বঙ্গবন্ধুর আমলে বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক সাফল্য

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৪৫ পিএম, ২৩ আগষ্ট ২০২১

ড. এম. ওসমান গনি তালুকদার  : শুরুতেই, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ তাঁর পরিবার এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে যে ত্রিশ লাখ বাঙালি শহিদ হয়েছেন তাঁদের সবার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। আল্লাহ্ পাক যেন তাঁদের সবাইকে প্রকৃত শহিদের মর্যাদা দিয়ে বেহেস্ত নসিব করেন কায়-মনোবাক্যে সেই দোয়া করছি। এরপর বিদেশীরা বঙ্গবন্ধুকে কিভাবে মূল্যায়ন করেন, তার একটি বাস্তব উদাহরণ দিতে চাই। তখন ১৯৮১ সাল। আমি উচ্চশিক্ষার জন্য কানাডার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ছিলাম। আমার সাথে একই ল্যাবে একজন শ্বেতাঙ্গ কানাডিয়ান ছাত্রও গবেষণা করত। তার সঙ্গে পরিচয়পর্বের এক পর্যায়ে সে আমাকে জিজ্ঞেস করল ‘তুমি কোন দেশের?’ আমি উত্তর দিলাম, ‘বাংলাদেশের।’ সে বাংলাদেশ চিনতে পারল না। তখন বললাম কয়েক বছর আগ পর্যন্ত দেশটি পাকিস্তানের অংশ ছিল। তাতেও কাজ হলো না। তখন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম এই ভাবে যে, বাংলাদেশ পাক ভারত উপমহাদেশে অবস্থিত। ১০ বছর আগে ৯ মাসের একটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে দেশটি স্বাধীন হয়েছে। শহিদ হয়েছে ৩০ লাখ মানুষ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আর কোন যুদ্ধে এত অধিক সংখ্যক মানুষ মরার ঘটনা পৃথিবীর অন্য কোথাও নেই। তখন আমাকে স্তব্ধ করে দিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘অৎব ুড়ঁ ঃধষশরহম ধনড়ঁঃ ঃযব ষধহফ ড়ভ ঝশ. গঁলরন?’ আমি উৎফুল্ল হয়ে উত্তর দিলাম, ‘ণবং, ুড়ঁ ধৎব ধনংড়ষঁঃবষু ৎরমযঃ.’ পরে ঘটনাটি মনে পড়লেই আমি খুব লজ্জিত হই, এই ভেবে যে, বাংলাদেশের পরিচয় দিতে গিয়ে আমি একবারও বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করিনি। অথচ একজন ভিনদেশী যুবক বুঝিয়ে দিল বাংলাদেশের অপর নাম শেখ মুজিবুর রহমান। 
পরবর্তী সময়ে অবশ্য আমার আরও উপলব্ধি হয়েছে, বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শের নাম। তবে আমি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বলতে বুঝি অগাধ দেশপ্রেম এবং অপরিসীম আত্মত্যাগ। যেখানে, দেশপ্রেম হচ্ছে সমস্ত মানবীয় গুণাবলীর মা-স্বরূপ। যেমন মিথ্যা কথা বলা সমস্ত পাপ কাজের মা-স্বরূপ। আর নিজের ওপর অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার অপর নাম দেশপ্রেম। উল্লেখ্য, ধর্মীয়ভাবে বলা হয়, দেশপ্রেম ঈমানের অঙ্গ। কাজেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন ঈমানী শক্তিতে বলিয়ান একজন আলোকিত মানুষ। আমি বঙ্গবন্ধুর সেই আদর্শ অনুসরণ করে আমার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের অঙ্গিকার ব্যক্ত করছি এবং আশাকরি আপনারাও তা করবেন।
এবার একটু অতীতে ফিরে যাওয়া যাক। আমরা সবাই জানি, বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের কিছু অপ্রকাশিত তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করতে চাই। কিছুদিন আগ পর্যন্ত যা আমার জানা ছিল না এবং আমার ধারনা আপনাদের মধ্যে অনেকেরই তা জানা নেই। আর তা হলো, তাঁর শাসনামলের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক সফলতা। এ বিষয়টিকে পরিষ্কারভাবে বোঝার জন্য বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং ভারত এই তিন দেশের সমসাময়িক অর্থনৈতিক অবস্থার একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো (তথ্যসূত্র: বিশ^ব্যাংক এবং আই.এম.এফ)। অর্থনৈতিক অবস্থা বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হচ্ছে মাথাপিছু আয়। তাই, শুধুমাত্র এই সূচকটি সম্পর্কেই আলোচনা করা হলোÑ   
১৯৭২ সালে মাথাপিছু আয়: পাকিস্তানের ১৫২ ডলার, ভারতের ১২৩ ডলার এবং বাংলাদেশের ৯৪ ডলার। স্পষ্টত: সর্বোচ্চ অবস্থানে পাকিস্তান, দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। 
১৯৭৩ সালে: ভারতের ১৪৪ ডলার, বাংলাদেশের ১২০ ডলার এবং পাকিস্তানের ১০০ ডলার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থানে ভারত, দ্বিতীয় অবস্থানে বাংলাদেশ এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিল পাকিস্তান। উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের এক বছরের মধ্যেই পাকিস্তানের অবস্থান সর্বোচ্চ থেকে সর্বনিম্ন অবস্থায় নেমে যায় আর বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে আসে। এতে প্রতীয়মান হয় যে, পাকিস্তান আমলে তদানিন্তন পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করত।
১৯৭৪ সালে: বাংলাদেশের ১৮২ ডলার, ভারতের ১৬৩ ডলার এবং পাকিস্তানের ১৩৫ ডলার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থানে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় অবস্থানে ভারত এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে পাকিস্তান। বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের দুই বছরের মধ্যে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে যায় আর পাকিস্তান সর্বনিম্ন অবস্থায় রয়ে যায়। ১৯৭৫ সালে: বাংলাদেশে ২৭৮ ডলার, পাকিস্তানে ১৬৮ এবং ভারতের ১৫৮ ডলার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ  অবস্থানে বাংলাদেশ, দ্বিতীয় অবস্থানে পাকিস্তান এবং সর্বনিম্ন অবস্থানে ইন্ডিয়া। স্পষ্টত বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের তৃতীয় বছরে বাংলাদেশ তার সর্বোচ্চ অবস্থান শুধু ধরেই রাখে নি বরং অন্যদের তুলনায় প্রবৃদ্ধির  মাত্রা অনেকটা বাড়িয়ে নেয়। যেমন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের তুলনায় ৬৪% এবং ভারতের তুলনায় ৭৬% বেশি হয়। 
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের ইতিহাসে আগের বছরের তুলনায় মাথাপিছু আয়ের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি ঘটে ১৯৭৫ সালে (৫২.৭৫%), দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঘটে ১৯৭৪ সালে (৫১.৬৭%), এবং তৃতীয় সর্বোচ্চ ঘটে ১৯৭৩ সালে (২৭.৬৬%). পরপর দুই বছর ৫০% -এর বেশি প্রবৃদ্ধি সমসাময়িক কালের বিশে^ অত্যন্ত বিরল ঘটনা। 
বঙ্গবন্ধুর সংক্ষিপ্ত সাড়ে তিন বছরের শাসনামলে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের গড় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪%। এই ধারা অব্যাহত থাকলে ১৯৮৫ সালের শেষ নাগাদ আমাদের মাথাপিছু আয় দাঁড়াত ১৩,০০০ (তেরো হাজার)  ডলারেরও বেশি। উল্লেখ্য, সাদামাটাভাবে  কোন দেশের মাথাপিছু আয় ১২০০০ (বারো হাজার) ডলারের বেশি হলে সেই দেশকে উন্নত দেশ হিসাবে গণ্য করা হয়। কাজেই বলা যেতে পারে, ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা না হলে এবং তিনি  আরও ১০ বছর  বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ সত্যিই সেই ১০ বছরে উন্নত দেশের মর্যাদায় আসীন হতো। 
এবার দেখা যাক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করার পর বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ভারত এবং পাকিস্তানের তুলনায় কেমন হয়েছিল।  
আসলে ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ১৯৭৫ সালের ২৭৮ ডলার থেকে প্রায় অর্ধেকে নেমে দাঁড়ায় ১৪১ ডলার। একই সময়ে পাকিস্তানে ছিল ১৯১ ডলার এবং ভারতের ১৬১ ডলার। অর্থাৎ সর্বোচ্চ অবস্থানে পাকিস্তান এবং সর্বনি¤ন অবস্থানে বাংলাদেশ। স্পষ্টত বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দুই বছরের মধ্যে আমাদের মাথাপিছু আয় সর্বনি¤ন থেকে সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে যায় আর বঙ্গবন্ধুকে হত্যার এক বছরের মধ্যে তা আবার সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে যায়। এর ঠিক উল্টা অবস্থা ঘটে পাকিস্তানে। যেমন বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার এক বছরের মাথায় পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় তিন দেশের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থান থেকে সর্বনি¤œ অবস্থানে নেমে যায় এবং বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে আবার সর্বোচ্চ অবস্থানে উঠে যায়। 
পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে ১৯৭৩ সালে যখন তাদের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি হয় ঋণাত্মক ৩৪%। আর বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর এক বছরের মধ্যে যখন আমাদের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি হয় ঝণাত্মক ৪৯%। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১৩৪ এবং ৯ মাস স্বাধীনতা যুদ্ধের পর কমে গিয়ে দাঁড়ায় ৯৪ ডলারে অর্থাৎ প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩০%। স্পষ্টত: পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালে ৯ মাস ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে বাংলাদেশে যে ক্ষয়ক্ষতি করেছে, ১৯৭৫ সালে শুধুমাত্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করাতে এক বছরের মধ্যে তার তুলনায় বাংলাদেশের অনেক বেশি ক্ষতি হয়েছে। একটি যুদ্ধ বিধ্বস্ত জাতিকে পুনর্গঠনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু যদি মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে অতটা অর্থনৈতিক উন্নতি করতে পারেন, সেখানে তার মৃত্যুর পর মাত্র এক বছরের মধ্যে প্রায় পুরাপুরি পুনর্গঠিত জাতির এতবড় অর্থনৈতিক বিপর্যয় কি করে ঘটল তা অনুসন্ধান করে দেখা দরকার। 
বঙ্গবন্ধুর শাসনামলের (১৯৭২- ১৯৭৫) তিন বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৯৬% আর পাকিস্তানের হয়েছিল মাত্র ৯.৮%। অপরপক্ষে, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পরবর্তী তিন বছর অর্থাৎ ১৯৭৫  থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের  মাথাপিছু আয়ের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ঋণাত্মক বা -৩৬.৭% আর পাকিস্তানের ৪৪.৬%।  আরও তিন বছর পর ১৯৮১ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় কিছুটা বেড়ে যায় কিন্তু তারপরও ঋণাত্মক বা -১০.৭%-এ অবস্থান করে। অপরপক্ষে, এই ছয় বছরে পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি পায় ১০৭%। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের এই ঋণাত্মক অবস্থান থেকে ধনাত্মক অবস্থানে উত্তরণ ঘটাতে বা ১৯৭৫ সালের মান ২৭৮ ডলার অতিক্রম করতে সময় লাগে সুদীর্ঘ ১৪ বছর। 
প্রসঙ্গত বলতে চাই, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় স্বাধীনতার পর দুইবার পাকিস্তান এবং ভারতের তুলনায় বেশি হয়েছে।  প্রথমবার পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হয়েছে বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে ১৯৭৩ সালে এবং ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশের তুলনায় বেশি হয়েছে ১৯৭৪ সালে। আর দ্বিতীয়বার পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হয়েছে বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে ২০১৬ সালে আর পাকিস্তান এবং ভারত উভয় দেশের তুলনায় বেশি হয়েছে ২০২০ সালে। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর ২০১৬ সাল পর্যন্ত সূদীর্ঘ ৪১ বছর ধরে তিন দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান সর্বনি¤œ ছিল। ২০২১ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থা পাকিস্তান ও ভারতের তুলনায় আরও সুদৃঢ় হয়েছে। যেমন, বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২২৪৭ ডলার, ভারতের প্রায় ২১০০ ডলার এবং পাকিস্তানে ১৫৪৩ ডলার। পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশের প্রায় ৪৬% বেশি। বিশেষ করে পাকিস্তানের তুলনায় অর্থনৈতিক সকল সূচকে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। এখানে দুই একটি সূচকের কথা তুলে ধরতে চাই। যেমন, বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পাকিস্তানের ১৭.৬ বিলিয়ন ডলার এবং বাংলাদেশের ৪৬ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে আড়াই গুণেরও বেশি। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে বাংলাদেশি ২ টাকায় পাওয়া যেত পাকিস্তানি এক রূপী (শুনেছি এই কারণে অনেক পাকিস্তানি বাংলাদেশিকে উপহাস করে বলত দুই টাকার বাঙালি) আর বর্তমানে পাকিস্তানী দুই রূপিতে পাওয়া যায় বাংলাদেশি এক টাকা। 
লেখক ঃ উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ^বিদ্যালয়, রাজশাহী।