লকডাউনে প্রান্তজনের ভাবনা!

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:২৯ এএম, ০৭ এপ্রিল ২০২১

: করোনায় মৃতের সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে আরও স্বজন হারানোর শঙ্কা মনের গভীরে তীব্রতর হচ্ছে! আমার খুব কাছের এক বড় ভাই, বন্ধু শাকিল মোঃ মনজুর রবিবার সন্ধ্যায় আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। এই মুহূর্তে করোনায় সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে রয়েছেন আমার খুব কাছের আরও কয়েকজন। আমার মত আপনাদেরও পরিচিত অনেকেই হয়তো এই মূহুর্তে করোনার সাথে লড়াই করছেন। কার কখন কি হয় কিচ্ছু বলা যায় না, তাই আসুন আমরা সবাইকে ক্ষমা করে দেই। আমরা যেন পরস্পরের জন্য দোয়া করি। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা নেই। কি যে দুর্দশা চলছে তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন! মহান ¯্রষ্টা আমাদের সকলকে করোনামুক্ত ও নিরাপদে থাকার তৌফিক দান করুন! 
করোনা মোকাবিলায় সরকার ঘোষিত এক সপ্তাহের ‘লকডাউন’ শুরু হয়েছে। সবাই বলাবলি করছে লকডাউনের মেয়াদ আরও বাড়বে। গত বছরের অভিজ্ঞতা এবং এ বছরে করোনার বিস্তৃতি বিবেচনায় নিলে সেটাই স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়া যায়। তবে এটাও লক্ষ্যণীয় যে এবারের লকডাউন গতবারের সাধারণ ছুটি’র মত ততটা কঠোর নয়! সরকার এবার ‘লকডাউন’ দিয়ে জীবন বাঁচানোর যেমন উদ্যোগ নিয়েছেন তেমনি জীবিকা বাঁচাতেও শিল্প-কারখানা, অফিস, ব্যাংক ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান সীমিত জনবল দিয়ে খোলা রাখার সিদ্ধান্তও বহাল রেখেছেন। সরকারের সিদ্ধান্তের মধ্যে ‘দো-টানা’ ভাবের তীব্র উপস্থিতি থাকলেও এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভাল কিছু করার উপায় ছিল না। মানুষের জীবন বাঁচাতে হবে প্রথম। যাঁরা চাকরি করেন, মাস শেষে মাইনে পাবার নিশ্চয়তা যাদের রয়েছে ‘লকডাউন’ নিয়ে তাদের আগ্রহ নিঃসন্দেহে খেটে-খাওয়া সাধারণ মানুষের চেয়ে বহুগুণ বেশি। সাধারণ মানুষের কাছে পরিবার নিয়ে পেট পুরে খাবার পাওয়ার চ্যালেঞ্জটা করোনা সংক্রমণের ভয়ের চেয়ে বড়! 
পৃথিবীতে কেউই চিরকাল থাকবে না। তবু মন বলে, ‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর এ ভুবনে’। কিন্তু করোনাকালে সবচেয়ে কষ্টকর সত্যটা হচ্ছে প্রিয়জনদের দূরে থাকা। করোনায় মৃত ব্যক্তির জানাজায় অংশ নেয়া, তাদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানানো, মৃত ব্যক্তির দাফনে অংশ নেয়ার মত গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো থেকে আমরা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছি। করোনায় মৃত্যু হলে কবরে শুয়ে বন্ধু-স্বজনদের হাতে মাটিটুকু পাবার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হতে হয়। এটা মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টকর! আমি জানি না, আমরা যারা বেঁচে আছি তাদের সঠিক কর্তব্য কি? তবে এটা অন্ততঃ বলতে পারি আমরা মানুষ, আশরাফুল মাখলুকাত! পরার্থপরতাই আমাদের জীবনের ধর্ম। 
সাবধানতা ও স্বার্থপরতা এক নয়। আমরা সাবধান হবো নিশ্চয় কিন্তু এমন নিষ্ঠুর কেন হবো যে কারও বিপদে কেউ পাশে এসে দাঁড়াবে না? মৃত ব্যক্তির শরীরে করোনা ভাইরাস বেঁচে থাকতে পারে না। তাহলে মৃত ব্যক্তিকে সৎকারে এত অনীহা কেন? শুনেছি ঢাকার এক গোরস্থানে করোনায় মৃতদের লাশ দাফনে অস্বীকার করছে। এটা কি আমাদের চিরায়ত সামাজিক সংহতি ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার পরিচয় বহন করে? আমি মর্মাহত হয়ে যাই মানুষের মধ্যে ভয়ের চাদরে ঢাকা স্বার্থপর এই মুখশ্রী দেখে! বড় কুৎসিত আর কদাকার সে চেহারা! মনে রাখা দরকার, ভেঙে ফেলা যতটা সহজ, গড়াটা ততটা নয়। হাজার বছর ধরে ‘মানুষ মানুষের জন্য’- মানবতার এই যে সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলেছি তা যদি আজ আতঙ্কের বশবর্তি হয়ে ভেঙে ফেলি তাহলে নতুন করে তা নির্মাণ করতে বহু সময় লাগবে! তাই আমাদের সমাজের গভীরে থাকা সামাজিক দৃঢ়তা ও ঐক্যবোধের প্রেরণায় আমরা যেন সকল বিপদে-আপদে পরস্পরের সহযোগী হই, থাকি ঐক্যবদ্ধ। আমাদের ঐক্যের দৃঢ়তায় পরাজিত হোক অশুভ শক্তি! 
আমরা বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় বেশ সফলভাবেই করোনা ভাইরাসের প্রথম ঢেউ মোকাবিলা করেছিলাম। সে সময় যেভাবে মৃত্যুর ও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা ব্যক্ত করা হয়েছিল বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা নিয়ন্ত্রণহীন ছিল না। সেই অভিজ্ঞতা থেকে বিশ্বাস করতে চাই যে, করোনার দ্বিতীয় ঢেউ সাময়িকভাবে আমাদের কিছুটা কাবু করে ফেললেও আমরা সম্মিলিতভাবে ও সমন্বয়ের ভিত্তিতে এই ঢেউও মোকাবিলা করতে পারব। তবে সমন্বয়টা সত্যিই কঠিন। দেশের মানুষকে মাস্ক পরানো এবং সামাজিক দুরত্ব মেনে চলাফেরা করতে অভ্যস্ত করাটা সহজ নয়। তবে গণমাধ্যমে এসে সবাই যেভাবে বিশেষজ্ঞ হয়ে নিজেদের মনের মাধুরি মিশিয়ে পরামর্শের ডালা খুলে ধরছেন সেখানে সমন্বয় থাকাটা খুব দরকার। নির্দেশনা একমুখীন হওয়া ভাল। হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া এবং তা ঘোষণা করে না দিয়ে বরং ভবিষ্যতের প্রভাব মাথায় নিয়ে যতটা সম্ভব সময় হাতে রেখে সরকারি নির্দেশনাগুলো দেয়া উচিত। যেমন লকডাউনের সিদ্ধান্তটা খুব তড়িঘড়ি দেয়ার ফলে মানুষকে যার যার নীড়ে ফিরতে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। ভোগান্তির সাথে সাথে বেড়েছে দেশব্যাপী করোনা সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি! করোনাসহ সকল মহামারি মোকাবিলায় সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। সেটা পরিবারে যেমন, রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও তেমন, ঠিক তেমনি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটেও। আমরা সবাই জানি প্রতিবছর ৭ এপ্রিল ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে পালিত হয়। ১৯৫০ সালের ৭ এপ্রিল থেকে প্রতিবছর দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে। করোনায় লকডাউনের প্রেক্ষিতে বাংলাদেশে এবার বাহ্যিকভাবে বড় কোন কর্মসূচি পালিত হচ্ছে না। সেটা ভিন্ন কথা। তবে আমাদের মনে রাখা দরকার, সচেতনতা ও শিক্ষা মহামারি নিয়ন্ত্রণ ও সুস্থ সমাজ গঠনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনাচরণ যদি সঠিক না হয় তাহলে আমরা মহামারি নিয়ন্ত্রণ করতে পারব না। করোনা মোকাবিলাতেও মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাকে প্রথম ও প্রধান করণীয় হিসেবে নির্দেশনা দেয়া হচ্ছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকেই। বিদেশ থেকে ভাইরাস আসছে শহরে আর শহর থেকে সেটা ছড়িয়ে যাচ্ছে গ্রামে। এবারের লকডাউনের পরেও যেভাবে শহরের মানুষ গ্রামে ছুটে গেছেন তাতে গ্রামেও সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে গেছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় যারা শহর থেকে গ্রামে ফিরেছেন তারা দয়া করে কমপক্ষে ৩দিন স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টাইনে থাকুন। তিনদিন পরেও যদি জ্বর, সর্দি-কাশি, হাঁচি, শ্বাসকষ্ট থাকে তাহলে দ্রুত চিকিৎসা নিন এবং নিজে সতর্ক হয়ে অন্যদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস করুন। আপনার পরিবার, প্রিয়জন এবং প্রতিবেশীদের সুরক্ষায় আপনাকেই বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে। যারা শহর থেকে গ্রামে ফিরছেন তাদের প্রতি কেউ নির্দয় হবেন না, দয়া করে সতর্ক থাকুন। সাবধানতা ও দায়িত্বশীল আচরণই এখন সকলের কাছে কাম্য। 
এখন পর্যন্তও এবারের লকডাউন গতবারের মত ভয়ঙ্কর নয়। রাস্তায় রিক্সা চলছে, ভ্যানগাড়িতে চলছে পণ্যের বেচাকেনা। গতবারের মত ক্ষুধার তীব্রতায় রাস্তায় মানুষের ঢল নামার পরিস্থিতি এখনও দৃশ্যমান নয়। তবে স্মৃতিতে সেই ক্ষত এখনও  বিরাজমান। গত বছর এই সময়ে করোনা শনাক্তের হার ছিল ২-৩ শতাংশ আর এবার সেটা ২২-২৩ শতাংশ প্রায়। সংক্রমণের এই উর্দ্ধগতি সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের মধ্যে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার দুশ্চিন্তা অনেক প্রকট। সরকার কিভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই মুহূর্তে মানুষের ত্রাণ সহযোগিতা প্রয়োজন। তাদের খাদ্যের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। উন্নয়নশীল দেশের রথে ওঠা বাংলাদেশ যেন কেবল লক ডাউনের কারণে খাদ্য ও স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের শিরোনাম না হয় সেটা নিশ্চিত করা দরকার। সরকারের দেয়া ত্রাণের সুষ্ঠু বন্টন নিশ্চিত করতেই হবে। গত বছরের ২৫০০ টাকা অর্থ সাহায্য নিয়ে যে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছিল তার কুশীলবদের শাস্তি দেয়া দরকার অন্যথায় ওরা আবার দুর্নীতি করবে। 
করোনা মোকাবিলায় ‘লকডাউন’ বা ঘরে থাকা কর্মসূচি দেয়া হলেও খেটে খাওয়া মানুষ কিভাবে ঘরে থেকে খাদ্য পাবে সেটা বোঝা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের কর্মীদের উচিত এখন ব্যাপকভাবে গণসচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা। খাদ্য সংকটে থাকা মানুষদের সহায়তায় হাত বাড়িয়ে দেয়া দরকার। এটা রাজনীতি করার সময় নয়, এখন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সময়। জাতীয় দুর্যোগের এই সময়ে সকলকেই এগিয়ে আসতে হবে। আমরা সকল বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষদের সহায়তা চাই। মনে রাখতে হবে, লক ডাউনের মেয়াদ বাড়তে পারে এবং সামনে রমজান আসছে। সুতরাং লকডাউনের বিষয়টা বিবেচনায় নিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। এটাকে রাজনৈতিক কর্মসূচির মত করে দেখলে চলবে না।  
করোনা মোকাবিলায় ব্যক্তি ও পরিবারের করণীয় নিয়ে বেশি বেশি আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। আমাদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ইনফ্লুয়েঞ্জা ও করোনা এক নয় যদিও উভয়ের লক্ষণের মধ্যে দারুণ মিল রয়েছে। তাই মানুষকে এর পার্থক্য বুঝে চিকিৎসা গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। সব ক্ষেত্রেই হাসপাতালে যাবার প্রয়োজন নেই। আমরা ভয় পেয়ে অনেকেই হাসপাতালে যাচ্ছি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত ওষুধ খাচ্ছি আর শরীরটাকে আরও কাহিল করে ফেলছি। এখানে একটু সচেতন ও সতর্ক পদক্ষেপ নেয়া দরকার। করোনার ষ্ট্রেইন পাল্টাচ্ছে এবং সেটাই স্বাভাবিক কিন্তু সেই পরিবর্তনের সাথে সাথে আমাদের সক্ষমতাও বাড়াতে হবে। যেমন আমাদের পরীক্ষা বা ডায়াগনোষ্টিক সক্ষমতা এখনও দুর্বল। সেখানে আমাদের কাজ করতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে রোগ নির্ণয়ে। কারণ নির্ভুলভাবে রোগ ও রোগের উৎস নির্ণয় করাটা রোগের চিকিৎসা সহজ করে দেয়। 
আমরা আশা করব, সরকার স্বাস্থ্যখাতে মনোযোগ আরও বাড়াবে। জনস্বাস্থ্যের প্রতি অবহেলা আমাদের কারোরই কাম্য নয়। বিশেষ করে গরীব মানুষ, সাধারণ মানুষ তাদের চিকিৎসা সুবিধা নির্বিঘœ হওয়া দরকার। দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা প্রত্যেক জেলা-উপজেলাতেই উন্নত করা দরকার। চিকিৎসা কর্মিদের সংখ্যা ও সেবা সুবিধা বাড়ানো প্রয়োজন। আর বেশি বেশি করে জনগণকে জানানো দরকার কি করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে এবং অসুখের ভয় ও ওষুধ নির্ভরতা কমবে। ‘আতঙ্কিত হবেন না, দায়িত্বশীল হোন’। করোনা ভাইরাস আমাদের শেখাচ্ছে, ‘ক্ষুদ্র বলেই অবহেলা নয়’। আমরা যেন এর থেকে শিক্ষা নিয়ে সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণ করি। সকলকে ধন্যবাদ। 
লেখক : সংগঠক-প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৭১১-৫২৬৯৭৯