পাপাচার হতে মুক্তি লাভের মাস রমজান

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২১

মোহাম্মাদ মোস্তাকিম হোসাইন : মানুষ মাত্রই কোন না কোন পাপ কার্যে আসক্ত হয়ে থাকে। তাই যাবতীয় পাপ থেকে মুক্তির জন্য সিয়ামের শিক্ষা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে থকে। আর যাবতীয় পাপ থেকে মুক্তি লাভের মাধ্যমেই অর্জিত হয় সিয়ামের প্রধান উদ্দেশ্য তাকওয়া। তাকওয়া নিয়ে অন্যদিন আলোচনা করব। আজ কিছু পাপের বিষয় নিয়ে তথ্য নির্ভর আলোচনা জ্ঞানী পাঠক সমাজের নিকট তুলে ধরছি। রমজানের রোজা কেবল উপবাস ব্রত পালন আর তারাবীহ নামাজ আদায়ের ভেতর সীমিত নয়। বরং পানাহার বর্জনের পাশাপাশি একজন রোজাদারকে সকল পাপাচার হতেও বিশেষভাবে বেঁচে থাকতে হবে। যেসব কাজকর্ম মাহে রমজানের বাইরেও নাজায়েজ এবং হারাম সেসব যদি আমরা পরিহার না করি তাহলে এ উপবাস ব্রত পালন পবিত্র সিয়ামের সঙ্গে উপহাস ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ব্যাপারে পবিত্র হাদীস শরীফের দ্ব্যর্থহীন বাণী হল- যে ব্যক্তি রোজা রেখেও মিথ্যাবচন ও মিথ্যাচার (অর্থাৎ সর্বপ্রকার পাপাচার) পরিহার করে না- তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (মানে কোন মূল্য নেই)। (বুখারী শরীফ) 
পরিতাপের বিষয় হল, আমাদের সমাজে রোজা রেখেও অনেকে সুদ, ঘুষ, মিথ্যাচার, ধোঁকাবাজি, মানুষকে উৎপীড়ন, ব্যবসায় খাদ্য ও ঔষধে ভেজাল প্রদান, দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়া, পরস্পরে হিংসা-বিদ্বেষ, গীবত (পরচর্চা), ঝগড়া, কলহ-বিবাদ ইত্যকার অন্যায় কর্মে লিপ্ত থাকেন। পবিত্র রমজানের পবিত্রতাকে দারুণভাবে ক্ষুন্ন করে। ¯্রষ্টাভীরু সদিচ্ছাসম্পন্ন মু‘মিনদের জন্যে যা দারুণ অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সিয়ামের কাক্সিক্ষত কল্যাণ লাভের পথে তাদের যাত্রা বাধাগ্রস্ত হয়। এ জাতীয় পাপাচারের মাধ্যমে পরিবেশ নষ্টকারী ব্যক্তিবর্গ বিশেষ অশুভ পরিণতির শিকার হবেন। 
আসুন আমরা সিয়ামের উপবাস ব্রত পালনের পাশাপাশি সকল পাপাচার হতে সযতেœ নিজেদেরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি। অন্যাথায় কষ্টের অনাহার ব্রত আমাদের জন্যে যথার্থ সুফল বয়ে আনবে না। 
রোজাদারদের জন্যে বিশেষভাবে বর্জনীয় বিষয় হল গীবত বা পরচর্চা। গীবত এমন একটি মারাত্মক পাপ যা রোজাকে সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এ ছাড়া সামগ্রিক বিবেচনায় আমাদের সমাজকে যে জিনিসটি সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করছে তাও হচ্ছে গীবত। মূলতই গীবত এমন একটি মারাত্মক ব্যাধি যা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে দারুণভাবে কর্দমাক্ত ব্যাধি যা আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে দারুণভাবে কর্দমাক্ত ও কলুষিত করছে। বিভেদ সৃষ্টি করছে আমাদের সামষ্টিক জীবনে। জীবনের সর্বস্তরে গীবতের অপকারিতা অত্যন্ত ভয়ংকর, দুঃখপ্রদ ও শোকাবহ। গীবতের দ্বারা রোজাদার ব্যক্তির মানসিক পরিচ্ছন্নতা নষ্ট হয়। পবিত্র কুরআন হাদীসের আলোকে এখানে এ ভয়াবহ ব্যাধিটি সম্পর্কে খানিকটা আলোকপাত জরুরি ও সংগত রোধ করছি। পবিত্র কুরআনে গীবত বা পরনিন্দাকে মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণের সঙ্গে তুলনা করে ইরশাদ হয়েছে : “এবং কেউ কারোর গীবত করবে না, তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত খেতে পছন্দ করবে? বস্তুত তোমরা তো তা ঘৃণাই কর। সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ পাক তওবা কবুলকারী মেহেরবান। (সূরা হুজুরাত : আয়াত-১২) 
গীবত হল কোন ব্যক্তির ব্যক্তিগত কোন বিষয়কে এরূপে উপস্থাপন করা যা শুনলে সে নির্ঘাত কষ্ট পাবে, কিংবা যা প্রকাশিত হওয়ার বিষয়টা তার কাছে আপত্তিকর। যদিও সে ত্রুটি সমালোচিতের মধ্যে বিদ্যমান থাকে। মুসলিম শরীফের একখানা হাদীস বর্ণিত হয়েছে- একবার হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “জানো গীবত কাকে বলে? লোকজন জবাব দিল, আল্লাহ এবং তাঁর রসূল ভাল জানেন। রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উত্তরে জানালেন যে, (গীবত হল) তুমি তোমার ভাইয়ের আলোচনা এভাবে করা যা সে অপছন্দ করে। সাহাবায়ে কিরাম আরয করলেন - হুযূর! যদি সে ত্রুটি বাস্তবে তার ভেতর বিদ্যমান থাকে তবেও কি গীবত হবে? নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম উত্তর দিলেন হ্যাঁ, যদি বাস্তবে থেকে থাকে তবেই তো সেটা গীবত হবে, অন্যথায় তাতো হবে অপবাদ। (মুসলিম শরীফ)

এই মহান রমজান মাসে নিজেদের পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যস্ততাকে যথাসম্ভব কমিয়ে বেশির ভাগ সময় আল্লাহর ইবাদত-বন্দেগীতে এবং আত্মজিজ্ঞাসায় লিপ্ত থাকা উচিত। হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে- “হাসূসু আনফুসুকুম কবলা 
আন তু হাসাবু।” তোমরা হিসাবের সম্মুখীন হবার পূর্বে নিজেরা নিজেদের হিসাব গ্রহণ কর। এ হাদীসে সুস্পষ্টরূপে আত্মজিজ্ঞাসার কথা বলা হয়েছে। পার্থিব কোন বিষয়ে উন্নতি লাভের জন্যে যেমন প্রাপ্তি ও বঞ্চনার হিসাব-নিকাশ জরুরি ঠিক তেমনিভাবে দ্বীনী ও ঈমানী উন্নতির মধ্য দিয়ে পরকালীন সাফল্য লাভের জন্যেও ‘মুহাসাবায়ে নাফস’ তথা আত্মজিজ্ঞাসা জরুরি। অতীত জীবনের প্রাপ্তি ও বঞ্চনা নেক আমল ও বদ আমল ইত্যাদি নিয়ে ভাবতে হয়। কৃত নেক আমলের জন্যে যেমন আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে হয়, তেমনিভাবে অনুতপ্ত হয়ে নতুন শপথ গ্রহণ করতে হয়, ঘটে যাওয়া ভুল-ভ্রান্তি এবং পাপাচারের জন্যে। আর পবিত্র মাহে রমজানই হল এসবের জন্যে সর্বোত্তম সময়। দুঃখপ্রদ হলেও সত্য যে, আমরা এ ব্যাপারে দারুন উদাসীন। পবিত্র রমজানে আমাদের পার্থিব ও বৈষয়িক ব্যস্ততা পূর্বের চেয়েও বহু গুণে বেড়ে যায়। ব্যবসায়ী বন্ধুগণ এ মাসকে গ্রহণ করেন বিশেষ উপার্জনের মাস হিসেবে। রাতদিন ব্যবসার ধান্ধায় এতটা আচ্ছন্ন থাকেন যে, কখনও তার অজান্তে নামাজের ওয়াক্ত পর্যন্ত চলে যায়। আবার যারা নামাজের ব্যাপারে মোটামুটি যতœবান তাদেরও অনেকে কোন মতে জামাত ছাড়া দায়সারা গোছের নামাজ আদায় করে নেন। এসব বিষয়ে আমাদের বোধেদয় হওয়া উচিত। 
সিয়াম মানুষের নানামুখি উন্মাদনা নিয়ন্ত্রণের বলিষ্ঠ প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজকে অপরাধমুক্ত এক শান্তির সমাজে পরিণত করার প্রয়াস গ্রহণ করেছে। মূলত সিয়াম ব্রত যৌন ক্ষুধাকে নিবৃত্তি করে। যেমন রাসূল (সা) বলেছেন ঃ “হে যুবকগণ! বিয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সম্পদ সংগ্রহের সামর্থ্যবানদের বিয়ে করা উচিত। আর এটি যার জন্য অসম্ভব সে যেন সিয়াম ব্রত পালন করে। কেননা সিয়াম যৌন ক্ষুধাকে দমনকারী।” (বুখারী মুসলিম) পবিত্র রমজান মাসে আরেকটি বিষয় বর্জনীয় তা হচ্ছে অনর্থক কথাবার্তা ও কাজকর্ম একান্তভাবে পরিহার করা। এ ম?হান মাসে নিছক লৌকিকতাপূর্ণ সারহীন অনুষ্ঠানাদিও বর্জনীয়। যেসব কর্মকান্ডের সঙ্গে দ্বীনের কোন সম্পর্ক নেই তা যথাসম্ভব পরিহার করে যেসব কর্মকান্ড ও আমলের সঙ্গে দীনের সম্পর্ক রয়েছে, কুরআন-হাদীসে যেসব আমলের নির্দেশ একান্তই প্রত্যক্ষ ও সুস্পষ্ট, যেসবের মাধ্যমে বান্দা ও আল্লাহর মাঝে সুনিবিড় সম্পর্ক স্থাপিত হয়, হৃদয়ে পরকালের ভাবনা জাগ্রত হয়- সেসব কাজকর্ম ও আমলকে প্রাধান্য দেয়া দরকার। যেমন বেশি বেশি নফল নামায আদায়, কুরআন শরীফ তিলাওয়াত, অধিক পরিমাণে দরূদ শরীফ পাঠ, আল্লাহর পথে দান খয়রাত, যিকির-আযকার, তাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি। এছাড়া নির্ভরযোগ্য দ্বীনী বই-পুস্তক পাঠ, ¯্রষ্টাভীরু মুত্তাকী আলিম-উলামাদের কাছে গিয়ে দ্বীনী কথাবার্তা শ্রবণ ইত্যাদি কাজেও পবিত্র রমজানের সময় ব্যয়িত হওয়া উচিত। স্মর্তব্য যে, ইবাদতই হল দ্বীন ইসলামের রূহ বা প্রাণ। ইবাদতের মাধ্যমেই একজন মু’মিন সুদৃঢ় ঈমান ও আত্মশক্তি অর্জন করে থাকেন। ইবাদতের যথাযথ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সাহাবায়ে কিয়াম, তাবেয়ীন ও তাবে-তাবেয়ীনগণ সার্বত্রিক জীবনে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন। মূলত ব্যক্তি জীবনে দ্বীনের যথার্থ অনুশীলনের মধ্য দিয়েই সামাজিক, রাষ্ট্রিক ও আন্তর্জাতিক জীবনে দ্বীন প্রতিষ্ঠার ভিত্তি নির্মিত হয়। 
হাদীস শরীফে ইরশাদ হয়েছে : আজমিলূ ফিতাত্বালাব ও তাওয়াককালু আলায়হি- অর্থাৎ উপায়-উপকরণের অনুসন্ধান যথাসম্ভব সংক্ষেপ কর এবং আল্লাহর ওপর নির্ভর কর। সত্যিকার অর্থে যদি আমরা আল্লাহ তা‘আলাকে ‘ক্বাদিরে মুতলাক্ব’ তথা সর্বশক্তিমান ভাবতে পারি তাহলে পার্থিব উপায়-উপকরণ সংগ্রহে আমাদেরকে অস্থির হতে হবে না। এ জন্যে আল্লাহর প্রতি ঈমান দৃঢ় করতে হবে। হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত করতে হবে অবিচল বিশ্বাস। একান্তভাবে কল্যাণকামিতার ভাবনায় আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে এতক্ষণ পবিত্র মাহে রমজানের মাহাত্ম্য, শিক্ষা, এ মহান মাসের করণীয়-বর্জনীয় এবং আমাদের কতিপয় ত্রুটি ও অসংলগ্নতার কথা সংক্ষেপে আলোচিত হল। সমালোচনার জন্যে নয়, বরং আমরা যাতে সাবধান হয়ে পবিত্র রমজানের বরকত ও সমূহ কল্যাণকর প্রভাব আমাদের‘ জীবনে গ্রহণ করে ইহকাল-পরকাল সফল হতে পারি সে উদ্দেশ্যেই এ আলোকপাত। 
অবশেষে আসুন, পবিত্র মাহে রমজানের মহান আল্লাহর আহবানে সাড়া দিয়ে আমরা আল্লাহমুখী হই, সকল পাপাচার বর্জন করে ইবাদতের মাধ্যমে আমাদের সিয়াম সাধনাকে সার্থক করে তুলি, আমাদের জীবন। আলোকিত হৃদয়ের সুন্দর মানুষের বসবাসে আবার হেসে উঠুক এই বসুন্ধরা। মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দিন।    
লেখক ঃ ইসলামি গবেষক, কলামিস্ট, প্রবন্ধিক ও কলেজ প্রভাষক 
[email protected] 
০১৭১২-৭৭৭০৫৮