টিকাদান কর্মসূচি আরো সহজ ও সু-সমন্বিত করতে হবে

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৮:২৯ পিএম, ২৪ আগষ্ট ২০২১

ওসমান গনি: পৃথিবীর অন্যান্য দেশের ন্যায় বাংলাদেশেও করোনাভাইরাসের গণটিকা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এবার টিকা গ্রহণে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ব্যাপক আনন্দ ও উৎফুল্লতা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনার জন্য সরকারি ও বেসরকারিভাবে ব্যাপক প্রচার ও প্রচারণা চালানোর কারণে মানুষের মধ্যে টিকা গ্রহণে সচেতনতা ফিরে আসছে। শতবাধা বিপিত্তর মধ্যে ও মানুুষ টিকা গ্রহণ করছে। এটা আমাদের মতো ছোট দেশের জন্য আনন্দের খবর। যদিও প্রথম অবস্থায় দেশের মানুুষ টিকার প্রতি তেমন আগ্রহ ছিল না। পরবর্তীতে টিকা গ্রহণের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু বর্তমানে সেই পরিমাণে টিকা পাওয়া যাচ্ছে না। তাও আবার যে পরিমাণ টিকা পাওয়া যাচ্ছে তার পেছনে সরকারের সদিচ্ছা থাকার কারণে সম্ভব হয়েছে। তবে সরকারের বাস্তব পরিকল্পনা রয়েছে পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি নাগরিক টিকার আওতায় আসবে। টিকা পাওয়া না পাওয়া নিয়ে অস্থির হওয়ার কারণ নেই। সবচেয়ে বড় কথা হলো টিকাদানে স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা রাখতে হবে। বর্তমানে টিকা দেয়া সেন্টারগুলোতে টিকার জন্য মানুষের যে উপচে ভীড় লক্ষ্য করা যায় তা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। করোনা নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যবিধি মানার যে বিধান রয়েছে সেখানে তার বিন্দুমাত্র নাই। গাদাগাদি আর ঠেলাঠেলি করে সবাই সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। এ থেকেও করোনাভাইরাস ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশী রয়েছে। এ উপচে পড়া মানুষের ভীড় নিয়ন্ত্রণের জন্য কোন লোক নাই। যারা দায়িত্বে আছে তারা মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এখানে মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করতে হবে। নাহলে যেকোন সময় টিকা নিতে গিয়ে দুর্ঘটনাও ঘটতে পারে। 
দেশের ৪ হাজার ৬০০ ইউনিয়ন-পৌরসভার ১ হাজার ৫৪টি ওয়ার্ড ও ১২টি সিটি করপোরেশনের ৪৩৩টি ওয়ার্ডে  গণটিকা কার্যক্রমে টিকা কেন্দ্রগুলোতে টিকা গ্রহণেচ্ছু মানুষের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও বিপুল উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। গত কিছুদিন ধরে ৩ লাখ করে নিয়মিত টিকাদান চলছিল। টিকা দেওয়ার মোট সংখ্যা থেকে এই ৩ লাখ বাদ দিলে প্রথম দিন ২৭ লাখের বেশি গণটিকা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের কোভিড-১৯ টিকা ব্যবস্থাপনা কমিটির মতে, প্রথমদিনেই লক্ষ্যমাত্রার ৯২ থেকে ৯৫ শতাংশ টিকা দেওয়া হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটা একটা বিরাট সাফল্য। এ থেকে দুটি বিষয় বিশেষভাবে সামনে এসেছে। প্রথমত, দেশের মানুষ যে টিকা নিতে খুবই উৎসাহী ও আগ্রহী সেটা প্রমাণিত হয়েছে। টিকার ব্যাপারে গণসচেতনতা বেড়েছে, এটা তারও প্রমাণ। দ্বিতীয়ত, এই গণটিকা কার্যক্রম সফল করে তুলতে স্বাস্থ্যকর্মীরা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। এটা তাদের দায়িত্বনিষ্ঠারও প্রমাণ। এ জন্য তাদের ধন্যবাদ প্রাপ্য। দেশব্যাপী করোনার গণটিকাদানের এমন কর্মসূচি এই প্রথম হওয়ায় কোথাও কোথাও অনিয়ম, বিশৃঙ্খলা, স্বজনপ্রীতি, সিদ্ধান্তের হেরফের ও হয়রানির ঘটনা ঘটেছে। জানা গেছে, প্রতি কেন্দ্রে ২শ থেকে ৩শ টিকা সরবরাহ হয়। কিন্তু টিকার তুলনায় লোকসংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেককেই টিকা না পেয়ে ফেরৎ যেতে হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে বিফল হওয়া বিড়ম্বনাকর ও হতাশাজনক। জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন ও টিকা একই দিনে হওয়ায় বিলম্ব ও হয়রানি বেশি হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে টিকাকেন্দ্রের তাৎক্ষণিক পরিবর্তনও হয়রানি বাড়িয়েছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের হস্তক্ষেপ ঘটেছে কোনো কোনো ক্ষেত্রে। এনজিওদের সম্পৃক্ততা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনিয়মের জন্ম দিয়েছে। টিকাকেন্দ্রে উপচেপড়া ভিড় নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি। স্বাস্থ্যবিধি ব্যাপকভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। 
দেখা যাচ্ছে, পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ত্রুটি ও দুর্বলতা ছিল। সুচিন্তিত সিদ্ধান্তের অভাব, সুষ্ঠু পরিকল্পনার অপারগতা এবং সমন্বয়হীনতা গণটিকা দানের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা গেছে। টিকা গ্রহণকারী করোনা থেকে তুলনামূলকভাবে অধিক নিরাপদ। অথচ এই টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রে আমরা বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে পারিনি। ভারতের সেরামের ওপর এককভাবে নির্ভরতা যে সঠিক সিদ্ধান্ত ছিল না, সেটা প্রমাণিত হয়েছে। সেরাম টিকা না দেওয়ায় আমরা টিকাদানে পিছিয়ে পড়েছি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে টিকা সংগ্রহের ক্ষেত্রেও আমাদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়। উপহার ও কেনা টিকার সংখ্যা নিয়েও সরকারি মহলের একেক জন একেক কথা বলেছেন। টিকাদান নিয়ে সমন্বিত সিদ্ধান্ত লক্ষ্য করা যায়নি। নতুন করে টিকার জন্য নিবন্ধন শুরু হয়েছে এবং মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া প্রত্যক্ষ করা গেছে। ইতোমধ্যে ১ কোটিরও বেশি মানুষ নিবন্ধন করেছে। নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জটিলতা মোকাবিলা করতে হয়েছে অনেককে। নিবন্ধন দ্রুত ও সহজ হলে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা আরো অনেক বেশি হতো। নিবন্ধন আসল নয়, টিকা পাওয়াই মূল কথা। সেই টিকা, যার কোনো নিশ্চয়তা নেই। এখন নিবন্ধনকারীরা ফিরতি বার্তা পায়নি। নিবন্ধনকারীদের টিকার ব্যবস্থা না করে গণটিকা কর্মসূচি নেওয়া কতটা সুবিবেচনার পরিচায়ক হয়েছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। টিকা নিয়ে এ ধরনের তালগোল অবস্থা কাম্য হতে পারে না। নিয়মিত টিকাদান অব্যাহত ও জোরদার করার পাশাপাশি গণটিকা কার্যক্রম চলতে পারে। যত দ্রুত সম্ভব দেশের মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। এক্ষেত্রে গণটিকা কার্যক্রম একটি যথাযোগ্য উদ্যোগ বটে, তবে তা অবশ্যই ত্রুটিমুক্ত ও হয়রানিমুক্ত হতে হবে। টিকার ব্যাপারে কোনো কারণে মানুষের মধ্যে হতাশা-নিরাশা ও অনীহাভাব যাতে না আসে, তা দেখতে হবে। চলতি বছরের মধ্যে আমাদের টিকাদান কর্মসূচি এমন একটি পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে, যাতে বেশিরভাগ মানুষ ২ ডোজ টিকা পায়। এজন্য প্রয়োজনীয় টিকার সংস্থান করতে হবে। কিনে হোক, আর উৎপাদন করে হোক প্রয়োজনীয় টিকার বন্দোবস্ত করতে হবে। টিকার প্রয়োজন সহসা কমে যাবে বা শেষ হবে, এমন মনে করার কোনো কারণ নেই। সুতরাং টিকার আয়োজনের পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে হবে। যাতে এ কর্মসূচি সহজ ও সুসমন্বিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। 
লেখক ঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট
[email protected]
০১৮১৮-৯৩৬৯০৯