কী আছে শেষে.. পথের

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৩:১৩ পিএম, ১৯ মে ২০২০

রবিউল ইসলাম রবীন: কোন প্রকার যুদ্ধবিগ্রহ ছাড়া বিশ্বের প্রায় ৭৮০ কোটি মানুষ বর্তমানে অবরুদ্ধ। লকডাউনের কারণে স্থবির হয়ে গেছে বিশ্বচরাচর। মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। বিশ্বের ২১৫টি দেশ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত। আমাদের দেশে শুধু রাঙামাটি জেলা ছাড়া বাকি ৬৩ জেলা আক্রান্ত হয়েছে। গত এক দেড় মাসে মানুষে মানুষে দেখা নেই, কথোপকথন নেই, মুখে হাসি নেই, শুধু ভেতরে ভেতরে ভয় আছে, ক্ষুধা আছে, দরিদ্র্যতা আছে। কিন্তুু যে প্রশ্নটা ৭৮০ কোটি মানষের- এই পথের শেষ কোথায়? কী আছে শেষে? এই প্রশ্ন করার মতো কাউকে খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশ্বসভায়ও নয়।
ইদানিং প্রায়  একটা প্রশ্ন সর্বত্র আলোচিত হচ্ছে। গত ডিসেম্বরে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের আগে আমরা যেমন ছিলাম, সেই অবস্থায় কবে ফিরতে পারবো আমরা? উত্তরটা কঠিন। তবে  মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস বলেছেন, যেদিন কোভিড-১৯ সারাতে ভালো একটা ওষুধ মিলবে অথবা এই গ্রহের প্রত্যেক মানুষকে করোনাভাইরাসের টিকা দেওয়া সম্ভব হবে, সেদিন হয়তো। প্রসঙ্গত মাইক্রোসফটের প্রতিষ্ঠাতা বিল গেট আর তাঁর স্ত্রীর প্রতিষ্ঠিত ’বিল অ্যান্ড মেলিডা গেটস ফাউন্ডেশন’ করোনাভাইরাসের টিকা গবেষণার জন্য সাড়ে চার হাজার কোটি ডলার দিয়েছে। বিশ্বে টিকা তৈরিতে  অর্থসহায়তাকারী এই প্রতিষ্ঠানই সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান।
অতীতে যক্ষা,ম্যালেরিয়া,ইবোলা,সার্স ইত্যাদি মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে পৃথিবীতে বহু মানুষ মারা গেছে। সেগুলির টিকা আবিষ্কার হয়েছে,মানুষ সে রোগ থেকে মুক্তি লাভ করেছে। করোনাভাইরাসের টিকা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছে অক্্রফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়। তাঁদের সঙ্গে আছেন ফার্মাসিউটিক্যাল জায়ান্ট আষ্ট্রাজেনকা। তাঁরা এর উৎপাদন ও বৃহৎ পরিসরে বন্টনের দায়িত্বে আছেন। এই ভ্যাকসিন যদিও এখনও পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন এটি কাজ করার সম্ভাবনা প্রচুর।
এটি কাজ করলে কোভিড-১৯ এর প্রথম টিকা আবিষ্কারকারী দেশ হতে চলেছে বৃটেন। প্রভাবশালি পত্রিকা দ্য মিরর জানিয়েছে, এই সমঝোতার ফলে দ্রুতই বিশ্বের সকল প্রান্তে পৌঁছে দেয়া যাবে কোভিড-১৯ টিকা। ইতিমধ্যে মানবদেহে এই টিকা প্রবেশ করানো হয়েছে। এতে বৃটেনের শত শত স্বেচ্ছাসেবক অংশ নিয়েছে।
কোভিড-১৯ চিকিৎসায় জরুরি প্রয়োজনে প্রয়োগের জন্য একটি ওষুধের অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিষ্ট্রেশন (এফডিএ)। দেশটির চিকিৎসকরা  ৪ মে থেকে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া গুরুতর অসুস্থ রোগীর শরীরে এই ওষুধ প্রয়োগ করতে পারবেন। এরই মধ্যে দিয়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরারাসের প্রথম ওষুধ পেল। ওষুধের নাম হলো রেমডেসিভির।এটি তৈরি করেছে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ উদ্ভাবনকারী কোম্পানী গিলিয়েড সায়েন্স। যুক্তরাষ্ট্রের রেমডেসিভিরই প্রথম ওষুধ, যেটি সাধারণভাবে রোগীর শরীরে প্রয়োগের অনুমোদন পেল। এ খবর আসার পর বিজ্ঞানী, চিকিৎসকসহ অনেকেই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।
করোনাভাইরাস প্রতিরোধে সমগ্র বিশ্ব কিন্তুু  কম আয়োজন করেনি। বিশ্বের প্রায় শহরে এখন চলছে লকডাউন। কোন কোন দেশ কারফিউ ঘোষণা করেছেন। নাইজেরিয়ায় লকডাউন ভাঙার কারণে পুলিশ গুলি করে মেরে ফেলেছে এক পথচারীকে। নানা আধুনিক ব্যবস্থপনায় হাসপাতালগুলিকে সাজানো হয়েছে। অনেক দেশ সীমান্ত সীল করে দিয়েছে। মানুষ হোম কোয়ারেন্টাইনে বা প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ারেন্টাইনে থাকতে শিখেছে। কিন্তু করোনার প্রতিষেধক না থাকায় এসব খুব একটা কাজে দেয়নি। এক উহান রাজ্য থেকে একে একে ২১৫ টি দেশ এ রোগে আক্রান্ত হয়েছে। তা হয়েছে দ্রুত,দাবানলের মতো। রোধ করা যায়নি।
চিকিৎসা ব্যবস্থা যত উন্নতই হোক, মানুষ যত বেশি বুদ্ধিমত্তার অধিকারীই হোক, চোখে দেখা যায় না এমন অদৃশ্য কিছু আছে যার  ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা মানুষের তৈরি আনবিক বোমার চেয়ে বেশি।  চীনের উহান থেকে ওয়াশিংটন অথবা ওয়াশিংটন থেকে উহানে কোন মিসাইল হয়তো যেতে পারতো না- করোনাভাইরাস ঠিকই গেছে। তিনমাসের কম সময়ে এই অদৃশ্য শত্রুর আক্রমণে পৃথিবীতে মারা গেছে ২ লক্ষ ৭১ হাজার ৭৮২ জন। । আমাদের দেশে মারা গেছে গত শনিবার পর্যন্ত ২০৬ জন। সামনে এসব পরিসংখ্যান কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সেটা একমাত্র সৃষ্টিকর্তা জানেন।
করোনাভাইরাস কোথায় থেকে সৃষ্টি হলো আর উহান থেকে প্রায় সব মহাদেশ পর্যন্ত কীভাবে ছড়ালো তা নিয়ে অনেক উচ্চ মহলে বিতর্ক চলছে। তবে জ্ঞানবিজ্ঞানের উন্নতি, বিপুল অর্থসম্পদ ও শক্তিমদমত্ততাই জগতের শেষ কথা নয়। বিশ্বব্যবস্থা যদি মানবিক না হয়, নৈতিক মূল্যবোধের ভিত্তির ওপর যদি তা প্রতিষ্ঠিত না হয়, তাহলে একটা সময় প্রকৃতিই প্রতিশোধ নেয়। প্রাচীন সব ধর্মগ্রন্থেই সে কথা বলা হয়েছে। কুড়ি শতকের সবচেয়ে বড় বস্তুবাদী বিশ্লেষণী দার্শনীক অষ্ট্রিয়ার ভিটগেনেষ্টাইন মৃত্যুর আগে বলেছেন, ’দর্শন ও বিজ্ঞান যদি জীবনের প্রধান বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজে বের করে, তার পরেও থেকে যাবে মানবজীবনের দুর্ভেদ্য রহস্য।’
বর্তমান সংকটের শেষ কোথায় এবং কী আছে শেষে,তা বোঝা ও বলার ক্ষমতা আমরা আর কেউ রাখিনা। তবে যেটি বলা জরুরি  বিশ্বসংসার কে, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর, জীবনের নানা দিকের মেরামত দরকার হয়ে পড়েছে মনে হয়।  হয়তো আত্ম-অহংকার ও নানা সংকীর্ণতা পৃথিবীকে  জটিল করে তুলেছে। এখন আত্মোপলব্ধি করে বলতে হবে, এ পাপ তোমার, এ পাপ আমার, মাথা নত কর।  আর প্রার্থনা আর  অবিরত সম্মিলিত প্রচেষ্টায় হয়তো এই সংকটকে দূর করতে পারে।
লেখক ঃ সহকারী অধ্যাপক ও কলামিষ্ট
০১৭২৫-০৪৫১০৫