লকডাউনের বিকল্প খুঁজি, স্বাস্থ্যবিধি মানি

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৫:৪২ পিএম, ১৯ এপ্রিল ২০২১

 আতাউর রহমান মিটন : বিএনপি চেয়ারপার্সন এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধিদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া করোনা আক্রান্ত হয়েছেন। দলের মহাসচিব সাংবাদিক সম্মেলনে এবং খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ডা. মো আল মামুন গণমাধ্যমকে সংবাদটি নিশ্চিত করেছেন। সংবাদটি গত রোববারের এবং দলের মহাসচিব এর তথ্য অনুযায়ী খালেদা জিয়া করোনা পজিটিভ হলেও তিনি সুস্থ আছেন এবং ভাল আছেন। তবে মির্জা ফখরুল দলীয় চেয়ারপার্সনসহ সকলের আশু রোগমুক্তি কামনায় দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। নিঃসন্দেহে আমরা সকলের জন্যই দোয়া করি। মহান ¯্রষ্টা আমাদের সকলকে সুস্থতা দান করুন। 
করোনা নিয়ে দেশের গণমাধ্যমে প্রতিদিন বিস্তর আলোচনা হচ্ছে। নিজেদের মত করে কথা বলছেন সাধারণ মানুষেরাও। প্রত্যেকেরই নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি, অভিজ্ঞতা এবং যুক্তি রয়েছে। করোনা একটা ভাইরাস যা আমরা কেউই অস্বীকার করতে পারব না। কিন্তু করোনা সংক্রমণের হার ও ধরন নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এবং অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতাগুলো বিবেচনায় নিলে মনের ভেতরে নানা প্রশ্ন দানা বাঁধে বৈ কি! করোনার সাথে অনেকেই টিকা বাণিজ্যের সম্পর্ক দেখেন। করোনাকালে ওষুধ কোম্পানীসহ গুটি কয়েক প্রতিষ্ঠানের রমরমা ব্যবসা মনে সন্দেহের উদ্রেক করে। পৃথিবীতে বায়োলজিক্যাল ওয়েপন বা জীবাণু অস্ত্র দিয়ে লড়াই হতে পারে এমন অনেক কথা রহস্য উপন্যাসে পড়েছি বা সিনেমায় দেখেছি। মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি তাহলে এখন সেই জীবাণু অস্ত্রের লড়াই এর যুগে প্রবেশ করেছি? এর থেকে মুক্তির উপায় কী? 
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বর্তমানে দশের অধিক যে টিকা পাওয়া যাচ্ছে তার কোনটাই নাকি এককভাবে করোনাকে নির্মূল করতে পারে না। করোনা তার ধরন যত দ্রুত পাল্টাচ্ছে তার সাথে পাল্লা দিয়ে টিকা উন্নততর হতে পারছে না। তবে বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেটাও একটা গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ এবং আশাবাদের খবর। এমতাবস্থায়, উপায় কী? অনেকেই বলেন নিজের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধির উপরই এখন সকলের বেশি করে নজর দেয়া উচিত। আমরা যদি আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বর্তমানের চেয়ে ১০%-২৫%  উন্নীত করতে পারি আর তার জন্য পর্যাপ্ত এন্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করি তাহলে হয়তো করোনার সাথে যুদ্ধ করে টিকে থাকা সম্ভব। সাধারণ মানুষের খাদ্য ও জীবনাভ্যাসের মধ্যে কী শক্তি লুকিয়ে আছে সেটা লক্ষ্য করা প্রয়োজন। যেমন তারা বেশি করে শাক-সব্জি খায় এবং খোলা আকাশের নীচে প্রচুর শারীরিক পরিশ্রম করে। তারা আবদ্ধ শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকে না বললেই চলে। বলা বাহুল্য, বহু আগে থেকেই বিশেষজ্ঞরা বলছেন একটানা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থাকা অস্বাস্থ্যকর। বাসগৃহে আলো ও বাতাস চলাচলের সুযোগ থাকতে হবে। যে ঘরে আলো ও বাতাসের প্রবেশ কম সেখানে রোগ-জীবাণূ বেশি আরামে থাকে, রোদে এবং বাইরের খোলা বাতাসে তারা সহজে টিকে থাকতে পারে না। আশাকরি চিন্তাশীল পাঠকেরা আমার এই বক্তব্যটিকে চট করে গ্রহণ বা বর্জন না করে একটু ভেবে দেখবেন, বই পুস্তকের সাথে মিলিয়ে নিবেন, চারিপাশের বাস্তবতা থেকে অভিজ্ঞতা নিবেন এবং তারপরে সিদ্ধান্ত নিবেন। আর অবশ্যই স্বাস্থ্যবিধি মানবেন। স্বাস্থ্যবিধি মানার মধ্যে কোন ক্ষতি নেই। নানাভাবেই আপনি উপকৃত হবেন। 
করোনা ভাইরাস মোকাবেলায় বুধবার থেকে এক সপ্তাহের ‘কঠোর লকডাউন’ শুরু হয়েছে। এ সময়ে জরুরি সেবা দেয়া প্রতিষ্ঠান ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস এবং গণপরিবহন বন্ধ থাকছে। তবে চালু রয়েছে শিল্প-কারখানা। অবস্থা পর্যালোচনা সাপেক্ষে সরকার এই ‘কঠোর লকডাউন’ এর মেয়াদ বর্ধিত করতে পারে। অন্যদিকে, গার্মেন্টস মালিক ছাড়া দেশের অন্যান্য ব্যবসায়ী এবং পরিবহণ মালিকেরা গার্মেন্টস খোলা রেখে সবকিছু বন্ধের সরকারি দ্বিমুখী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করছে। তাদের দাবি স্বাস্থ্যবিধি মেনে তাদেরকেও সীমিত সময়ের জন্য দোকান খোলা তথা ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ দেয়া হোক। 
দেশে করোনা সংক্রমণের হার সব জায়গায় এক নয়। অতীতের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে অনেকেই বলছেন, যেমন করে বিদেশ থেকে আসা অনেকেই দেশে করোনা ভাইরাস ছড়িয়েছেন, ঠিক তেমনি ঢাকা বা বড় বড় শহরের মানুষেরা এবার লকডাউনের সময়ে দেশের বাড়িতে গিয়ে হয়তো করোনা ভাইরাস ছড়াবে। এই পরিস্থিতি সত্যি অস্বস্তিকর! একদিকে ঢাকায় বসে না থেকে বাড়ি ফেরার আকুতি, অন্যদিকে শহর থেকে গ্রামে ভাইরাস ছড়িয়ে দেবার ভয়! আমি বলছি না, শহরের সব মানুষই করোনা আক্রান্ত বা  তারা সকলেই ভাইরাস এর বাহক। নিশ্চয় সেটা সঠিক নয়। আশাকরি আমাকে ভুল বুঝবেন না। আমি যেটা বলতে চাইছি সেটা হলো, সরকারের উচিত ছিল সবকিছু বন্ধ করে না দিয়ে বরং স্বাস্থ্যবিধি মানানোর উপরে অধিক গুরুত্ব দেয়া।  গণমাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়ক প্রোগ্রাম (কেবল পণ্যের বিজ্ঞাপন আর টক শো নয়) বেশি বেশি প্রচার করা দরকার ছিল। কেন আমাকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, এর সাথে আমার পরিবার ও প্রিয়জনদের সুস্থ রাখার সম্পর্ক কতখানি, কিভাবে একজন অসচেতন ব্যক্তি পরিবারের অপর সকলের বিপদের কারণ হতে পারেন সে ধরণের টিভি স্পট বা নাটিকা ইত্যাদি বেশি বেশি প্রচার করা প্রয়োজন। সচেতনতার কোন বিকল্প নেই। 
আমাদের মনে রাখতে হবে, লকডাউন কোন স্থায়ী সমাধান নয়। অতীতে আমরা লকডাউন করেছিলাম তাতে দুর্ভোগ বেড়েছিল কিন্তু করোনার বিস্তৃতি ঠেকানো যায়নি। বরং লকডাউনের কারণে লক্ষ লক্ষ মানুষ ঢাকা বা শহরের কর্মস্থল ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ায় গ্রামগুলিতে (উপজেলা-জেলায়) সংক্রমণ বেড়ে গিয়েছিল। এই মুহূর্তে ‘টিকা’ একটি ভাল বিকল্প এবং সরকারের উচিত সেখানে আরও দায়িত্বশীল হওয়া। আমাদের টাকায় কেনা টিকা কেন আমরা সময়মত ডেলিভারি পাচ্ছি না তা নিয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। খুঁজতে হবে অন্যান্য বিকল্প। যেমন চীন বা রাশিয়া থেকে টিকা পাওয়ার জন্য সহায়ক কূটনীতিতে আরও জোর দিতে হবে। লুকোচুরি নয়, জনগণকে সত্যটা জানান। জনগণ অবশ্যই সরকারের সাথে থাকবে। 
সাতদিন ঘরে বন্দি থাকলে করোনা দূর হয়ে যাবে এই নিশ্চয়তা যখন কেউ দিতে পারছেন না, তখন সংক্রমণের রাশ টানতে গিয়ে অর্থনীতির ক্ষতি করে কি লাভ? বরং স্বাস্থ্যবিধি মেনে কিভাবে ব্যবসা-বাণিজ্য চালু রাখা যায়, অর্থনীতি সচল রাখা যায় সেই পথ খোঁজা উচিত। ব্রাজিলসহ বিশ্বের বহু উন্নত দেশ এখন সে পথেই চলছে। তারা গত বছরে বহুদিন লকডাউনে থেকে দেখেছে তাতে করোনা পালিয়ে যায়নি। অর্থনীতি সুস্থ থাকলে বরং মহামারির মধ্যেও জনসাধারণ কিছুটা শ্বাস নেওয়ার সুযোগ পায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনা সহজে যাবে না। এখন দ্বিতীয় ঢেউ চলছে কিন্তু এটাই শেষ নয়। এরপরে তৃতীয়, চতুর্থ ঢেউ আসতে পারে। সুতরাং এর মধ্যেই আমাদের চলতে হবে। 
করোনার দ্বিতীয় ঢেউ আসবে এটা বিশেষজ্ঞরাই বলেছিলেন। তাহলে সরকার সেই প্রস্তুতি না নিয়ে বরং হাসপাতালগুলো থেকে সুযোগ সুবিধা সরিয়ে নিয়েছে কেন সেটার ব্যাখ্যা প্রয়োজন। কেন সরকার ফিল্ড হাসপাতাল তৈরীতে গড়িমসি করছে। জাতীয় এই সংকটময় মুহূর্তে তাদের কাজে না লাগিয়ে বেসরকারি বাণিজ্যিক হাসপাতালগুলোকে একচেটিয়া ব্যবসা করার সুযোগ দেয়াটা কতখানি নৈতিক? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় ম্যানেজমেন্ট বা নিয়ম মেনে চলাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসার নামে একটা বিশৃংখলা যে চলছে সেটা কি আমরা অস্বীকার করতে পারছি? সরকারের উচিত এই সংকট মোকাবেলায় আরও অর্থ বরাদ্দ করা। প্রয়োজনে অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় কিছুটা কমিয়ে দিয়ে সেই টাকায় বেশি বেশি স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে হবে। আবার জনগণের টাকা কোন বৃহৎ কোম্পানিকে দিয়ে হাসপাতাল তৈরির নাটক সাজিয়ে এখন সেই হাসপাতালের নিখোঁজ হওয়ার মত তুঘলকি কান্ডগুলোরও রাশ টানা দরকার। করোনার সুযোগ নিয়ে স্বাস্থ্যখাত সহ অন্যান্য খাতে বেড়ে যাওয়া দুর্নীতি কমাতে সরকারকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। চিকিৎসা পেলে, পুষ্টিকর খাবারের যোগান পেলে মানুষ বেঁচে থাকবে। কমখরচে উন্নত চিকিৎসা পাওয়া এবং পুষ্টিকর খাবার কিনে খাবার মত আর্থিক বন্দোবস্ত নিশ্চিত করার জন্য সরকারকে এখন এগিয়ে আসতে হবে। 
মাথা ব্যথায় যেমন মাথা কেটে ফেলা কোন সমাধান নয়, অন্যান্য বিকল্পগুলো যেমন বিবেচনায় নিতে হয় ঠিক তেমনি করোনার এই মহামারি মোকাবেলাতেও আমাদের সকল বিকল্প কাজে লাগাতে হবে। সাথে নিতে হবে সকলকে। আসুন, আমরা সম্মিলিতভাবে করোনা মোকাবেলায় দায়িত্বশীল হই। দুর্নীতিবাজদের যেন প্রশ্রয় না দেই। 
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯