চিত্ত মম বিকশিত হোক নৃত্যের তালে তালে

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৪৯ পিএম, ২৯ এপ্রিল ২০২১

মাহাবুব হাসান সোহাগ : নৃত্যকলা একটি দৃশ্যমান শিল্পকলা, যা মানুষের শারীরিক অঙ্গভঙ্গি ও ভিতরের ভাব রসের সম্মিলিত প্রয়াসে মুদ্রা, তাল ও ছন্দের সমন্বয়ে দৃশ্য কাব্য রচনার মাধ্যমে কোন কিছু প্রকাশ করে। ধর্ম, জীবন, জীবিকা, নান্দনিকতা, সামাজিকতা ও সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে প্রভাব আছে এ শিল্পের প্রকাশে। এর ইতিহাস খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ বছরের ঐতিহ্য বহন করে চলছে। মানুষের ভাষা আবিষ্কারের বহু আগে থেকেই নৃত্যকলা প্রচলনের বহু তথ্য আমরা ভারতীয় ও মিশরীয় গুহাচিত্রে দেখতে পাই। নৃত্য কলা একটি গুরুমুখি বিদ্যা বা ঘরনা নির্ভর শিল্প। ওস্তাদ বা গুরুজী সম্বোধন হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে, গুরু শিষ্যের এ পরম্পরা। সে পথেই আলো ছড়িয়েছেন আমাদের দেশের নৃত্য জগতের উজ্জল নক্ষত্ররা। তাদের আলোয় আলোকিত হয়েছে নৃত্যাঙ্গন। আমি শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি মরহুম বুলবুল চৌধুরী, মরহুম গওহর জামিল, মরহুম রওশন জামিল, মরহুম সাহেদ আলতামাস, মরহুম রাইজা খানম ঝুনু, মরহুম বজলুর রহমান বাদল, মরহুম আব্দুস সামাদ পলাশ সহ যে সকল নৃত্য গুরুরা না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন এবং বর্তমানে যে সকল নৃত্যগুরুরা রয়েছেন তাদের কেউ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। 
খ্রিস্টপূর্ব তিনশত শতকের সময় কালে উদ্ভব ঘটে নৃত্যে। শরীর, ছন্দ, আত্মা, মন, সংগীত এসব নিয়ে নান্দনিক ছন্দিত শরীরী প্রতিমাই হলো নৃত্য। কিংবদন্তী নৃত্য সম্রাট উদয় শঙ্কর এক আর্টিকেলে বলেছেন নৃত্য হলো লুকিয়ে থাকা আত্মার ভাষা, পন্ডিত বিরজু মহারাজ বলেছেন নৃত্য হলো প্রকৃতি, হৃদপিন্ডের ধুকপুক শুনলেই বোঝা যায় সে তার নিজস্ব ছন্দে নাচছে। শাস্ত্রীয় নৃত্য ও সঙ্গীত মিলে মন ও আত্মার মধ্যে ভারসাম্য তৈরী করে। নৃত্য খুব সহজেই সবার কাছে পৌঁছায় ও গ্রহণযোগ্যতা পায়। নৃত্যের মাধ্যমে সামাজিক বন্ধন দৃঢ় হয়, মানুষে মানুষে বিনিময় ঘটে, কথা হয়। নৃত্য এমনই একটি মাধ্যম যা আমাদের আশা আকাঙ্খাকে একটা আকৃতি দেয়, যা প্রত্যেকের ব্যক্তিক-অভিব্যক্তির জন্যও প্রয়োজনীয়। দু:সময়ে দুর্দিনে নৃত্য ও অন্যান্য উপস্থাপন- কলা মানুষের মধ্যে আনন্দ বিতরণ করে যা আমাদের সত্তার ও সময়ের পরিচয় ঘটায়। মানুষের মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম পন্থা নাচ এর উদ্ভব যে বহু আগের তা বলার অপেক্ষা রাখে না। নৃত্য আমাদের সংস্কৃতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলার নৃত্য নিয়ে আমরা রীতিমতো গর্ব করি। বহির্বিশ্বে বাংলায় আদি লোক নৃত্য পরিবেশন করে এই দেশের নৃত্য শিল্পীরা বাংলার নৃত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। সংস্কৃতিমনা আমাদের এ জাতি আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতি বহির্বিশ্বের মঞ্চে সুনামের সাথে পরিবেশন করেছে এদেশের নৃত্য শিল্পীরা। আমাদের সংস্কৃতিতে ঠিক কবে থেকে নৃত্যের আবির্ভাব ঘটেছে তা সুস্পষ্ট নয়। তবে নৃত্যে রয়েছে হাজার বছরের ঐতিহ্য। স্বাধীনতাত্তোর এদেশে নৃত্যের ব্যাপক প্রসার ঘটে। ঠিক সে সময় থেকে এদেশের নৃত্য বিশ্বের দরবারে নিজের একটি শক্ত অবস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। ধ্র“পদি নৃত্যের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি উত্তরণ ঘটে এ দেশীয় লোক নৃত্য ও গীতি নৃত্য নাট্যের। এ নৃত্য ধারা দিয়ে এ দেশের নৃত্য শিল্পীরা  বিদেশে নৃত্য পরিবেশ করে বাংলার সংস্কৃতিকে উজ্জল করেছে। এক্ষেত্রে অগ্রজ নৃত্য গুরুরা আমাদের  যে নৃত্য শিল্পের পথ দেখিয়েছেন তাদের পথ দেখাতেই আমরা নৃত্য কর্মীরা এই শিল্প নিয়ে কাজ করে যাচ্ছি। সময়ের ক্রম বিবর্তনে পৃথিবীর নানা দেশে আধুনিক ও সমকালীন নৃত্যের চর্চা রয়েছে। বর্তমানে আমাদের দেশে ও পাশ্চাত্য সমকালীন নৃত্যের প্রভাব পড়েছে। এবং আমাদের আদি যে লোকজ নৃত্য সেটি কালের বিবর্তনে হারিয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশে বিভিন্ন জায়গায় নিজস্ব ধারায় তাদের নৃত্যের ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা যদি সেই নৃত্যগুলোকে নিয়ে সময় উপযোগী চিন্তা করে একটি বিষয় তুলে ধরি তাহলে বাংলার নিজস্ব নৃত্যে সমকালীন নৃত্যধারায় আবির্ভূত হবে। তাহলে আমাদেরকে পাশ্চাত্য সমকালীন নৃত্যের দিকে আর তাকাতে হবে না। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে নৃত্য এমন একটি শিল্প যার কোন ভাষার প্রয়োজন হয় না। কেননা নৃত্যের ভাষা কাজ করে দৈহিক ভঙ্গিমায়। নৃত্যের মুদ্রাগুলো যেন নিজের মনের ভাবকেই প্রকাশ করে। নৃত্য সহজ কোন বিষয় নয়। গান গেয়ে কিংবা সুর দিয়ে মনের ভাব প্রকাশ করা হয় না। নৃত্য সম্পূর্ণ দেহভঙ্গি দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়। আর এ ভাব ফুটিয়ে তোলা সহজ সাধ্য বিষয় না, প্রয়োজন সঠিক শিক্ষা ও অধ্যবসায়ের। বর্তমানে আমরা যেন এই জায়গাটায় এসে পথ হারিয়ে ফেলছি। আমাদের মধ্যে এক অ¯িথরতা বিরাজ করছে কি ভাবে শর্টকার্ট নৃত্য শিল্পী হওয়া যায়। আমাদের কে মনে রাখতে হবে নৃত্য শিল্পী হওয়ার জন্য দরকার সঠিক শিক্ষা ও অধ্যবসায়ের। সঠিক শিক্ষা ও অধ্যবসায় ছাড়া কোন ভাবেই একজন পরিপূর্ণ নৃত্য শিল্পী হওয়া সম্ভব নয়।ঐতিহ্যের এ ধারক নৃত্য শিল্প আমরা যেন বহন করতে পারছিনা বা চেষ্টাও করছিনা। আমাদেরকে প্রকৃত নৃত্য চর্চায় মনোনিবেশ করতে হবে। আমাদের শিখতে হবে মন দিয়ে এবং এই শিল্পকে মন থেকে ভালোবাসতে হবে। তবেই এই শিল্পের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে। দেশ বরেণ্য নৃত্য গুরু মরহুম বুলবুল চৌধুরী তার এক আর্টিকেলে বলেছিলেন আর্টকে গতিশীল রাখতে হলে, শিল্পীর সৃষ্টিশীল কাজের প্রতি মনোনিবেশ করতে হবে।
আইটি আই ইন্টারন্যাশনাল ড্যান্স কমিটি ১৯৮২ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস পালন শুরু করে। বাংলাদেশেও প্রতি বছর আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস পালন করে থাকে বাংলাদেশ নৃত্য শিল্পী সংস্থা সহ অন্যান্য নৃত্য সংগঠন। এই দিবসটি পালন করা হয় ২৯শে এপ্রিল ক্ষণজন্মা নৃত্য শিল্পী জাঁ জর্জ নভেরা (১৭২৭-১৮১০) জন্ম দিনকে মনে রেখে। সারা পৃথিবীতে নানান অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই দিনটি পালিত হয়। নৃত্য মানুষে সম্মিলন ঘটায় তার পরিচিত ভাষা দিয়ে। নৃত্যের আনন্দ বিনিময় ঘটে দর্শকদের মধ্যে, তার বোধ উপলদ্ধিকে সচেতন করার জন্য। এই শিল্পের উন্নয়নের জন্য পৃথিবীর সর্বত্র নৃত্যে বিভিন্ন ভঙ্গি ও আঙ্গিক দিয়ে আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবস পালিত হচ্ছে। আজকের এই দিনে এই প্রাচীন কলাটির চিরায়ত ঐতিহ্য স্মরণ করি, সবাইকে কাছে টানা এবং একত্র করণের অসম্ভব শক্তিকে বরণ করে নেই। আজকের এই দিনে যারা নৃত্যের সৌন্দর্য ও এর অন্তর্নিহিত শক্তিকে বুঝতে পেরেছেন, ভালোবেসেছেন তাদের সবার জন্য আন্তর্জাতিক নৃত্য দিবসে নূপুরের শুভেচ্ছা। 
লেখক ঃ নৃত্য শিল্পী, নৃত্য পরিচালক ও সাধারণ সম্পাদক,
আমরা ক’জন শিল্পী গোষ্ঠী, বগুড়া।  
বাংলাদেশ নৃত্য শিল্পী সংস্থা, বগুড়া জেলা শাখা 
০১৭১২-০৯৫৫১০