ওদের নেই করোনার ভয়!

Staff Reporter Staff Reporter
প্রকাশিত: ০৩:৫৬ পিএম, ১৮ মে ২০২০

মীর আব্দুল আলীম :কোভিড-১৯ করোনাভাইরাস আতংকের মধ্যে ষোড়শী পাগলীও নিরাপদ নয়। রাজধানী ঢাকার পাশে রূপগঞ্জের কাঞ্চন পৌরসভা এলাকায় তিন নরপশু তাকে রাতের আঁধারে গণধর্ষণ করে। এ ব্যাপারে পুলিশ একজনকে গ্রেফতার করেছে। করোনাভাইরাস আতংকে গোটাবিশ^ থমকে গেলেও ধর্ষকদের ধর্ষকাম থেমে নেই। আসলে ওদের মৃত্যু ভয় নেই। যেখানে সবাই এখন সৃষ্টিকর্তাকে বেশি বেশি করে জপছে তারা নারীর প্রতি সহিংস হচ্ছে। ওরা বড় অমানুষ! তাইতো ওরা এমন দু:সময়েও পৈশাচিক কাজে নিজেদের লিপ্ত করছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কল কারখানা, বহির্বাণিজ্য সবকিছু এখন বন্ধ। ওদের অপকর্মের দুয়ার কেবল খোলা। খুলনা, লক্ষ্মীপুর, পঞ্চগড়, নারায়ণগঞ্জ, বরিশাল সবখানেই ধর্ষিত হচ্ছে নারী। এদেশে করোনা সংকটে ধর্ষণ এবং গণধর্ষণের চিত্র বড়ই ভয়ংকর।
এখানে যে ক’টির বর্ণনা দিচ্ছি সকল ঘটনাই গত এক মাসে দেশের কোন না কোন জেলায় ঘটেছে। খুলনা মহানগরীর খানজাহান আলী থানাধীন যোগীপোলে ৪র্থ শ্রেণির এক মাদরাসা ছাত্রী (১৪) গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা বাদী হয়ে নগরীর খান জাহান আলী থানায় মামলটি দায়ের করেন। তিন বন্ধু মিলে ওই মাদরাসা ছাত্রীকে সুকৌশলে ডেকে নিয়ে পার্শ্ববর্তী পরিত্যক্ত বাসভবনে নিয়ে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। এর আগে রাজধানী ঢাকার পাশে রূপগঞ্জে তিন বন্ধু কাঞ্চন পৌরসভার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রীকে ডেকে ধর্ষণ করে। চলতি সপ্তাহে একই এলাকায় এক পাগলী ধর্ষিত হয়। এদিকে পঞ্চগড়ে ধর্ষণের অভিযোগে সালিসে নির্যাতন, অপমানে কিশোরের আত্মহত্যা করেছে। পঞ্চগড় সদর উপজেলার অমরখানা ইউনিয়নের সোনারবান-বাঁশবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নওগাঁর ধামইরহাটে এক কিশোরীকে (১৬) গণধর্ষণের অভিযোগে উঠেছে। চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ চেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাঁদপুর সদর উপজেলায় নবম শ্রেণির এক ছাত্রী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে।
সরকার ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের ঘোষণার পর, এমনকি করোনা ভাইরাস আতংকের মধ্যে ধর্ষণের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ধর্ষকদের দুঃসাহসেরই প্রমাণ মিলে। এ জাতীয় যৌন-ব্যভিচার কি বন্ধ হবে না? মানুষরূপী নরপশুরা সভ্যতার ভাবধারাকে পাল্টে দিতে কি হায়েনার নখ মেলেছে? শুধু ধর্ষণই নয়, রীতিমতো গণধর্ষণ হচ্ছে। ঘৃণিত এই কাজ অপরাধ বিজ্ঞানের কোন সংজ্ঞায় ফেলা যাবে?
প্রশ্ন হলো, দেশে এত ধর্ষণ হচ্ছে কেন? তা রোধের উপায় কি? যৌন নির্যাতন বন্ধে আগে মানসিকতা বদলাতে হবে। ধর্ষণ কমাতে হলে আগে পুরুষের মাঝে মানবিক গুণাবলী জাগ্রত করতে হবে। ধর্ষণ রোধে আমাদের সচেতন হতে হবে। অবাধ মেলামেশার সুযোগ, লোভ-লালসা-নেশা, উচ্চাভিলাষ, পর্ণো-সংস্কৃতির নামে অশ্লীল নাচ-গান, যৌন সুড়সুড়িমূলক বই-ম্যাগাজিন, অশ্লীল নাটক-সিনেমা ইত্যাদি কামোত্তেজনা মানুষকে প্রবলভাবে ব্যভিচারে প্ররোচিত করে তা বর্জন করতে হবে। পর্ণো সাইডগুলো বন্ধ করতে হবে যেন মোবাইল কিংবা কম্পিউটারে তা কেউ দেখতে না পারে। নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সময় মত বিয়ের ব্যবস্থা করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষা ও যৌনশিক্ষা গ্রহণ করতে হবে। বাজে সঙ্গ ও নেশা বর্জন করতে হবে। পাশাপাশি নারীকেও শালিন হতে হবে। যৌন উত্তেজক পোশাক বর্জন করতে হবে। প্রবল কামোত্তেজনা মানুষকে পশুতুল্য করে ফেলে। ব্যাপকভাবে কামোত্তেজনা সৃষ্টিকারী উপকরণগুলোর কাছাকাছি চলে গেলে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের আর কোনো উপায়ই থাকে না।
ধর্ষণের ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে হলে কেবল আইনের কঠোর প্রয়োগেও কোনো কাজ হবে না। এর জন্য প্রয়োজন জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে যার যার পারিবারিক বলয়ে ধর্মানুশীলনে একনিষ্ঠতা, পোশাকের শালীনতা, অশ্লীল সংস্কৃতিচর্চার পরিবর্তে শিক্ষণীয় বিনোদনমূলক ও শালীন সংস্কৃতি চর্চার প্রচলন নিশ্চিতকরণ। আর এটা করতে হলে কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতা, আইনের শাসন প্রয়োগ বা ফতোয়া দিলেই চলবে না, সমাজের সর্বস্তরের মানুষ যার যার অবস্থানে থেকে স্কুল-কলেজ মাদরাসা-মক্তব-মসজিদ-মন্দির-গির্জা-প্যাগোডার নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সমাজের অন্য বুদ্ধিজীবী ও পেশাজীবীদের সমন্বয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে ধর্ষণ বাড়ছে। তাই ধর্ষণের ব্যাপারে আইনের কঠোর প্রয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে।
অপসংস্কৃতি আর ভিনদেশী সংস্কৃতির আগ্রাসন ধর্ষণ রোধের অন্তরায় মনে করা হয়। অপসংস্কৃতি আমাদের সমাজকে কতটা ক্ষতবিক্ষত করছে তা হালআমলের ধর্ষণের চিত্র দেখলেই বেশ টের পাওয়া যায়। শুধু ধর্ষণই নয়, দেশে ধর্ষণের পর নৃশংস হত্যার ঘটনা ঘটছে অহরহ। অপরাধীর সাজা না হলে এ জাতীয় অপরাধ বাড়বে, এটি চির অবধারিত। এ ধর্ষণ শুধু নারীর বিরুদ্ধে নয়, মানবতার বিরুদ্ধে চরম অপরাধ। বিশ্বের যেসব দেশে ধর্ষণ বাড়ছে, দেখা যাচ্ছে ধর্ষণকারীর সাজা না হওয়া তার অন্যতম প্রধান কারণ। এশিয়ার মধ্যে ভারত ও বাংলাদেশে ধর্ষণের অপরাধ বেশি হয়ে থাকে। ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নিম্নবিত্ত আর মধ্যবিত্তরাই বেশি। যাঁরা উচ্চবিত্ত, সমাজের ওপর তলার মানুষ, এই জাতীয় বিপদ তাঁদের ছুঁতে পারে কম। যাঁরা নিম্নবর্গের বাসিন্দা, তাঁরা সম্ভবত এখনও ধর্ষণকে স্বাভাবিক জ্ঞান করেন। ভয়ে চুপ থাকেন। ইজ্জত হারিয়েও মুখ খোলেন না। তারা জানেন আইন আদালত করলে তাদের ভাগ্যে উল্টো বিপত্তি ঘটবে। অন্যায় করে অপরাধিরা এভাবে পার পেয়ে যাচ্ছে বলেই দেশে ধর্ষণ বেড়ে গেছে। বর্তমানে আমরা ঈমানশক্তি হারিয়েছি। দেশপ্রেম, সততা, নৈতিক মূল্যবোধ, যৌন কামনা ইত্যাদির নেতিবাচক প্রেরণা আমাদের অন্ধ করে ফেলেছে। তাই সমাজ থেকে সুখ, শান্তি বা আনন্দ হারিয়ে যাচ্ছে। নিঃশর্ত ভালবাসা বা ভক্তি কমে যাওয়ার কারণে আমাদের গঠনমূলক মনোভাব বা সৃষ্টিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এ কারণে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি শ্রদ্ধার পরিবর্তে আমাদের ভোগের মনোভাব সৃষ্টি হচ্ছে। অনিয়ন্ত্রিত যৌনকামনার প্রভাবে আমাদের মধ্যে ধর্ষণ, জেনা, পরকীয়া প্রেম ইত্যাদির প্রবণতা বাড়ছে।
ধর্ষণ বৃদ্ধি হওয়ার জন্য সরকার ও তার প্রশাসনের ব্যর্থতাই দায়ী বেশি। কারণ অন্যায়কারী এমন জঘন্য অন্যায় করার পরও প্রশাসন নীরব থাকে। এজন্য অবশ্য রাজনৈতিক চাপও দায়ী। আইনের কাছে পাত্তা পায়না গরীব মানুষ। ধর্ষণের যারা শিকার হন তাদের অধিকাংশই দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে তাই বিচার পাওয়ারও সম্ভাবনা কম।
তবে মেয়েদের প্রতিপদেই বিপদের মোকাবিলা করতে হয় আজকের সমাজে, শ্রেণীবিভাগ ব্যতিরেকেই। উচ্চবর্গীয়রা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে বাস করেন বলে ঘরের মধ্যে তাদের বিপদ কিছু কম হতে পারে তবে পার্টিতে অপরিচিত বা স্বল্পপরিচিতের হাতে , আর ঘরে নিকট আত্মীয় বা পরিচিতজনদের হাতে লাঞ্ছনা জোটার সম্ভাবনাটাও উড়িয়ে দেয়া যায় না। আসল সমস্যাটা হলো কুরুচিপূর্ণ পুরুষদের দৃষ্টিভঙ্গি, কোনো শ্রেণীভাগ মানে বলে মনে হয় না। এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতাও এই মানসিকতা বদলাতে পারে না। তা না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের মত স্থানে শিক্ষকের হাতে ছাত্রী, ডাক্তারের হাতে রোগী কিংবা ডাক্তারনী ধর্ষিত হয় কি করে?
যৌন-ব্যভিচার সর্বযুগে, সর্বধর্মমতে নিন্দনীয় নিকৃষ্ট পাপাচার। ধর্ষণের চূড়ান্ত শাস্তির বিধান মৃত্যুদন্ড। কিন্তু এ যাবৎ যতগুলো ধর্ষণ ও ধর্ষণজনিত হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে, তার যথাযথ বিচার সম্পন্ন হয়েছে এরূপ নজির কমই আছে। হয় চুড়ান্ত রিপোর্টে ঘাপলা নয়তো সাক্ষ্যপ্রমাণে প্রভাবিত করে অপরাধি পার পেয়ে যাচ্ছে ঠিকই। উপরন্তু এর বিচার চাইতে গিয়ে বিচারপ্রার্থীরা নির্বিচারে পাল্টা হত্যার হুমকি কখনো কখনো হত্যার শিকার ও হয়রানির শিকার হন। এ অবস্থা থেকে আমাদের অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। ১৯৯৫ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ বিশেষ বিধান আইন করা হয়। পর্যায়ক্রমে ২০০০ সালে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন করা হয়। ২০০৩ সালে এ আইন আবার সংশোধন করা হয়। ধর্ষণের শাস্তি কত ভয়ানক, তা অনেকেই জানেন না। নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ৯ ধারায় ধর্ষণের বিচার হয়। এ আইনে ধর্ষণের সর্বনিম্ন শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদন্ড এবং সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ড করা হয়েছে। আইনের ৯ (১) ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে, তাহলে সে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে। এ ছাড়া অর্থদন্ড ও দিতে হবে। ৯(২) উপধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনো ব্যক্তি কর্তৃক ধর্ষণ বা ওই ধর্ষণ-পরবর্তী তার অন্যবিধ কার্যকলাপের ফলে ধর্ষিত নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে, তাহলে ওই ব্যক্তি মৃত্যুদন্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে। অতিরিক্ত এক লাখ টাকা অর্থদন্ড ও দন্ডনীয় হবে। উপধারা ৯ (৩)-এ বলা হয়েছে, যদি একাধিক ব্যক্তি দলবদ্ধভাবে কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে এবং ধর্ষণের ফলে ওই নারী বা শিশুর মৃত্যু ঘটে বা তিনি আহত হন, তাহলে ওই দলের প্রত্যেক ব্যক্তি মৃত্যুর জন্য দায়ী। যদি কোনো ব্যক্তি কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করে মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করে, তাহলে ওই ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় হবে ও এর অতিরিক্ত অর্থদন্ডেও দন্ডনীয় হবে। এদেশে ধর্ষণের পাকাপোক্ত আইন আছে কিন্তু প্রয়োগ নেই বললেই চলে। আইনের যারা প্রয়োগ করবেন তারা ঐ আইনের পথে হাঁটেন না। কখনো বা হুমকি ধামকিতে শুরুতেই গলদ দেখা দেয়। মামলার চার্জসিট গঠনের সময় ফাঁক ফোকর থেকে যায়। তাই শেষে রায়ে ধর্ষিত কিংবা নির্যাতনের শিকার লোকজন সঠিক বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এসব মামলাগুলোর ক্ষেত্রে চার্জসিট গঠনের সময় কোন ম্যাজিস্ট্রেট অথবা পুলিশের কোন পদস্থ কর্মকর্তার নজরদারিতে করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে চুড়ান্ত রিপোর্টের সময় ভিক্টিমের সাক্ষাত গ্রহণ করা যেতে পারে। তাতে করে গোপনে চার্জসিট দাখিলের ফলে যে জটিলতা তৈরি হয় তা কমে আসবে।
সর্Ÿোপরি নারীদের জন্য ঘরের বাইরে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। এটা স্পষ্ট যে বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপরাধ প্রশ্রয় দিচ্ছে। এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার কাজটিই বেশি জরুরি হয়ে পড়েছে। সে লক্ষ্যে সততা, আন্তরিকতা ও বিচক্ষণতার সঙ্গে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা চাই। নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য যা যা করা দরকার প্রশাসন তা সুনিশ্চিত করবে- এমনটাই সকলের প্রত্যাশা।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিষ্ট ও সম্পাদক  
নিউজ-বাংলাদেশ ডটকম,
[email protected]  
০১৭১৩-৩৩৪৬৪৮