সব পথ খোলা রাখতে হবে

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৫৩ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২১

মামুন রশীদ : করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আঘাত হেনেছে বাংলাদেশে। বিশ্বের কোনো কোনো দেশ এ সময়ে তৃতীয়, চতুর্থ ঢেউও মোকাবেলা করছে। আমরা এবং আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে চলছে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ। করোনার এই দ্বিতীয় দফা ফিরে আসা আমাদেরকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। চলতি বছরের শুরুতে যখন করোনা সনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের আশেপাশে, তখন আমরা অনেকটাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছি। আমাদের বাড়তি সতর্কতা তখন অনেকটাই আলগা হতে শুরু করে। মানুষের মধ্যে ভয় কাটতে শুরু করে। জীবনযাত্রাও অনেকখানি স্বাভাবিক হয়ে আসতে থাকে। ঠিক তেমনি সময়েই করোনার তীব্রতা আবার বাড়তে শুরু করে। সেই শুরুর ভয়াবহতা একদিনে মৃত্যুর সংখ্যা শতকের ঘরে নিয়ে যায়। তবে আমাদের চেয়েও প্রতিবেশী দেশটিতে করোনার তীব্রতা ভয়াবহ আকার নিয়েছে। প্রতিদিন যেভাবে দেশটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে সক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে, তা রীতিমতো আতঙ্কের। সেই আতঙ্ক আরও বেড়েছে দেশটিতে করোনার নতুন ভ্যারিয়েন্ট সনাক্ত হওয়ায়। ফলে প্রায় নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে সংক্রান্তের হার। দেশটির অনেক স্থানেই হাসপাতালগুলোতে উপচে পড়া রোগীর ভিড় সামাল দেওয়ার কথা সংবাদমাধ্যমে আসছে। দেশটিতে দৈনিক মৃত্যু প্রায় তিন হাজারে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, শ্মশানগুলোতে মৃতদেহ পোড়ানোর জায়গা হচ্ছে না। অনেকের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য পার্কিং লটগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে। এমনকি কবরস্থানেও জায়গা না থাকার কথা উঠে আসছে। শ্মশানে মৃতুদেহ দাহ করার কাঠ ফুরিয়ে যাওয়ায় শ্মশানের দরজা বন্ধ করে দেবার মতো করুণ ও কষ্টের খবরও আমাদের পড়তে হয়েছে, হচ্ছে। 
আমাদের এখানে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পেছনে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং যুক্তরাজ্যে ছড়ানো করোনার ধরণটিকে চিহ্নিত করা হয়। একটি গবেষণায় বলা হয়, আমাদের এখানে নতুন আক্রান্তদের মাঝে ৮১ শতাংশের মধ্যেই শনাক্ত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার ধরন। এ ধরনটি আগের যে কোন ধরনের তুলনায় ৭০ শতাংশ বেশি সংক্রমণপ্রবণ। ধরনটির রয়েছে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা। যার প্রমাণ ইতোমধ্যে আমরা হাতে নাতে পেয়েছি। এ সময়ে নতুন করে ভয় জাগাচ্ছে করোনার ভারতীয় ধরন। ভারতে শনাক্ত হওয়া ডাবল ও ট্রিপল মিউটেন্টটিকে বিজ্ঞানীরা আরও ভয়াবহ বলে চিহ্নিত করছেন। সেই ভয়াবহতা কতদূর বিস্তৃত হতে পারে, সংবাদমাধ্যমের কল্যাণে তা এখন কারোই অজানা নয়। সংক্রমিত রোগীদের অক্সিজেন সংকট চরমে পৌঁছায় মৃত্যুহার বেড়েছে। দেশটিতে রোগীদের অক্সিজেন সংকট দূর করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এগিয়ে আসছে। ইতোমধ্যে জার্মানি ও সৌদি আরবের পক্ষ থেকে অক্সিজেন সহায়তার কথাও আমরা জেনেছি। ভারতে ছড়ানো করোনার এই নতুন ধরনটি যেন বাংলাদেশে আসতে না পারে সেজন্য সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ইতোমধ্যে সরকারের তরফ থেকে সীমান্তে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। চৌদ্দ দিনের জন্য দেশটির সঙ্গে স্থলপথের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে। অবশ্য এই সিদ্ধান্তের আগে থেকেই বন্ধ রয়েছে আকাশপথে যোগাযোগ।  রকারের এই সিদ্ধান্ত বিশেষজ্ঞমহলে প্রশংসিত। আমাদের এখানে করোনার সংক্রমণ কিভাবে ছড়িয়েছে তা আজ কারো অজানা না। প্রথম দফায় আমরা বিদেশ থেকে আগতদের সঠিকভাবে কোয়ারেন্টিনে রাখতে সক্ষম হইনি। এক্ষেত্রে যারা বিদেশ থেকে এসেছিলেন তাদের অসচেতনতা, দায়িত্বহীনতা এবং অসতর্কতা যেমন রয়েছে, তেমনি কর্তৃপক্ষের ব্যর্থতাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেদিক থেকে এবারে শুরুতেই সরকারের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। তবে এক্ষেত্রে সরকারকে কঠোর হতে হবে। সঠিক সিদ্ধান্ত দেবার মতো, তা যেন যথাযথভাবে এবং সর্বার্থেই পালিত হয়, সেদিকটিও নিশ্চিত করতে হবে। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন থেকে করোনার লক্ষণ নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করা কয়েকজনের হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাবার কথা আলোচনায় এসেছে। প্রথম দফায় বাংলাদেশে করোনা ছড়ানোর পেছনে ইতালির ভেরিয়েন্ট ছিল আলোচনায়। সে সময়েও এরকম পালিয়ে যাওয়া, কোয়ারেন্টাইন যথাযথভাবে নিশ্চিত না করা, কোয়ারেন্টাইনে না থাকতে চাওয়া নিয়ে হম্বিতম্বির কথা এখনও ঘুরে ফিরে আলোচনার টেবিলে থাকে। এবারও সেই পরিস্থিতি তৈরি হোক তা কারোই চাওয়া না। এমনিতেই গতবারের তুলনায় আমাদের সংক্রমণের হার বেশি। মৃত্যু হারও বেশি। আইসিইউ বেডের স্বল্পতা নিয়েও ইতোমধ্যে নানা প্রতিবেদন প্রকাশ পেয়েছে। এ অবস্থায় যদি কারো অসতর্কতায়, অসচেতনায় বা দায়িত্বহীনতায় আবার নতুন ভেরিয়েন্ট ছড়িয়ে পড়ে তা সামাল দিতে কতোটা কাঠখড় পোড়াতে হবে, তা করোনা নিয়ন্ত্রণে ভারতের বর্তমান অবস্থা দেখে সহজেই অনুমেয়। তাই নতুন ভেরিয়েন্টকে আটকাতে সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়নে সবাইকে আন্তরিক হতে হবে। একইসঙ্গে সম্ভাব্য বিপদ মোকাবেলায় আমাদের পূর্বপ্রস্তুতিও জরুরি। করোনা রোগীর জন্য অক্সিজেন সংকট যেন তৈরি না হয়, সেদিকটিও বিবেচনায় নিয়ে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে। দেশের হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন, আমাদের উৎপাদন তার চেয়ে কম। যা মেটানো হতো ভারত থেকে আমদানির মাধ্যমে। ভারতেরই এই মুহূর্তে অক্সিজেন ঘাটতি। স্বাভাবিকভাবেই তারা রফতানি বন্ধ করে দিয়েছে। তবে বর্তমান অবস্থায় অক্সিজেন নিয়ে সংকট তৈরি না হলেও ভবিষ্যতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হলে তা মেটানোর জন্য বিকল্পপথগুলো এখন থেকেই খোলা রাখতে হবে।
লেখক ঃ কবি, সাংবাদিক
০১৯১২-৩০৬৩৫৬