মে দিবস ও শ্রমিকদের আন্দোলন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:০৬ পিএম, ০২ মে ২০২১

আকিজ মাহমুদ :১৮৮৪ সালের ঘটনা। আমেরিকার শিকাগো শহরে শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদা আদায়ের লক্ষ্যে শ্রমিক আইন, ৮ ঘণ্টা কর্মদিবস এবং মানবতা বিরোধী কর্মের অবসান ঘটানোর মহতী দাবি নিয়ে মেহনতি শ্রমিকরা আন্দোলনে নেমে পড়েন। শ্রমিকরা তাদের উল্লেখিত দাবি মেনে নিতে ১৮৮৬ সালের ১লা মে পর্যন্ত সময় বেধে দেন। তাদের এ দাবিগুলো মালিকপক্ষ মেনে না নিলে, শিকাগো শহরে হে মার্কেট চত্বরে ৩ লক্ষাধিক মানুষ সমাবেশের জন্য সমবেত হয়। সমাবেশকে কেন্দ্র করে সতর্ক অবস্থান নেয় আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সমাবেশ শুরুর একটু পরেই একজন পুলিশ সদস্য বোমা বিস্ফোরণের শিকার হন। শান্ত পরিবেশ হঠাৎই অশান্ত হয়ে ওঠে। সেদিন পুলিশের অতর্কিত হামলায় পরিস্থিতি চরম বিশৃঙ্খলায় অবনিত হয়। সমাবেশে পুলিশের এলোপাতাড়ি গুলিতে ১০ জনের অধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়, আহত হয় আরও বহুসংখ্যক শ্রমিক। 
শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের এই মহতী ত্যাগ আমেরিকার শিকাগো শহর পেরিয়ে আজ মহাদেশ থেকে উপমহাদেশ পর্যন্ত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। ইতিহাস কোনভাবেই ভুলে যাবার নয়, পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশই শিকাগোর সেই সংগ্রামী শ্রমিকদের মনে রেখেছে। আমাদের দেশেও শিকাগোর সেই আন্দোলন স্মরণ করতে, বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে প্রতিবছর ১লা মে শ্রমিক দিবস পালন করা হয়ে থাকে। তৎকালীন সময়ে শিকাগো শহরে আন্দোলনে শরিক হওয়া শ্রমিকদের অবস্থা কেমন ছিল, কেনইবা শ্রমিকরা মালিকপক্ষের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছিল, তা আমাদের জানা দরকার। 
সেদিন শিকাগো শহরের সমাবেশটিতে লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছিল। মূলত তাদের প্রত্যেকের দাবি এবং মনের আকুতিও ছিল অভিন্ন। সেই সময় শ্রমিকদের দাস বা দাসীর মতো জীবনযাপনে বাধ্য করা হতো। দৈনিক ১২-১৫ ঘণ্টা বা তারও অধিক সময় ধরে শ্রমিকদের দিয়ে কাজ করে নিত স্বার্থান্বেষী মালিক শ্রেণি, বিনিময়ে শ্রমিকদের দেওয়া হতো অতি নগণ্য পারিশ্রমিক। শ্রমিকদের ছিলনা সামাজিক কোন সম্মান ও স্বীকৃতি। শ্রমিকদের প্রতি এই চরম অমানবিক আচরণই তাদেরকে আন্দোলনের পথ বেছে নিতে বাধ্য করায়। 
পাঠকরা হয়তো শ্রমিকদের কথা বলার জন্য আজকের এই দিনটিতে যথেষ্টই বিস্ময় প্রকাশ করতে পারেন। কেননা আমাদের দেশের গণমাধ্যম এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গরা সচরাচর ১লা মে বাদে শ্রমিকদের নিয়ে কথা বলতে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। শ্রমিক এবং বুর্জোয়া শ্রেণির মধ্যকার সামাজিক দাড়িপাল্লার ওজন এখনো একপেশেই রয়ে গেছে। চারপাশে তাকালেই শ্রমিকদের অসহায়ত্বের সেই ছবি ফুটে ওঠে। বঙ্গবন্ধু, ভাসানী, শেরে বাংলার মতো নেতারা তাদের সংগ্রামী জীবনের শেষ অব্দি এদেশের শ্রমিক মেহনতি মানুষের অধিকার এবং স্বার্থরক্ষার কথা বলে গেছেন। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে যদি দেশকে মূল্যবোধের একটি স্বচ্ছ আয়নার সামনে দাঁড় করানো যায় তাহলে শ্রমিকদের জন্য মানবিক, শোষণমুক্ত, বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করতে না পারার ক্ষতটা এখনো আমাদের পীড়া দিবে। শ্রমিকদেরকে বলা হয় একটি দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তির প্রধান নিয়ামক, কিন্তু এই শ্রমিকরাই বিশ্বজুড়ে আজ সবচেয়ে বেশি বৈষম্য ও নির্যাতনের শিকার। দেশের নির্দিষ্ট সংখ্যক শিল্পকারখানা এবং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত শ্রমিক বিদ্বেষমূলক কর্মকান্ডের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। শ্রমিকদের ঘামে গড়ে ওঠা এসব শিল্প প্রতিষ্ঠান এবং কলকারখানার মালিকদের অনেকে আবার শ্রমিকদের ন্যায্য পাওনা তো দেনই না, কখনো আবার তাদের প্রাপ্য পারিশ্রমিকটুকুও সময়মতো পরিশোধ করতে চান না। দেশে শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানগুলোর আকষ্মিক কর্মী ছাটাই, সময়মতো বেতন-ভাতা না দেওয়া এবং কর্মরত শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর দাবি। শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে কথা বলতে দেশের অনেক সংগঠনের তৎপরতা দেখা যায়। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে যে, এদেশে শ্রমিকদের জন্য সংগঠন যত বেড়েছে, শ্রমিকদের মধ্যে নীতিগত পার্থক্য ততই প্রকট আকার ধারণ করেছে। ১৯৮০ সাল পরবর্তী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের আন্দোলন এবং তার সফলতার মূল কারণ ছিল শ্রমিকদের মধ্যকার একতা। কিন্তু পরবর্তীকালে সরকার, সরকার বিরোধী এবং প্রভাবশালীদের চক্করে পড়ে শ্রমিক সংগঠনগুলো তাদের অন্তর্নিহিত শক্তি ক্রমশ হারিয়ে ফেলে। 
২০২০ সালে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলের বেশ কয়েকটা বাৎসরিক লোকসানের মুখে বন্ধ ঘোষণা করা হয়। অনিশ্চিত গন্তব্য আর কাজ হারানোর ভয়ে ভীত পাটকল শ্রমিকরা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। পাট শিল্পের সঠিক পরিকল্পনার অভাবে আজ সোনালী আঁশের সোনালি অর্থনীতির স্বপ্ন ভেঙে পড়েছে। চিনিকলগুলোরও একই অবস্থা। পাটকল ও চিনিকলগুলো হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। করোনাকালে শ্রমিকদের হঠাৎ কাজ হারানো একটি পরিবারকে কতটুকু ভোগান্তিতে ফেলতে পারে তা হয়তো একজন ভুক্তভোগীই বলতে পারবেন। ২০২০ সালে গার্মেন্টস শ্রমিকদের একাংশ করোনাকালে লকডাউন উপেক্ষা করে, কর্মী ছাটাইয়ের প্রতিবাদ আর বেতনের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। এসব আন্দোলনের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আমাদের কারোরই প্রশ্ন থাকার কথা নয়। এই মানুষগুলো একটি কর্মের ওপর ভর করেই তাদের পারিবারিক, সাংসারিক জীবন নির্বাহ করেন। করোনা পৃথিবীতে একটি কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছে, আর এতে শ্রমিকদের বঞ্চনা আরও বেড়ে গেছে। গবেষণা বলছে, কোভিডকালে সম্পদশালীদের সম্পদের পরিমাণ তুলনামূলক বৃদ্ধি পেয়েছে, যেখানে দারিদ্র্য ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী চরম মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য হয়েছে। শ্রমিকদের আন্দোলন আর মালিকপক্ষের অনমনীয়তা এদেশের শ্রমিক আন্দোলনগুলোর অতি সাধারণ ঘটনা। তবে পরিস্থিতি কখনও যে চরম অমানবিক, নিষ্ঠুর, সহিংসতার রূপ ধারণ করতে পারে তা চট্টগ্রামের অতি সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বাঁশখালীর কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সহিংসতার মাধ্যমে ফুটে উঠেছে। রমজানের এই পবিত্র মাসে অধিকার আদায়ের কথা বলার কারণে ৫ জন শ্রমিকের প্রাণটাই চলে গেল! নিরীহ শ্রমিকদের প্রতি পুলিশের এই আচরণ খেটে-খাওয়া মেহনতি মানুষদের মোটেই ভালো বার্তা দিবে না। বাঁশখালীর শ্রমিকদের অপরাধ কি ছিল, কেনইবা রমজানের এই পবিত্র মাস এবং সুবর্ণজয়ন্তীর বছরে এসে পুলিশ তাদের সাথে এমন আচরণ করলো?
গণমাধ্যম থেকে জানা যায়, বাঁশখালীর বিদ্যুৎ কেন্দ্রের শ্রমিকদের বেশ কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বেতন দেয়া হচ্ছিল না, একইসঙ্গে তারা বেতন বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিলেন, রোজার মাসে কাজের সময় পরিবর্তনের দাবিও জানিয়েছিলেন তারা। এছাড়াও শ্রমিকদের অভিযোগ সেখানে পানি ও টয়লেটের সংকট এবং আট ঘণ্টার পরিবর্তে ১০ ঘণ্টা কাজে বাধ্য করা হয় তাদের। শ্রমিকদের ভাষ্য, পুলিশ তাদের বিক্ষোভে ‘বিনা উসকানিতে’ গুলি চালিয়েছে। বিপরীতে পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, কয়েক হাজার বিক্ষুব্ধ শ্রমিকের ‘হামলার মুখে বাধ্য হয়ে’ গুলি চালাতে হয়েছে তাদের। 
পাঠক, লেখাটার শুরুটা করেছিলাম আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের ইতিহাস নিয়ে। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে পুলিশের বর্বর হামলার কারণ হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছিল পুলিশের উদ্দেশ্যে বোমা বিস্ফোরণ, কিন্তু কে বা কি কারণে এই বোমা হামলা চালিয়েছিল তা আজও প্রমাণ করা যায়নি। বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ঘটে যাওয়া আন্দোলনরত শ্রমিকদের উদ্দেশ্যে পুলিশের এমন আচরণ সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই জানা যাবে। বিশ্লেষকদের মতে, চট্টগামের বাঁশখালীর শ্রমিক হত্যার বিষয়টি মোটেই হাল্কা ভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। 
চট্টগ্রামের বাঁশখালীর শ্রমিক হত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একটি বিবৃতি জানিয়েছেন দেশের ৬৮ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের সংবিধান ও আইন অনুসারে পুলিশ কোনো অবস্থাতেই নিরীহ শ্রমিকদের উপর গুলি চালানোর অনুমতি পেতে পারে না। পুলিশ প্রবিধান ১৯৪৩-এর বিধান অনুসারে নিরাপত্তার জন্য হুমকিমূলক সমাবেশ অন্য কোনোভাবে ছত্রভঙ্গ না করা গেলে সর্বশেষ পন্থা হিসেবে ন্যূনতমভাবে শক্তি প্রয়োগের বিধান রয়েছে এবং সেক্ষেত্রে গুলি চালানোর আগে বার বার সাবধান করতে হবে এবং তা চালাতে হবে কাউকে হত্যা করা না বরং সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার উদ্দেশ্য থেকে’। 
১৯৭৩ সালে আলজিয়ার্সে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন- ন্যাম শীর্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, “বিশ্ব আজ দুইভাগে বিভক্ত, এক দিকে শোষক, আর অন্য দিকে শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে”। বঙ্গবন্ধু বেঁচে নেই, কিন্তু তার আদর্শ ধারণ করে বাঙালিকে এখনো সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন তারই সুযোগ্য কন্যা। পিতার মতোই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও শোষিতদের পক্ষেই অবস্থান, এমনটি মনে করেন এদেশের প্রতিটি শ্রমজীবী মানুষ। আর এজন্যই যেকোন দাবি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছেই আকুতি জানান নিরীহ এসব খেটে-খাওয়া মানুষগুলো। 
শ্রমিকদের আন্দোলনে রক্তপাত কোনভাবেই কাম্য নয়। আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের বড় অংশ ছিল এই শ্রমজীবী মানুষ। স্বাধীনতা পূর্ববর্তী-পরবর্তী সবসময়ই বঙ্গবন্ধু এদেশের শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ রক্ষার কথা বলেছেন। বাঁশখালীর ঘটনায় পুলিশের এমন আচরণ বিচার বিভাগীয় সুষ্ঠু তদন্তের দাবি রাখে। করোনাকালে বৈষম্য নিরসনের ক্ষেত্রেও এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত অত্যান্ত জরুরি। পুলিশের একপেশে এই দমননীতি পরিহার করা না গেলে, শ্রমিকদের সাথে এদেশের কতিপয় স্বার্থান্বেষী প্রভাবশালীদের বৈষম্য আরও প্রকট হয়ে উঠবে। যার একপেশে শিকার হবে শ্রমিক শ্রেণির সাধারণ মানুষগুলো। 
লেখক ঃ শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় 
০১৭৯৮-৯৭৭৯৬৬