সবাই যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৫৮ এএম, ০৮ এপ্রিল ২০২১

রিপন আহসান ঋতু : গতবারের লকডাউনের চাপে ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়া অর্থব্যবস্থার অডিট যখন এখনো বাকি তখন আবারো কোভিড-১৯ এর ধাক্কা! পুরো বিশ্ব আবারো সরাসরি জাতীয় সমস্যার মুখোমুখি এবং জীবনযাত্রায় চলে আসছে বিশৃঙ্খল অবস্থা। করোনার প্রথম ধাক্কায় আমরা হারিয়েছি যুক্তি আর বিবেকের বহু উজ্জ্বল প্রতিনিধিদের। তাদের শূন্যতায় এখন নিঃস্ব-রিক্ত বোধ করছি আমরা। সেসব মৃত্যুর ক্ষত, যে স্থায়ী চিহ্ন রেখে গেছে, তাতে সামাজিক কান্না বুকে বড্ড বাজছে আমাদের। এমন কান্নার ভেতরে বাইরে আমাদের জাগৃতি, আমাদের অঙ্গীকার এবং আমাদের ভালো থাকার জেদ কিছুতেই বিচ্ছেদের চেয়েও বড়ো হয়ে উঠছে না। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বহু মহাপ্রাণ আর বিবেককে হারানোর জাগ্রত বেদনা নিয়েও নিজেদের বেঁচে থাকার এবং অন্যকে বাঁচিয়ে রাখার প্রয়োজনকে অবলীলায় নাকচ করে দিচ্ছি আমরা। যেখানে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ বা কোভিড-১৯ থেকে নিজে বাঁচতে এবং অন্যদের বাঁচাতে, সবাইকে অন্য সব থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হয়। সেখানে বেশির ভাগ মানুষকেই স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়ে একদমই মোটা বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে উদাসীন থাকতে দেখছি। ফলে করোনা সংক্রমণের ঊর্ধ্বগতি এবং নতুন বা পরিবর্তিত রূপের করোনাভাইরাসের আবির্ভাবে আবারো উদ্বেগ বেড়েছে সবার মাঝে। জানা যাচ্ছে পৃথিবীর অনেক দেশেই সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা আবারো হু হু করে বাড়ছে। আমাদের দেশে গত বছরের এ সময়ের তুলনায় বর্তমানে রোগী শনাক্তের হার প্রায় সাড়ে ৬শ গুণ বেশি। বিশেষজ্ঞরা সংক্রমণের এ উচ্চহারকে আশঙ্কাজনক বলে মনে করছেন। 

গত বছর মার্চে দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সরকার দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করে। ঘোষিত হয় দীর্ঘ ছুটি। সে সময়ে মানুষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গেই করোনার ঝুঁকির বিষয়টি অনুধাবন করেছে এবং কড়াকড়িভাবে স্বাস্থ্যবিধিও মেনে চলেছে। সে সময়ে যানবাহনের চলাচল যথেষ্ট সীমিত হয়ে পড়ে, মানুষও একান্ত প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের হতো না। অথচ গত বছরের তুলনায় এবার করোনার সংক্রমণ ও শক্তির তীব্রতা বাড়লেও মানুষের ভেতরে আগেকার সেই সংযত ভাব, কঠোরতা ও করোনাভীতি দেখা যাচ্ছে না। নিম্নমুখী সংক্রমণ এবং টিকা প্রদান কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক কর্মকান্ডে ফিরে যাওয়ার জন্য দেশবাসী যখন প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে, সে সময় করোনার ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণের তথ্য আসছে। দেশে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে সংক্রমণ কমতে থাকায় সবাই আশাবাদী হয়ে উঠেছিল করোনার বিদায় বুঝি আসন্ন। তাই মরণব্যাধির উচ্ছেদ আর পরাজয় অবশ্যম্ভাবী ভেবে আমরাও অনেকটা আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম, কিন্তু আমাদের সেই আশাবাদের ফুলঝুরি যে নিছক আবেগের ছিল সেটা টের পাওয়া গেল কদিন পর থেকেই। আবারো সংবাদ মাধ্যমগুলো ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আমাদেরকে জানিয়ে দিচ্ছে; এতোজন আক্তান্ত হয়েছে, এবং এতোজন মারা গেছেন! অতএব আবারো লকডাউনের মতো অবস্থায় আমাদের যেতে হলো। তার মানে কি আবারো থেমে যাবে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় কর্মকান্ডের চাকা? বাঁধা পড়বে চিরায়ত সামাজিক এবং পারিবারিক আয়োজনে? আবারো কি বৈশ্বিক প্রশাসন ব্যবস্থা চালাবে কোভিড-১৯? বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক বছরে বিশ্বে করোনাভাইরাসের ২০ হাজারের বেশি মিউটেশন হয়েছে। বর্তমানে দেশে করোনাভাইরাসের ইউকে ভেরিয়েন্ট বেশি ছড়াচ্ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

 এটির মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ার ক্ষমতা অনেক বেশি, যা আগের চেয়ে প্রায় ৭০ গুণ বেশি। এ অবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মানার ব্যাপারে উদাসীন হলে পরিস্থিতি যে আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তা বলাই বাহুল্য। সম্প্রতি টিকা নেওয়ার বিষয়ে আমাদের সকলের মধ্যে বেশ আগ্রহ লক্ষ করা গেছে। এটি ভীষণ ইতিবাচক। এখন পর্যন্ত যে টিকাগুলো আবিষ্কৃত হয়েছে, সেগুলো বেশিরভাগ ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে কাজ করে। কাজেই টিকাদান কর্মসূচি সফলভাবে সম্পন্ন হলে আশা করা যায়, দেশে করোনার সংক্রমণ কমবে। এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনার টিকার দুই ডোজ নেওয়ার অন্তত ১৪ দিন পর মানবদেহে প্রকৃত প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠে। তবে দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও পুরোপুরি করোনার শঙ্কামুক্ত হওয়া যাবে কিনা, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। অনুমোদিত টিকাগুলো বেশ কার্যকর হলেও করোনার মূল জীবাণুর বিরুদ্ধে এটা শতভাগ সুরক্ষা দিতে পারবে না। ইতোমধ্যে দেশে ছয়জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, যাদের শরীরে ভাইরাসটির নতুন স্ট্রেইন পাওয়া গেছে। ভাইরাসের এ স্ট্রেইন অতিমাত্রায় সংক্রমণশীল। তাই এটাকে ধরেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। তবে করোনা মোকাবিলায় সব দায়িত্ব সরকারের ওপর না চাপিয়ে সামাজিক উদ্যোগের সুযোগও কাজে লাগানো চাই। সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সাধারণ বিত্তহীন ও ভাসমান মানুষের কাছে মাস্ক পৌঁছে দিতে পারে। শুধুমাত্র সঠিকভাবে মাস্ক পরিধান এবং পারস্পরিক দূরত্ব বজায় রাখলেই করোনার সংক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।

 করোনা পরীক্ষা আরও সুলভ ও সুগম করার বিষয়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। করোনার কারণে আমাদের নানামাত্রিক ক্ষতি হয়েছে, এর মধ্যে শিক্ষা খাতের ক্ষতির বিষয়টি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। মহামারির কারণে এক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠতে শিক্ষক ও শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে করোনা পরিস্থিতি অনুকূলে এলে তবেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, এটাই স্বাভাবিক। যেহেতু এখনই শিশুদের টিকার আওতায় আনা যাচ্ছে না, সেহেতু তারা সংক্রমণের আশঙ্কা এড়িয়ে কীভাবে স্কুলে যাবে, এটাই প্রশ্ন। সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা অনুকূলে এলে খোলা মাঠে স্কুল কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়টি ভাবা যেতে পারে, প্রায় ১০০ বছর আগে বিভিন্ন দেশে যেমনটি হয়েছিল। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না, যাতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যাবে। 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার সংক্রমণ থেকে বাঁচতে হলে টিকা নেওয়ার পাশাপাশি আগামী দিনগুলোয় কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম চালাতে হবে। করোনায় সারা বিশ্বের সর্বত্র সব মানুষ এখন উৎকণ্ঠিত। আবার সব মানুষ মানবতার নিরিখে সমান। এই বোধ সব মানুষের মধ্যে যদি করোনা আগ্রাসন জাগিয়ে তোলে, তাহলে দেশে দেশে, বিশ্বমাঝারে মানবিকতা ও মানবতার জয় প্রতিষ্ঠিত হবে। বস্তুত, করোনা থেকে আমাদের সর্বদিক বিস্তৃত শিক্ষা নিতে হবে, যাতে আমরা ভবিষ্যতে এ ধরনের পরিস্থিতি আরও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারি। যদিও মানব সভ্যতার জন্ম ও ঊষালগ্ন থেকেই মানুষের আত্মিক যুদ্ধের ইতিহাস খানাখন্দ, জ্বরা ও মৃত্যুকে হার মানানোর বৃত্তান্ত। সব সময় সে কিছু একটা হতে চায়, জিততে চায়, অথবা অঘরে ঘর বানায়। নোনাজলে, নোনাডাঙায় ফসল ফলায়। ছবি আঁকে, অন্যকেও আঁকার স্পৃহা জোগায়; নিজে লেখে, অন্যকেও লেখায়, যে হাঁটতে জানে না, রাস্তা চেনে না তাকেও জলাশয় দেখিয়ে বলে হাঁটো, হাঁটতে থাকো। সূর্যোদয় সামনে। বিপর্যয় নয়, ধ্বংস নয়, সম্মুখে তরুণ ইচ্ছার জয়। এটাই চড়াই-উৎরাই সভ্যতার, মানববোধের ইতিহাস এবং মানুষের স্বনির্মিত, স্বনির্ণীত নিয়তি। আমরাও নিশ্চয় করোনার এই ধাক্কা কাটিয়ে সুন্দর পৃথিবীতে ফিরতে পারবো। 
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংগঠক
০১৭১৭-৪৯৬৮০৩