বায়ু ও পরিবেশ দূষণে বিপর্যস্ত জনজীবন

OnlineStaff OnlineStaff
প্রকাশিত: ০৬:৫৩ এএম, ০৬ এপ্রিল ২০২১

 : মানুষকে সুস্থ শরীরে বেঁচে থাকতে হলে দূষণমুক্ত পরিবেশে বসবাস করতে হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশে বিশুদ্ধ পানি আর নির্মল বায়ুর বড়ই অভাব। ফলে প্রতিনিয়তই দূষিত হচ্ছে নগর-মহানগর। বিশেষ করে নগর মহানগরকে ঘিরে বয়ে চলা নদ-নদীগুলো এখন বর্জ্য ফেলার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। ফলে নদ-নদীগুলোর পরিবেশ এখন খুবই অস্বাস্থ্যকর। আবার নগরের ভিতরে গৃহস্থালী বর্জ্য, চিকিৎসা বর্জ্য ও নালা আবর্জনার দুর্গন্ধে মানুষের পথ চলাচল করাও এখন কঠিন। সে কারণে জনস্বাস্থ্য এখন হুমকির মুখে। বিশেষতঃ ঢাকা মহানগর এখন মতান্তরে দেড়-দুই কোটি মানুষের বসবাস। গ্রামে উপযুক্ত কাজের অভাবে বেঁচে থাকার তাগিদে রুটি-রুজির জন্য মানুষ ছুটছে রাজধানী ঢাকা শহরে। ফলে প্রতিনিয়তই ঢাকায় মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। মানুষ বাড়ার কারণে পয়ঃবর্জ্য, গৃহস্থালী বর্জ্যরে পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব বর্জ্য ফেলার এখন একমাত্র অবলম্বন ঢাকাকে ঘিরে চলা বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষা ও তুরাগ নদীর পাড়। ফলে মানুষ কেন, নদীরও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে অর্থাৎ পরিবেশ দূষণের কবলে মানুষের জীবন এখন বিপর্যস্ত। এর ওপর আবার নগর উন্নয়নে অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা খোড়াঁখুড়ি, ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, ওয়াসার পানির লাইনের আধুনিকায়নসহ নানাবিধ কাজের চাপে মাটি ও ধুলায় একাকার অবস্থা। বর্ষায় রাজধানীবাসী ভোগেন কাঁদা-পানি ও জলাবদ্ধতায়, আর এখন শুষ্ক মৌসুমে ভুগছেন ধুলার দুর্ভোগে। শীতের সকালে নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে কোনটি কুয়াশা আর কোনটি ধুলার ধোঁয়াশা। ফলে ধুলায় ধুসর ঢাকার বসবাসরত মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি ও পরিবেশ দূষণ দু’টোয় বেড়েছে। 
বিশেষ করে মেট্রোরেল, ফ্লাইওভার সহ ঢাকা শহরে নানা উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে রাজধানীর কিছু কিছু এলাকা ধুলার রাজ্যে পরিণত হয়েছে, এসবের সঙ্গে মেয়াদউত্তীর্ণ ফিটনেসহীন লক্কর ঝক্কর পুরনো গণপরিবহনের কালো ধোঁয়া, ঢাকারে আশে পাশে নিয়ম বহির্ভূতভাবে যত্রতত্র ইটভাটার ধোঁয়া, দূষণের অন্যতম কারণ হিসেবে নির্ণয় করেন পরিবেশবাদিরা। গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে রাজধানী ঢাকাকে পরিষ্কার রাখতে আন্তঃমন্ত্রণালয় একসভা অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সভায় স্থানীয় সরকার মন্ত্রী তাজুল ইসলাম বলেন- ‘রাজধানী ঢাকাকে বায়ুদূষণ মুক্ত রাখতে সব সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়কে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। এ ক্ষেত্রে মেট্রোরেল, ওয়াসা, ফ্লাইওভার, ইটভাটাকে নিয়ম কানুন মেনেই উন্নয়ন কাজ করতে হবে। যারা আইনের ব্যত্যয় ঘটাবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর বক্তব্য যথাযথই, এ নিয়ে কোন দ্বিমত কারোরই নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, আমাদের দেশে আইন আছে ঠিকই, কিন্তু আইনের প্রয়োগ নেই। ফলে কম-বেশি সকলেই আইন অমান্য করেই চলে। ফলে ঢাকা শহরের দূষণ ক্রমান্বয়েই বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম বলেন, সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন কাজের জন্য ঠিকাদারদের মেইনটেইন্যান্স খরচ দেয়া হয়। কিন্তু উন্নয়ন কাজে নিয়োজিত ঠিকাদারগণ কমপ্লায়েন্স মেইনটেইনেন্স করেন না। তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী, জরিমানাসহ নানাভাবে শাস্তি দেয়া শুরু করবো মর্মেও তিনি মন্তব্য করেন। বাস্তবে দুই সিটি কর্পোরেশন সহ অন্যান্য সংস্থাগুলো নিয়োজিত ঠিকাদারদের ধুলা নিয়ন্ত্রণে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে শুধু ওই আইটেমের বিল প্রদান করা বন্ধ রাখলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ করা অনেকাংশেই সম্ভব হবে। যদিও দুই সিটি কর্পোরেশনের তরফে প্রতিদিনই কম বেশি ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানো হয় কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই কম। ফলে উল্লেখযোগ্য ফলাফল পাওয়া যায় না। এ ক্ষেত্রে পানি ছিটানোর পরিমাণ যেমন বৃদ্ধি করতে হবে, তেমনি উন্নয়ন কাজে ব্যবহৃত ইট, সুরকি, বালু টিন দিয়ে ঘিরেও কাজ করতে হবে। কারণ ইতিমধ্যেই বায়ুদুষণে ভারতের রাজধানী দিল্লিকে টপকে এক নম্বরে চলে এসেছে রাজধানী ঢাকা। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বায়ুমান যাচাই বিষয়ক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এয়ার ভিজ্যুয়ালের বায়ুমান সুচক (একিউআই) অনুযায়ী, গত ৭ ডিসেম্বর বায়ুদূষণের মানমাত্রায় আবারও সবার ওপরে ওঠে এসেছে রাজধানী ঢাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই দিন দুপুর ৩টার দিকে বায়ুর মানমাত্রা ছিল ২৬৯ স্কোরে। আগেই উল্লেখ করেছি, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বায়ুমান নির্ণয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান বা একিউআই একটি শহরের বাতাস মানুষের কতটুকু নির্মল বা দুষিত সে সম্পর্কে মানুষকে তথ্য দিয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির সূচকে ৫০ এর নিচে স্কোর থাকার অর্থ হলো বাতাসের মান ভালো। সূচকে ৫১ থেকে ১০০ স্কোরের মধ্যে থাকলে বাতাসের মান গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেয়া হয়। একিউআই স্কোর ১০১ থেকে ১৫০ হলে নগরবাসীর মধ্যে শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ রোগীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। আর স্কোর ১৫১ থেকে ২০০ হলে নগরবাসীর প্রত্যেকের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়বে। একিউআই স্কোর যদি ৩০১ থেকে ৫০০ বা তার অধিক হয়, তাহলে বাতাসের মান ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হয়। এ সময় স্বাস্থ্য সর্তকতাসহ নগরবাসীর প্রত্যেকের জন্য জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচিত হয়। জনবহুল রাজধানী ঢাকা শহর দীর্ঘদিন ধরেই দূষিত বাতাস নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে স্টাম্পফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ঢাকায় ঘিঞ্জি পরিবেশের কারণে বাতাস চারিদিকে ছড়াতে পারে না। এতে বাতাসে ধুলিকনার উপস্থিতি ভারী হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বায়ুমান ব্যবস্থাপনা) মোঃ জিয়াউল হক বলেন, নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত শুস্ক মৌসুমে রাজধানীতে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। এ সময় বাতাসে ২ দশমিক ৫ মাইক্রোমিটার আকারের বস্তুকণার উপস্থিতি বাড়ে। এসব ধুলিকনার মধ্যে সূক্ষ্মধুলিকণা বেশি ক্ষতিকারক। এ বস্তুকনা নি:শ্বাসের সাথে সহসাই রক্তে মিশে গিয়ে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে এ সময় নানা অসুখে মানুষ অসুস্থ্য হয়ে পড়ে। এ জন্য ধুলিকণা প্রতিরোধক ব্যবস্থা যে কোন মূল্যেই নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে সর্দি, জ্বর, ইনফ্লুয়েনজা, কাঁশি, অ্যাজমার মতো রোগের প্রকোপ বাড়বে। আর করোনা ভাইরাসের প্রাথমিক উপসর্গই হচ্ছে, সর্দি, কাশি, হাঁচি আর শ্বাসকষ্ট। এমনিতেই এখন সাধারণ জ্বর হলেই মানুষ যেমন আতংকিত হয়, তেমনি অনেক সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিম্বা অনেক স্থানে প্রবেশের পূর্বে জ্বর মাপক যন্ত্র দিয়ে শরীরের তাপমাত্রা পরীক্ষা করা হয়। শরীরে তাপমাত্রা বেশি থাকলে অনেক ক্ষেত্রেই ভিতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। অর্থাৎ এখন আতংকের নাম জ্বর ও কাশি। সেই জ্বর, কাশির অন্যতম কারণ হচ্ছে দূষিত বায়ু। ফলে দুষিত বায়ুরোধ করা ছাড়া আমাদের অন্য কোন বিকল্প নেই। 
এ প্রসঙ্গে জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ ডা. শামীমা আক্তার বলেন, বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্টের রোগীর সংখ্যা বেড়েছে সবচেয়ে বেশি। পাশাপাশি অ্যাজমা, সিওপিডি (ক্রনিক অবষ্ট্রাকটিভ পালমোনারি ডিজিজ শ্বাসকষ্টজনিত রোগ) এলপিডি (লিস্কোপ্রোলিফারেটিভ ডিজিজ) সহ নানাবিধ রোগও দেখা দিচ্ছে। পরিবেশবাদি সংগঠন পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) এক গবেষণায় দেখা গেছে, রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের দূষণের মধ্যে ধুলাদূষণের অবস্থান শীর্ষে। এর কারণে জনস্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বাড়ছে। জীবাণুমিশ্রিত ধুলার কারণে রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে। গবেষণায় পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে একটি কার্যকর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দাবি জানায় প্রতিষ্ঠানটি। অবশ্য এরই মধ্যে ঢাকা মহানগর ও এর আশেপাশে যেন বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে থাকে, সে ব্যাপারে নির্র্দেশনা দিয়েছে উচ্চ আদালত। একই সঙ্গে বায়ুদূষণ রোধে ৯ দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। বেঁধে দেয়া সময় সীমার মধ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। উল্লেখ্য ঢাকা শহর ও এর আশেপাশে এলাকার বায়ুদূষণ রোধে পরিবেশ ও মানবাধিকার সংগঠন এইচআরপিবির (হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ) করা এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৩ জানুয়ারি বিচারপতি মোঃ আশফাকুল ইসলাম ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর ভার্চুয়াল হাইকোর্ট রেঞ্চ (১) ঢাকা শহরে মাটি/বালি/ বর্জ্য পরিবহনের ট্র্রাক ও অন্যান্য পরিবহনের গাড়ীর মালামাল ঢেকে রাখা (২) নির্মাণাধীন এলাকার মাটি/পলি/সিমেন্ট/পাথর/নির্মাণ সামগ্রী ঢেকে রাখা (৩) সিটি কর্পোরেশন শহরে পানি ছিটাবে (৪) রাস্তা, কালভার্ট সহ উন্নয়ন কাজে টেন্ডারের শর্ত পালন করতে হবে (৫) কালো ধোঁয়া নিঃসরণকৃত গাড়ি জব্ধ করতে হবে। (৬) সড়ক পরিবহন আইন অনুযায়ী গাড়ির চলাচল নিশ্চিত ও সময় উত্তীর্ণ গাড়ি চালানো বন্ধ করতে হবে। (৭) অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করতেই হবে। (৮) পরিবেশ লাইসেন্স ব্যতিত চলমান সব টায়ার ফ্যাক্টরি বন্ধ রাখা এবং (৯) মার্কেট, দোকানে প্রতিদিনের বর্জ্য ব্যাগে ভরে রাখাসহ সেগুলো অপসারণে সিটি কর্পোরেশনকে পদক্ষেপ নিতে হবে। বাস্তবে উচ্চ আদালতের এসব নির্দেশনা প্রতিপালন করতে পারলে বায়ুদূষণের মাত্রা অনেকাংশেই কমে আনা সম্ভব হবে। আমরা আশাবাদি, সংশ্লিষ্ট উচ্চ আদালতের নির্দেশনার বাস্তবায়নে আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করবেন। অবশ্য আশার কথা, ইতিমধ্যেই ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ঢাকার অদূরে আমিন বাজারে ২৫ মেগাওয়াট বর্জ্য বিদ্যুৎপ্লান্ট নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে। এতে প্রতিদিনের বর্জ্য দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন হলে ঢাকা শহরের বর্জ্য আর যত্রতত্র কিম্বা নদী-নালায় ফেলতে হবে না। এতে বর্জ্য দূষণের আগ্রাসন অনেকাংশেই কমে আসবে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন যদি একই ভাবে বর্জ্য হতে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হাতে নেয়, তাহলে ঢাকা শহরের দূষণ রোধে অনেকটাই পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে। বিশেষ করে বায়ুদূষণের জন্য যেসব উৎস চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো বন্ধের পাশাপাশি নতুন করে যেন কোন উৎস থেকে বায়ু দূষণ না ঘটে সে দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখে নীরব ঘাতককে প্রতিহত করা ছাড়া আর অন্য কোন বিকল্প নেই।
লেখক : প্রাবন্ধিক
[email protected]
০১৯২২-৬৯৮৮২৮