জন বিশে^র খাদ্য নিরাপত্তা প্রসঙ্গে বলেন, ‘পৃথিবীর কিছু স্থান দুর্ভিক্ষের খুব কাছাকাছি’। নিশ্চয় এ ধরনের ঘোষণা বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তার প্রসঙ্গকে চরম নাজুক অবস্থায় ফেলে দেয়। কেননা, খাদ্যের সংকট হলে মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে নয় বরং খাবারের অভাবে না খেয়েই মারা যাবে।
সমগ্র বিশে^র খাদ্যের অনিশ্চয়তা আমাদের দেশের জন্যও সুখকর কোন বিষয় নয়। যদিও বাংলাদেশ সরকার খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ অর্থনৈতিক গতিশীলতার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছেন। তথাপি সংকটকালীন এ সময়ে কৃষি কাঠামো সচল রাখতে শুধু কৃষকই নয় বরং খাদ্য উৎপাদনে সবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অংশগ্রহণের অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীর যত মানুষের এ অবধি মৃত্যু হয়েছে, সতর্ক হওয়া প্রয়োজন যেন এর চেয়ে অধিক মানুষ দুর্ভিক্ষে মৃত্যুবরণ না করেন। করোনাভাইরাস মানব সভ্যতার প্রতি যে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়েছে তা মানব চর্চিত জ্ঞানের গভীরতা, বিচক্ষণতা, বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা এবং মানব শ্রেষ্ঠত্বকে প্রকৃতঅর্থেই প্রশ্নবিদ্ধ করে।
লেখক ঃ প্রভাষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ^বিদ্যালয়, ঢাকা-১১০০